উন্নয়নকাজের কর্মকর্তারা কী করেন?

একটি উন্নত রাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য প্রধান শক্তি হইল তাহার যোগাযোগব্যবস্থা। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আমেরিকায় যখন অর্থনৈতিক মন্দা চলিতেছিল, শ্লথ হইয়া গিয়াছিল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, তখন দেশটির নীতিনির্ধারকরা নিজেদের জনশক্তি দিয়া মাইলের পর মাইল রাস্তাঘাট নির্মাণ করিয়াছিলেন, যাহা পরবর্তী সময়ে অভাবিত উন্নতির দ্বার খুলিয়া দেয়। বাংলাদেশেও বর্তমানে চলমান উন্নয়নস্রোত দারুণভাবে প্রবহমান। দৃশ্যমান উন্নয়ন-অবকাঠামোর মধ্যে রাস্তাঘাট-মহাসড়ক, উন্নত রেল ও বিমান, নদীপথের যোগাযোগ প্রভৃতি রহিয়াছে। গত অর্থবত্সরের এডিপিতে এই লক্ষ্য অর্জনে দেড় হাজারেরও অধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হইয়াছে। সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ছড়াইয়া পড়িয়াছে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। সরকার চাহিতেছে, ৫৬ হাজার বর্গমাইলের প্রতিটি ইঞ্চি যেন উন্নয়নের আওতায় চলিয়া আসে। গত বৃৃহস্পতিবার ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেন কিশোরগঞ্জের অল-ওয়েদার সড়ক। হাওরের বিশাল জলরাশির বুক চিরিয়া চলিয়া গিয়াছে ২৯.৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি। সড়কের দুই পাশে থইথই পানি, আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। মেঘ আর জলের এই মনোরম মিতালির সামনে বিস্ময় লইয়া তাকাইয়া থাকিতে হয়। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য সৌন্দর্যের বিপুল পসরা সাজাইয়া বসিয়া থাকে কিশোরগঞ্জের হাওর। হাওরের এই সৌন্দর্য এখন ভিন্ন মাত্রা যোগ করিয়াছে নান্দনিক সদ্যনির্মিত সড়কটি। উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ঐ সড়কের পার্শ্ববর্তী সৌন্দর্য দেখিয়া অভিভূত হইয়া পড়েন।

এই সকল দৃশ্যমান উন্নয়নকাজের উদাহরণের শেষ নাই। তবে এই সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড লইয়া আমাদের কিছু পর্যবেক্ষণ রহিয়াছে। আমরা দেখিয়াছি, গোটা দেশে উন্নয়নের জন্য যেই সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাহার বৃহত্ একটি অংশ অসম্পন্ন থাকিয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বরাদ্দকৃত উন্নয়নকাজের একটি বৃহত্ অংশ স্থবির হইয়া থাকিবার পাশাপাশি যেইটুকু কাজ সম্পন্ন হয়, সেইটুকুও অনেক ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন হয় না। নানান রকম অনিয়ম আর ফাঁকফোকর দিয়া কাজটি শেষ করা হয়। কিন্তু কেন এই রকম হইবে? এই কাজে তদারকির জন্য সরকারি কর্মকর্তারা কী করেন? এমন নহে যে, এই তদারকি করা হয় ঢাকা হইতে। প্রতিটি জেলায় সংশ্লিষ্ট উন্নয়নকাজের কর্মকর্তারা রহিয়াছেন। রহিয়াছেন এসও, এসডি, সহকারী প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন স্তর। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাহাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করিলে কোনো একটি উন্নয়নকাজও অসম্পূর্ণ থাকিবার কথা নহে। অথচ নিয়মিত দেখভাল কিংবা তদারকির অভাবে উন্নয়নকাজে কোথাও কোথাও চরম পরিস্থিতি সৃষ্টি হইতেছে। অনেক ক্ষেত্রে যথাসময়ে কাজ না করিবার জন্য কেবল ঠিকাদারকেই দায়ী করা হয়।

আরো একটি বিষয়ের অবতারণা করিতে হয়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল হইতে উপজেলা স্তরে চার লেনের রাস্তা তৈরি হইয়া থাকে। উপজেলা রাস্তা, ইউনিয়ন রাস্তা, গ্রামীণ সড়ক-১ ও গ্রামীণ সড়ক-২। এই সড়কগুলি যখন তৈরি হয় তখন সরেজমিনে দেখা প্রয়োজন যে কতটা প্রশস্ত রাস্তা দরকার। কিন্তু তাহা কেহ পরখ করিয়া দেখেন বলিয়া মনে হয় না। দেশব্যাপী দেখা যায় যেইখানে অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত সড়ক দরকার, সেইখানে রাস্তা সরু, আর যেইখানে সরু রাস্তা হইলেও চলে সেইখানে অপ্রয়োজনীয় প্রশস্ত রাস্তা করিয়া রাখা হইয়াছে। ইহাও একটি দায়িত্বজ্ঞানহীনতার অংশ বলিয়া অনুমিত হয়। মনে রাখা দরকার, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারই দক্ষতার প্রথম শর্ত।