এখনো গেল না আঁধার

দেশে শারীরিক স্বাস্থ্যের যেইখানে সুচিকিত্সা নাই, সেইখানে মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি আশা করা বাতুলতা মাত্র। মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের পথে বড় বাধা আমাদের মনমানসিকতা ও কুসংস্কার। দেশ শিক্ষাদীক্ষায় আগাইয়া যাইতেছে; কিন্তু শিক্ষা যদি হয় সার্টিফিকেট সর্বস্ব, তাহা দিয়া অন্ধকার দূর করা যায় না। শিক্ষা নিঃসন্দেহে একপ্রকার আলো। ইহা আসে সুশিক্ষা ও স্বশিক্ষা হইতে, কুশিক্ষা হইতে নহে। এখনো আমাদের দেশে জিনে ধরা রোগীর দেখা মিলে এবং তাহাদের চিকিত্সায় অদ্ভুত সকল পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। কখনো তাহাদের বেত্রাঘাত করা হয়, কখনো বা তাহাদের চুবানো হয় পুকুরে। কখনো তাহাদের আবার পায়ে শিকল পরাইয়া বন্দি করিয়া রাখা হয় বত্সরের পর বত্সর। ইহাতে তাহাদের মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যা বাড়ে বই কমে না। আমাদের সমাজে ও পরিবারে মানসিক রোগীদের এখনো নিগৃহীত হইতে হয়। হইতে হয় অবহেলা ও অনাদরের শিকার। এমনকি আমাদের দেশের মেডিক্যাল কলেজের বর্তমান এমবিবিএস কারিকুলামে সাইকিয়াট্রি বিষয়টিও চরমভাবে উপেক্ষিত। আমাদের সামগ্রিক মনমানসকিতার পরিবর্তন ছাড়া এই পরিস্থিতির অবসান হইবে বলিয়া মনে হয় না।  ইহারই মধ্যে গতকাল বাংলাদেশেও পালিত হইল মানসিক স্বাস্থ্য দিবস।

মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত একটি খবরের প্রতি আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ হইয়াছে। আমরা কতটা নিষ্ঠুর ও অমানবিক হইতে পারি তাহা পাবনায় অবস্থিত দেশের একমাত্র মানসিক হাসপাতালের একটি স্টোরি পড়িয়া তাহা বুঝিতে অসুবিধা হয় না। এক জন রোগী বহু পূর্বেই সুস্থ হইয়াছেন; কিন্তু তিনি বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া এখনো হাসপাতালে পড়িয়া রহিয়াছেন। এই জন্য তিনি প্রতিবেদকের নিকট আকুতি জানাইয়াছেন, ‘বাড়ির কাউকে খবর দিবেন আমাকে যেন নিয়ে যায়’। ভর্তির সময় স্বজনরা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল ঠিকানা দেওয়ায় সুস্থ হইবার পরও তাহাদের বাড়ি পাঠানো যাইতেছে না। সুস্থ হইবার পরও অনেক সময় সমাজ তাহাদের স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে না বলিয়া অনেকে তাহাদের ফিরাইয়া নিতে অনাগ্রহী। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সম্পত্তি হইতে বঞ্চিত করিতে সুস্থ হইবার পরও ফেরত নিতে চাহে না তাহার পরিবার। হাসপাতালটিতে এই রকম সুস্থ রোগী রহিয়াছে কমপক্ষে ১১ জন। ইহা অনাকাঙ্ক্ষিত। অন্যদিকে  দেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি লাভ করিতেছে, ইহার পাশাপাশি জনসংখ্যা বাড়িয়াছে জ্যামিতিকহারে। অথচ এখনো সরকারি মানসিক হাসপাতালের সংখ্যা মাত্র একটি। অন্তত প্রতিটি বিভাগে একটি করিয়া মানসিক হাসপাতাল গড়িয়া তোলা আজ সময়ের দাবি।

উন্নত বিশ্বে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীরা নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য চেকআপ করিয়া থাকেন। তাহাদের কাজের চাপে থাকিতে হয় বলিয়া এই পরীক্ষা করা হয়। তাহার মানে মানসিক রোগী মানেই পাগল নহে। আবার মানসিক রোগ ও মানসিক সমস্যাও এক জিনিস হইতে পারে না। এই ব্যাপারে আমাদের সচেতনতা নাই বলিলেই চলে। বর্তমান বিশ্বে প্রায় এক বিলিয়ন মানুষ মানসিক রোগে ভুগিতেছেন। আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৯ অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক সমস্যা রহিয়াছে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। শিশু-কিশোরদের মধ্যে এই হার ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ; কিন্তু মানসিক রোগে আক্রান্ত প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ আজ স্বাস্থ্যসেবা হইতে বঞ্চিত। বিশেষ করিয়া বিশ্বব্যাপী চলমান করোনা মহাদুর্যোগের কারণে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়িয়াছে। অতএব, মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি গুরুত্বারোপ জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।