ট্রাম্প কি মার্কিন ইয়ালিসন হবেন?

দশ দিগন্তে g আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন, এটা অনেকেই বিশ্বাস করেননি। হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি যখন জিতে গেলেন, তখন সারা বিশ্ব বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। অনেকেই ভেবেছিল, তাদের মতে, এই ‘ক্লাউন’ এবং ‘হুমকিদানসর্বস্ব’ ব্যক্তিটি শিগিগরই আমেরিকার মতো গণতান্ত্রিক দেশের শাসন পরিচালনায় ব্যর্থ হবেন। তিনি যে সফল হয়েছেন তা নয়। ইরান, সিরিয়া ও উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে তার আক্রমণাত্মক রণনীতি ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে তার কূটনৈতিক আগ্রাসন বিস্ময়করভাবে সফল হয়েছে। যা আগের কোনো প্রেসিডেন্ট সফল করতে পারেননি।

ট্রাম্পের কূটনৈতিক চাপে মধ্যপ্রাচ্যের আমিরাত, বাহরাইনসহ অধিকাংশ আরব দেশ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দান করে মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করেছে। সৌদি আরব তো আগে থেকেই ইসরায়েলের গলগ্রহ। কেবল শিয়া রাষ্ট্র ইরান এবং তার একমাত্র মিত্র সিরিয়া ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু ট্রাম্পের ক্রমবর্ধিত অর্থনৈতিক চাপে ইরান এখন যথেষ্ট কাবু। মধ্যপ্রাচ্যে প্যালেস্টিনিদের বন্ধু ও সাহায্যদাতা আর কেউ রইল না।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যখন জিমি কার্টার ছিলেন, একমাত্র তিনি মিশরকে ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদন ও ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে রাজি করিয়েছিলেন। তখন সব আরব রাষ্ট্রই মিশরের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট সাদাতকে বিশ্বাসঘাতক আখ্যা দিয়েছিলেন। এবার তারা সবাই সেই একই বিশ্বাসঘাতকতার পথ ধরেছেন বলা চলে। এর আগে ট্রাম্প বিতর্কিত জেরুজালেম শহর ইসরায়েলকে দান করেছেন। প্যালেস্টাইনের আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলো এখনো তাদের দখলে। এই অবস্থায় অধিকাংশ আরব রাষ্ট্রকে ইসরায়েলকে স্বীকৃতিদানে রাজি করানো ট্রাম্পের জন্য বিরাট জয়লাভ অবশ্যই বলা চলে।

ট্রাম্পের আগের প্রেসিডেন্ট দুই বুশ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের জন্য যুদ্ধ করেছেন। দুই-দুটি গাল্ফ যুদ্ধ করেছেন। ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দামকে হত্যা করেছেন। তথাপি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিননীতি তেমন জয়ী হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার এক তুড়িতে সেই জয় অর্জন করলেন। এই ব্যাপারে তার ক্রিটিকরাও হতবাক।

আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ট্রাম্প খুব একটা অসফল নন। কোভিড-১৯ মহামারি নিয়ন্ত্রণে তার প্রশাসনের শোচনীয় ব্যর্থতা, তার ইমিগ্রেসন-বিরোধী ও বর্ণবাদী নীতি বহির্বিশ্বে নিন্দিত হলেও স্বদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গদের কাছে তিনি হিরো। তাদের ভোটে আগামী নভেম্বরের নির্বাচনেও তিনি জিতে যাবেন বলে অনেকে আশঙ্কা করেন।

এবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন। তিনি ভদ্রলোক। ট্রাম্পের মতো অশালীন ভাষায় কথা বলতে জানেন না। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের প্রথম মুখোমুখি ডিবেটে দাঁড়িয়ে ট্রাম্পের অশ্রাব্য গালিগালাজের মুখে বাইডেন বলতে বাধ্য হন, ‘শাট আপ ইউ, ম্যান। কিন্তু অশ্রাব্য ভাষায় কথাবার্তা বলেও ট্রাম্প সুবিধা করতে পারেননি।

এর দুই দিন পরই বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কিন্তু তার রোগ সম্পর্কে হোয়াইট হাউজ এবং তার চিকিত্সক ডা. শনকনালির বক্তব্যের মধ্যে পরস্পর বিরোধিতা থাকায় সন্দেহ দেখা দিয়েছিল, ট্রাম্প সত্যই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন কি না! হোয়াইট হাউজ থেকে বলা হয়েছিল, প্রেসিডেন্টের শরীরে ইনফেকসন দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে তার চিকিত্সক বলেছেন, তার করোনা হয়েছে। লন্ডনের সানডে টাইমস, (৪ অক্টোবর এই সম্পর্কিত প্রথম পৃষ্ঠায় খবরের হেডিং করেছিল, ‘প্রেসিডেন্টের আসল রোগ সম্পর্কে সংশয় দেখা দিয়েছে।’

এই সময় সন্দেহবাদীরা বলেছিলেন, ট্রাম্পের করোনা হয়নি। তিনি বাইডেনের সঙ্গে দ্বিতীয় ডিবেটে জয়ী হতে পারবেন না—এই ভয়ে করোনার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। তিনি হয়তো আরো ভেবেছেন, করোনা-আক্রান্ত প্রেসিডেন্টের জন্য মার্কিন ভোটদাতাদের মনে সহানুভূতি ও সমর্থন বাড়তে পারে। কিন্তু রোগাক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার দিনেই ট্রাম্প টুইটারে জানালেন, তিনি এখন হেঁটে হাসপাতাল থেকে চলে যেতে পারেন। তার সমর্থকরা প্রচার করলেন, টিভি ডিবেটের সময় বাইডেনের শরীর থেকে ট্রাম্পের শরীরে করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে। বাইডেন সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরে করোনা-টেস্ট করালেন, দেখা গেল তার শরীরে করোনা নেই।

ট্রাম্প সম্ভবত এরপর বুঝতে পেরেছিলেন, করোনা-নাটক করে কোনো লাভ নেই। বরং তার ক্ষতি হবে। ফলে হাসপাতালে যাওয়ার দুদিনের মধ্যে তিনি করোনা মুক্ত হয়ে যান এবং হোয়াইট হাউজে ফিরে আসেন। এটা একটা মিরাকল। যেখানে আমেরিকায় করোনা হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটাচ্ছে, সারা বিশ্বে মৃত্যুর সংখ্যা ৩ কোটির ওপর, সেখানে ট্রাম্প মাত্র দুদিনে এই ভয়াবহ রোগ থেকে মুক্ত হলেন কী করে? ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এই রোগে আক্রান্ত হলে তার জীবনাশঙ্কা দেখা দিয়েছিল এবং তার রোগ মুক্ত হতে দুই মাসের মতো লেগে ছিল।

ট্রাম্প জানালেন, তাকে গবেষণাগারে এখনো পরীক্ষা করা হচ্ছে—এমন ওষুধও দেওয়া হয়েছে। এই ওষুধগুলো এখনো কার্যকর ওষুধ বলে মার্কিন হেলথ অথরিটির অনুমোদন পায়নি। তাহলে এই পরীক্ষাগারের ওষুধ কারা কেমন করে প্রেসিডেন্টকে দিলেন এবং আদৌ দেওয়া হয়েছিল কি না সে সম্পর্কে আমেরিকারও অধিকাংশ মানুষের মনে সন্দেহ রয়ে গেছে। মার্কিন সংবাদপত্রে চিঠিপত্র কলামে তাদের বক্তব্য পাঠ করলেই তা বোঝা যায়।

আমেরিকার প্রেসিডেন্সিয়াল ডিবেট কমিশন একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। তারা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দুই প্রার্থীর মধ্যে টিভি বিতর্কের আয়োজন করে থাকেন। আজ পর্যন্ত কোনো প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী তাদের বিধি-বিধান মানতে অস্বীকৃতি জানাননি। কিন্তু এবার ট্রাম্প তার বিপরীত দেখালেন। করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় দফা বিস্তৃতির দরুন কমিশন প্রেসিডেন্সিয়াল ডিবেটের দ্বিতীয় দফা ভার্চুয়াল করার ব্যবস্থা করেছিল।

প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বাইডেন বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। সুতরাং এত শিগিগরই তার কাছাকাছি হওয়া আমার উচিত নয়। স্বাভাবিকভাবেই ডিবেট কমিশন ভার্চুয়াল ডিবেটের ব্যবস্থা করেছেন। অমনি ট্রাম্প গোঁ ধরেছেন, তিনি ভার্চুয়াল ডিবেটে যাবেন না। তিনি বলেছেন, ‘একটা বাক্সের সামনে বসে ডিবেটে অবতীর্ণ হতে রাজি নই। এটা যে দ্বিতীয় ডিবেট এড়াবার একটা বাহানা তা সবাই বুঝতে পেরেছেন। অবশেষে ডিবেট কমিশন দ্বিতীয় ডিবেট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে।

ট্রাম্প দাবি করছেন, তিনি এখন ‘পারফেক্ট হেলথের অধিকারী’। তা সত্ত্বেও রোগমুক্তির এত শিগিগরই তিনি যে সম্পূর্ণ ভাইরাস মুক্ত হননি, এ কথা বলছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তথাপি ট্রাম্পের এই গোঁ। তার সমর্থকরা ছড়াচ্ছেন, ডিবেট কমিশন নিরপেক্ষ নন। তারা প্রেসিডেন্টকে কথা বলার মুহূর্তেই থামিয়ে দেন ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু প্রথম ডিবেটে দেখা গেছে, ট্রাম্প যখন বাইডেনের প্রতি অশোভন উক্তি করছেন, তখনই মাত্র তাকে থামিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ট্রাম্প বিতর্ক কমিশনকে বিশ্বাস করেন না। নির্বাচন কমিশনকে বিশ্বাস করেন না। ডাক বিভাগকে বিশ্বাস না করে সেখানে তার প্রধানের পদে তার নিজের এক অনুগত ব্যক্তিকে বসিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের নিরপেক্ষতায় তার বিশ্বাস নেই। সেখানেও প্রধান বিচারপতি পদে তিনি তার অনুগত ব্যক্তিকে বসানোর চেষ্টা করেছিলেন। ট্রাম্প প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন, ‘আগামী নভেম্বরের নির্বাচনের ফল তার অনুকূলে না গেলে তিনি মনে করবেন ভোট রিগিং হয়েছে এবং ভোটের ফলাফল মানবেন না।’ তার এই ঘোষণা শুনে অনেকেই মনে করছেন, ট্রাম্প নির্বাচনে পরাজিত হলেও তিনি পরাজয় মানবেন না। তিনি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চাইবেন না। নানা টালবাহানা করবেন।

ট্রাম্পের কার্যকলাপ শুধু আমেরিকার জন্য নয়, সারা পৃথিবীর গণতন্ত্রের জন্যই এক বিরাট হুমকি। তার বর্ণবাদী নীতি ইতিমধ্যেই জাতীয় ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ট্রাম্পের নীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কষ্টার্জিত ঐক্যে ভাঙন ধরাতে এবং সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়নের পরিণতি ঘটাতে পারে। জর্জ ওয়াশিংটন, জেফারসন প্রমুখ প্রেসিডেন্ট অনেক কষ্ট করে একটি বিশাল মহাদেশকে একটি যুক্তরাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন। আব্রাহাম লিঙ্কন বুকের রক্ত দিয়ে উত্তর দক্ষিণের বিভেদ ঘুচিয়ে যুক্তরাষ্ট্রীয় ঐক্য রক্ষা করে গিয়েছিলেন, ট্রাম্প সেই ঐক্য ভেঙে দেবেন। তিনি হবেন মার্কিন ইয়ালিসন। ইয়ালিসন যখন সোভিয়েট নেতা, তখন তার বিশ্বাসঘাতকতা ও মার্কিন তাঁবেদারির জন্য সোভিয়েট ইউনিয়ন ভেঙে যায়।

কেউ কেউ ট্রাম্পকে করোনা ভাইরাসের সঙ্গে তুলনা করেন। তাদের মতে, আগামী নভেম্বর মাসেই বোঝা যাবে, পৃথিবী ট্রাম্প এবং করোনা ভাইরাস এই দুটি থেকেই মুক্ত হবে কি না। আগামী নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন এবং অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, করোনা ভাইরাসেরও হামলা প্রশমিত (একেবারে দূর হবে না) হওয়ার সম্ভাব্য মাস। সব কারসাজি সত্ত্বেও ট্রাম্প আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে জেতেন কি না তা দেখার রইল। অনেকে আশঙ্কা করেন, আগামী নভেম্বরের নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার জন্যও ট্রাম্প শিবির চেষ্টা চালাচ্ছেন।

n লন্ডন, ১০ অক্টোবর, শনিবার, ২০২০