বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রায় সাড়ে ৫০০ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করিয়া দিয়াছে কর্তৃপক্ষ। অপরাধ, এই সকল প্রতিষ্ঠান নিজেদের অডিট করিবার বাধ্যবাধকতা মানে নাই। প্রতি বত্সরই অডিট করিবার নিয়ম রহিয়াছে, কিন্তু গত তিন বত্সর ধরিয়া উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলি অডিটের ব্যবস্থা করে নাই। অর্থাত্ ঐসকল প্রতিষ্ঠান যথাযথভাবে নিয়ম পরিপালন করে নাই। আমরা জানি, শিল্প খাতের কাঁচামাল সংরক্ষণের জন্য বন্ড সুবিধা একটি আধুনিক ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় একজন কারখানা মালিককে কাঁচামালের অনিশ্চয়তায় থাকিতে হয় না। একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তিনি কাঁচামাল আনিয়া মজুত রাখিতে পারেন। কারণ, রপ্তানি আদেশ পরিপালন করিতে গিয়া সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করিতে না পারিলে তাহা অর্থনীতির জন্যই ক্ষতিকর। লিড টাইমসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় লইয়া বন্ড সুবিধাটি খুবই উপযুক্ত একটি শিল্পসহায়ক ব্যবস্থা। কিন্তু অডিট না করিবার ফলে বন্ড সুবিধার আওতায় আনীত কাঁচামালের সঠিক ব্যবহার হইয়াছে কি না—তাহা নিশ্চিত হওয়া যাইতেছে না। অডিট করা হইলে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, প্রতিষ্ঠানগুলি কী পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করিয়াছে, তাহা দিয়া তৈরি পণ্য রপ্তানি হইয়াছে এবং রপ্তানিকৃত পণ্যের বিপরীতে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসিয়াছে। নিরীক্ষা না হইলে ইহা অস্পষ্ট থাকিয়া যায় এবং রপ্তানি আয় প্রত্যাবাসিত হইয়াছে কি না—তাহা সঠিকভাবে জানা যায় না। বন্ড ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনিবার স্বার্থেই নিয়মিত নিরীক্ষা পরিচালনা করা জরুরি।
অভিযোগ রহিয়াছে যে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার হইতেছে দেদার। কখনোকখনো অভিযান পরিচালনা করিয়া বন্ডের পণ্য খোলা বাজারে বিক্রির তথ্য উদ্ঘাটন করা হইতেছে। কিন্তু এই সকল ঘটনার তুলনায় প্রকৃত জালিয়াতি অনেক অধিক। কর্তৃপক্ষের নজর এড়াইয়া, কখনো-বা কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে অসাধু চক্র বন্ড সুবিধায় আনা পণ্য বাহিরে বিক্রি করিয়া দিতেছে। তাহাদের বড় সিন্ডিকেট রহিয়াছে। এইরূপ গর্হিত কাজের কারণে সরকার যেমন রাজস্ববঞ্চিত হইতেছে, তেমনি দেশের শিল্প উদ্যোক্তারা অনিশ্চয়তায় পড়িয়া যাইতেছেন। একজন কারখানার মালিক বিনিয়োগ করিয়া, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করিয়া এমন অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়িবেন, তাহা কোনোভাবেই কাম্য হইতে পারে না। ব্যাংকের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত শিল্প যদি কিছু অসাধু গোষ্ঠীর কারণে রুগ্ণ হইয়া যায়, তাহা হইলে শুধু উদ্যোক্তাই নহে, ব্যাংকও ধরাশায়ী হয়। কর্মসংস্থান হারায় বহুলোক। সেই কারণেই বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধ করিতে বিভিন্ন সময় কঠোর নজরদারির দাবি উঠিয়াছে।
ইহার পাশাপাশি নীতিগত কিছু অসামঞ্জস্যতাও রহিয়াছে। শিল্পের স্বার্থে বন্ড সুবিধা দিয়া উদ্যোক্তাদের কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হইয়াছে। বিপরীতে যাহারা কারখানায় উত্পাদিত পণ্য ব্যবহার করিবেন তাহাদেরও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হইয়াছে। ফলে, প্রকৃত উদ্যোক্তা প্রতিযোগিতায় টিকিয়া থাকিতে পারিতেছেন না। ধরা যাউক, স্পিনিং খাতের কথা। তুলা আমদানি করিয়া দেশে সুতা তৈরি করিবার পর তাহা স্থানীয় তাঁতিদের কাছে বিক্রি করিতে হয়। কিন্তু সরকার তাঁতিদেরও রেয়াতি হারে সুতা আমদানির সুযোগ করিয়া দিয়াছে। ইহার ফলে তাঁতি সমিতি সরাসরি সুতা আমদানি করিতেছে। অন্যদিকে, বন্ড সুবিধায় আনা সুতাও খোলা বাজারে বিক্রি হইতেছে দেদার। এই দুইয়ের কারণে দেশীয় কারখানাগুলো প্রায় বন্ধ হইবার উপক্রম। তাহা হইলে একজন কারখানার মালিক কী করিয়া ব্যাংকের কিস্তি শোধ করিবেন? করোনার এই সময়ে কর্মসংস্থান ধরিয়া রাখিবেন? কাজেই বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রুখিবার মাধ্যমে শৃঙ্খলা আনয়ন যেমন জরুরি, তেমনই নীতিগ্রহণে সাবধানতা অবলম্বন করিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, শিল্প না টিকিলে কর্মসংস্থান হইবে না। কর্মসংস্থান না হইলে অর্থনীতি বেশিদিন চাঙ্গা রাখা যাইবে না।