ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর জরুরি, নইলে বাড়বে নিরাপত্তাঝুঁকি

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সামাজিক সমস্যা ক্রমশই প্রকট হচ্ছে। বিভিন্ন কারণে গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে গতকাল রবিবার পর্যন্ত ৯ জন রোহিঙ্গা খুন হয়েছেন। ২০১৭ সাল থেকে এবং আরো আগে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর লোক ক্যাম্পে অবস্থান করছে। কিন্তু ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণ, প্রভাব সৃষ্টি এবং সর্বোপরি মাদক ও অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অপরাধ বাড়ছে। হত্যা, খুন, লুট, ডাকাতিসহ নানান অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে ক্যাম্পগুলোতে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন সুদূরপরাহত তখন তাদের একাংশকে ভাসানচরে স্থানান্তর জরুরি। সরকারের প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য ভালো অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। এই অবকাঠামোর উপযুক্ত ব্যবহার জরুরি বলেও মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বিশ্লেষকরা বলেন, রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন পক্ষের মধ্য প্রাণঘাতী সংঘাত বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকির সৃষ্টি করেছে। এ বিষয়টিকে খাটো করে দেখার আর সুযোগ নেই। কারণ গত তিন বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অন্তত ৫০টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। ক্যাম্পগুলোতে বেশ কয়েকটি জঙ্গি সন্ত্রাসী সংগঠন গড়ে উঠেছে। এ কারণে সম্প্রতি হত্যাকাণ্ডসহ গুরুতর অপরাধ বেড়ে চলেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার ইত্তেফাককে জানান, ভাসানচরের পরিবেশ অত্যন্ত আধুনিক ও নিরাপদ। যেখানে প্রায় ১ লাখ রোহিঙ্গাকে এখনই স্থানান্তর করা সম্ভব। কিন্তু এই স্থানান্তরের ক্ষেত্রে একাধিক সুবিধাভোগী পক্ষের বাধা রয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাস্প ঘিরেই এসব সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। একদল সুবিধাভোগী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা, অস্ত্র চোরাচালান, নারী পাচারের মতো কর্মকাণ্ড করছে। ক্যাম্পের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই এ ব্যবসা চলছে বলে নানাভাবে তথ্য এসেছে। এখন পরিস্থিতি অনেক শোচনীয়। এ অবস্থা কক্সবাজারের স্থানীয় অধিবাসী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্তব্যরত প্রশাসন, স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য যেমন নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে, তেমনি বাংলাদেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তার ব্যাপারেও যথেষ্ট উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ অবস্থা চলতে পারে না, চলতে দেওয়া উচিত নয়। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ সরকারেরও উচিত রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে জরুরি ভিত্তিতে স্থানান্তর করা এবং ভাসানচরের মতো আরো এ ধরনের ক্যাম্প তৈরি করে সেগুলোতেও রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাওয়া।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, আসলে কক্সবাজারে যে রোহিঙ্গারা আছে তারা সেখান থেকে খুব সহজেই নাফ নদীর ওপারে তাদের দেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে। ভাসানচরে গেলে এই যোগাযোগ কঠিন হয়ে যাবে, এমন একটি ভাবনা উসকে দিয়েই কিছু মানুষ রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে যেতে নিরুত্সাহিত করছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সাধারণ রোহিঙ্গারা ভাসানচরে যেতে চায়। কারণ তারা সেখানে বসবাসের জন্য ভালো বাসস্থান পাবে, জীবনধারণের জন্য জীবিকা পাবে, আরো ভালো স্বাস্থ্যসেবা পাবে এবং সন্তানদের লেখাপড়ার নিশ্চয়তাও পাবে। তিনি বলেন, এখন সরকারকে কঠোর হতে হবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের ভাসানচরে পাঠাতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে রোহিঙ্গাদের তাদের দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনই মূল লক্ষ্য। এজন্য কার্যকর কূটনৈতিক তত্পরতা চালাতে হবে।

ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ বলেন, সম্প্রতি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যে হানাহানি, সহিংসতা চলছে তার পেছনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মদত থাকতে পারে। কারণ রাখাইন থেকে রোহিঙ্গারা চলে আসার পর সেখানে যে জায়গাটা ফাঁকা হয়েছে, সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আরাকান আর্মি দখল নিয়েছে। দৃশ্যত, আরাকান আর্মিকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। একই সঙ্গে নিঃসন্দেহে রোহিঙ্গা সংকট ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। এ অবস্থায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর কৌশল হিসেবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতাদের একটি অংশকে ব্যবহার করে সেখানে সংঘাত, সহিংস ঘটনা ঘটানোর এ কাজটি করতে পারে। যেন সংকট সমাধানের প্রচেষ্টা ব্যাহত হয় এবং প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হয়।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালিউর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প প্রকৃত অর্থে নিয়ন্ত্রণে নেই। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও ধারাবাহিক ঘটছে। এটা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের একটা অংশকে ভাসানচরে নেওয়াটাই যুক্তিযুক্ত। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। তাদের কোথায় রাখা হবে, সে ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারই সিদ্ধান্ত নেবে।