বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ি ভোরের টর্চার সেল!

হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী, সিলেট অফিস

সিলেট নগরীর বন্দরবাজার ফাঁড়িতে ‘পুলিশি নির্যাতনে’ রায়হান আহমদের (৩৪) মৃত্যুর ঘটনায় সোমবার সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভুঁইয়াকে গতকাল সকাল থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্র। এদিকে রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় তার স্ত্রীর দায়েরকৃত মামলাটি পিবিআইতে স্থানান্তর করা হয়েছে। সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) জ্যোতির্ময় সরকার এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, পরিবারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি পিবিআইতে স্থানান্তর করা হয়। অন্যদিকে রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় সিলেট বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।

সিলেট নগরীর হার্ট ‘সিটি পয়েন্ট’ এর একপাশে পুলিশ সুপারের কার্যালয় অপর পাশে কুদরত উল্লাহ মার্কেট ও মসজিদের মাঝামাঝি টিন শেডের মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ি। ফাঁড়িটি পুলিশের ‘ভোরের টর্চার’ সেল বলে আশপাশের লোকজনের অভিযোগ। তারা জানান, প্রায় দিন শেষ রাত থেকে সূর্য ওঠার আগ পর্যন্ত শুনা যায় ঐ ফাঁড়ির ভেতর মানুষের আর্তচিত্কার। ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যদের মূল টার্গেট ভোরের যাত্রী, পর্যটক, মাজারে আসা দম্পতি। ঐ ফাঁড়িতে নিরীহদের আটকে পিটিয়ে বা মামলার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করা হয়। আশপাশের লোকজন আরো জানান, বেশির ভাগ ঘটনা ঘটে ভোরে। আর ভুক্তভোগীদের বেশির ভাগ জেলার বাহিরের বিধায় প্রকাশ হয় না। অনেকেই ভয়েও চুপ থাকেন। তবে গত রবিবার ঐ ফাঁড়িতে ‘পুলিশি নির্যাতনে’ রায়হান আহমদ নামে যুবকের মৃত্যুর পর অনেকেই ঐ পুলিশ ফাঁড়ির বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন। বেরিয়ে আসছে নানা অজানা তথ্য। ঐ পুলিশ ফাঁড়ির লাগোয়া কুদরত উল্লাহ রেস্ট হাউজের বর্ডার ব্যবসায়ী হাসান গতকাল সন্ধ্যায় জানান, ঘটনার দিন ভোরে ঐ ফাঁড়ির ভেতর থেকে আসা আর্তচিত্কার শুনে তিনি খুবই বিচলিত হন। অন্যদিকে ফাঁড়িটির ইনচার্জ অভিযুক্ত এসআই আকবরের তাণ্ডব সম্পর্কে ফাঁড়ির অদূরে লাল বাজারের মত্স্যজীবীরাও বিস্তর অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সিলেট জেলার সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, রায়হান আহমদ হত্যাকাণ্ডের পর বন্দরবাজার ফাঁড়ির কর্মকর্তাদের অপকর্মের বিষয়টি সামনে এসেছে। ফাঁড়ির প্রতি নজরদারি না থাকায় এমন ঘটনা ঘটছে।

স্থানীয় সূত্র আরো জানায়, বেশ কয়েক দিন আগে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে দস্তারবন্দি সম্মেলনে অংশ নিতে আসা কয়েক মাদ্রাসাছাত্র চৌহাট্টার রেস্তোরাঁয় চা-পান করছিল। হঠাত্ দুই পুলিশ সদস্য এক ছাত্রকে ধরে নিয়ে সিএনজি অটোরিকশায় তুলে নেয় বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে। সেখানে নিয়ে ঐ ছাত্রের সঙ্গে এক নারীর ছবি তুলে পুলিশ। পুলিশ তখন বলে, যদি তুমি টাকা আনতে পার তাহলে ছেড়ে দেব, না হয় পত্রিকায় ছবি ছাপা হবে। ছাত্রটি বাড়িতে মায়ের কাছে কল দিয়ে ১০ হাজার টাকা দিতে বলে ফাঁড়ির এসআইর মোবাইলে। বিকাশের মাধ্যমে ৮ হাজার টাকা পাঠানো হয়। পরে ছাত্রকে ছেড়ে দিলে সে স্থানীয় একটি সংবাদপত্র অফিসে এসে কান্নাকাটি করে বিষয়টি জানায়। তখন কোতোয়ালি থানার তত্কালীন ওসি আসাদুজ্জামানকে বিষয়টি জানানো হলে পরে ঐ পুলিশ ৮ হাজার টাকা ফেরত দেন ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এমন অনেক অভিযোগ এই বন্দরবাজার ফাঁড়ির পুলিশের বিরুদ্ধে।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) জ্যোতির্ময় সরকার জানান, রায়হান হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তিন জনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রায়হান নিহতের বিষয়টি তদন্ত করছেন।

বিক্ষোভ অব্যাহত :এদিকে ‘পুলিশি নির্যাতনে’ রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় সিলেটে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ‘দুষ্কাল প্রতিরোধে আমরা’ নামক নাগরিক প্ল্যাটফরমের উদ্যোগে বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব যাদের তারাই আইন লঙ্ঘন করে চলেছে। তারা বলেন, দুর্নীতিবাজ খুনি পুলিশ সদস্যদের দ্রুত গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। বক্তারা বলেন, রায়হানকে হত্যার প্রধান অভিযুক্ত বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়নি।

বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বলা হয়, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করা না হলে আরো কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

আট দফা দাবি : সিলেট নগরীর আখালিয়ার যুবক রায়হানের খুনিদের ফাঁসিসহ আট দফা দাবিতে সিলেটে সচেতন আলেম সমাজ মানববন্ধন করেছে। মঙ্গলবার কোর্ট পয়েন্টে ‘সিলেটের সচেতন আলেম সমাজর ব্যানারে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এদিকে রায়হান আহমদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সিলেট জেলা বিএনপি। সোসাইটি ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে রায়হান হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয় মঙ্গলবার বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির সম্মুখে।