রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চাকরিচ্যুত অফিস সহকারী কামাল উদ্দিনের স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত। চাকরি নেই, তার ওপর স্ত্রীর ক্যান্সারের চিকিৎসা চালাতে গিয়ে আজ দুইটি সন্তানকে নিয়ে পথে বসেছেন। অর্থাভাবে স্ত্রীর চিকিৎসা তো দূরের কথা, দুইটি সন্তানের পড়াশুনা বন্ধ, মুখের ভাতও জোটাতে পারছেন না।
কেন তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে-এমন প্রশ্নের জবাবে কামাল উদ্দিন বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি না টানানোর প্রতিবাদ করায় রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি তাকে অফিস সহকারীর পদ থেকে চাকরিচ্যুত করেছে। এর পাশাপাশি বিগত জোট সরকারের আমলে ২০০৩ সালে তার বিরুদ্ধে ৫ হাজার ৭৭৮ টাকা চুরির অভিযোগ এনে চাকরিচ্যুত করা হয়। ২০০৯ সালে তদন্ত রিপোর্টে তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগের সত্যতা পায়নি। পরে তাকে নতুন করে চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির বিভিন্ন অফিসে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি না টানানোর প্রতিবাদ করলে তার ওপর বিগত জোট সরকারের মিথ্যা চুরির অভিযোগ এনে আবারও চাকরিচ্যুত করা হয়। ১৭ বছর আগের এ ধরনের মিথ্যা অভিযোগে চাকরিচ্যুত করায় তিনি উচ্চ আদালতে একটি রিট করেন।
রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মহাসচিব ফিরোজ সালাহউদ্দিন বলেন, বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি না টানানোর বিষয়ে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়নি। তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তদন্ত কমিটি তদন্ত করে নিশ্চিত হয়েছে। এরপরই তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। চাকরিচ্যুতির ঘটনায় তিনি উচ্চ আদালতে রিট করেছেন। রিটে আদালত যা রায় দিবে- সেই অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নিব।
গত বছর ১৭ মার্চ চুয়াডাঙা রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ইউনিট অফিসে বঙ্গবন্ধুর জন্ম বার্ষিকী পালনের উদ্যোগ নেন অফিস সহকারী কামাল উদ্দিন। ওই অফিসে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি টানানো ছিল না। তিনি অফিসে ছবি টাঙানোর অনুরোধ করেন। এ সব কারণে তাকে ঠাকুরগাঁও রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটে বদলি করা হয়। সেখানে যোগদান করার পর সেখানে স্থানীয় সন্ত্রাসী দিয়ে তার ওপর হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় তিনি ঠাকুরগাঁও সদর থানায় একটি জিডি করেন। এই জিডি করার পর কামাল উদ্দিনকে ঢাকায় রেড ক্রিসেন্টের সদর দপ্তরে ডেকে পাঠানো হয়। অফিসে হাজির হলে তাকে একটি কক্ষে আটকে রেখে বেদম মারপিট করে। এতে তার এক হাঁটু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে তাকে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন। এ ঘটনায় কামাল উদ্দিন বাদী হয়ে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সম্পত্তি বিভাগের পরিচালকের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। এসব বিষয় নিয়ে কামাল উদ্দিন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৯৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিতে কামাল উদ্দিন অফিস সহকারী হিসাবে যোগ দেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হওয়ার কারণে ২০০৩ সালের ৩১ জানুয়ারি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মতাদর্শের কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরিচ্যুত করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিতে তার চাকরি পুনর্বহালের দাবি করে আবেদন করেন। তার আবেদন তদন্ত করে নিশ্চিত হয় যে জোট সরকারের সময় তাকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। এরপরও তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল না করে ২০০৯ সালের ২২ মার্চ তাকে নতুন করে নিয়োগ দেয় রেডক্রিসেন্ট। চাকরির সার্ভিস বই থেকে তার পূর্বের ১৩ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা বাতিল করা হয়। নতুনভাবে নিয়োগ দেওয়ার ফলে তার সহকর্মীদের বেতন ভাতার তুলনায় অর্ধেক বেতন প্রাপ্ত হন। ২০১৫ সালে সরকার অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণা করলে, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি তাকে শুধু মূল বেতন ১০ হাজার টাকা প্রদান করে। এ বিষয় নিয়ে তিনি ২০১৬ সালে উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন করেন। পরবর্তীতে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চাপে তিনি রিট ‘নট প্রেস’ (উত্থাপিত হয়নি) করেন।
এই রিট দায়ের নিয়ে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির একটি চক্রের রোষানলে পড়েন বলে কামাল উদ্দিন অভিযোগ করেন। তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এনে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। গত ৬ ফেব্রুয়ারি তাকে চাকরিচ্যুত করে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। চাকরিচ্যুতির বিষয়ে গত ৮ মার্চ তিনি উচ্চ আদালতে একটি রিট করেন।
ভুক্তভোগী কামাল উদ্দিন বলেন, ২০০৩ সালে তার বিরুদ্ধে ৫ হাজার ৭শত ৭৮ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এনে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। ২০০৯ সালে ওই অভিযোগ তদন্ত করে দেখতে পায় যে ওই টাকা তৎকালীন পরিচালক আত্মসাৎ করেছেন। তার বিরুদ্ধে এমন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ মিথ্যা।
রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মহাসচিব ফিরোজ সালাহউদ্দিন বলেন, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের সত্যতার প্রমাণ সাপেক্ষে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
ইত্তেফাক/ইউবি