বাঘায় ৭ ক্লিনিক ও ১৭ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আড়ালে চলছে প্রতারণা !

রাজশাহীর বাঘায় ৭ টি ক্লিনিক এবং ১৭ টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এরমধ্যে দু’টি প্রতিষ্ঠান বাদে কারোরই প্রয়োজনীয় সংখ্যক কাগজপত্র নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের সামনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাইনবোর্ড ঝুলানো থাকলেও চিকিৎসা করানো হচ্ছে হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে। এতে করে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষ। বর্তমানে এদের প্রচার মাইক এ অস্থির জনজীবন।  

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, অত্র উপজেলায় ৭ টি ক্লিনিক এবং ১৭ টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে হাতে গোনা ৩-৪ টি বাদে সবগুলোই অপরিচ্ছন্ন। ক্লিনিকের বেডরুমে ময়লা পড়ে আছে। পর্দার ভালো ব্যবস্থা না থাকায় রাস্তার ধুলা ক্লিনিকে প্রবেশ করছে, জেনারেটর থাকলেও তা অকেজো। 

চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা অভিযোগ করেন, এসব ক্লিনিকের অবস্থা সরকারি হাসপাতালের চেয়েও খারাপ। ক্লিনিকের সামনে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের সাইনবোর্ড ঝুলানো থাকলেও তারা কেউই নিয়মিত আসেন না। যারা হাতুড়ে চিকিৎসক হিসাবে নামের আগে ডাক্তার লিখে কাজ করেন, তারাও সব সময় ক্লিনিকে থাকেন না। ফলে প্রায়ই বিপাকে পড়েন রোগীরা। 

তথ্য মতে, কোন এলাকায় ক্লিনিক পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। আর এ রেজিস্ট্রেশন প্রতি বছর জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মাধ্যমে নবায়ন করতে হয়। এজন্য পাকা এবং ছাদ ঢালায় বিশিষ্ট ঘর দেখানোসহ ওই ক্লিনিকে সার্বক্ষণিক ৩ জন ডাক্তার, ৬ জন ডিপ্লোমা নার্স, ৬ জন আয়া এবং আগুন নেভানো ম্যাশিনসহ পুরো ক্লিনিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, জেনারেটর ব্যবস্থা এবং ব্লাড সংরক্ষণের সুব্যবস্থা চালু রাখাসহ নির্ভরযোগ্য (এসি) ওটি ব্যবস্থা থাকতে হয়। কিন্তু এসব শর্ত পূরণের কোনই ব্যবস্থা নেই এখানকার ক্লিনিকগুলোয়। একই অবস্থা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।  

আরও পড়ুন: ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে মাদরাসা শিক্ষক আটক

বাঘা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান (টিএইচএ) ডাক্তার আক্তারুজ্জামান জানান, বাঘায় ৭ ক্লিনিক এবং ১৭ টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে জননী এবং ফাতেমা ক্লিনিক ছাড়া আর কোন ক্লিনিক কিংবা ডায়াগনিস্টক সেন্টার পরিচালনার জন্য মালিক পক্ষের হাতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কাগজ নেই। 

তিনি বলেন, এ সমস্ত প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সার্টিফিকেট এবং ড্রাগ (মাদক) লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। এদিক থেকে আমি স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান হিসাবে সবগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি। আপডেট কাগজপত্র কারোরই নেই। তিনি এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে পত্র প্রেরণ করেছেন বলে জানান।

প্রতিষ্ঠানগুলো হলো-মঞ্জু ডায়াগনস্টিক সেন্টার, নিউ মঞ্জু ডায়াগোনস্টি সেন্টার, পল্লী বাংলা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, পিওর ল্যাব ডায়াগনস্টিক সেন্টার,বাঘা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সেবা ক্লিনিক এ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, রোগ মুক্তি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, জসিম উদ্দিন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, তুষার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনিস্টক সেন্টার, মাহামুদ ক্লিনিক এ্যান্ড ডায়াগনিস্টক সেন্টার, পদ্মা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আবুল কাশেম ডায়াগনস্টিক সেন্টার,  নিউ আলহেরা ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও আড়ানী এরশাদ আলী ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

বাঘার বিশিষ্ট সমাজসেবক খন্দকার মনোয়ারুল ইসলাম মামুন ও বাঘা পৌর সভার প্যানেল মেয়র শাহিনুর রহমান পিন্টু বলেন, এখানে যেসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে তারা রোগী আনার জন্য এক ধরনের দালাল নিয়োগসহ প্রতিদিন মাইকিং করে যাচ্ছে। বড় বড় ডাক্তারের নাম ভাঙিয়ে তারা রোগী নিয়ে আসে। এমনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনভিজ্ঞ একই ব্যক্তি প্রসূতি মাদের ইনজেকশন দেওয়াসহ অপারেশন করছে। এতে অনেক সময় রোগী মারা যাচ্ছে। এরা মানছে না সরকারি কোন নিয়মনীতি। 

উপজেলার পাকুড়িয়া গ্রামের ভুক্তভোগী হাফিজুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, বাঘার ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো লোকজনের সঙ্গে নানাভাবে প্রতারণা করছে। এর ভুক্তভোগী আমি নিজে। এখানে স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গেলেই রোগী দেখার নামে নানা ধরনের টেস্ট লিখে দেওয়া হয়। কারণ টেস্ট লিখে দিলে ডাক্তারদের জন্য থাকে কমিশন। এদের দেখার কেউ নেই। স্থানীয় প্রশাসন এবং ডাক্তারদের সাথে যোগসাজশ করে এরা এই প্রতারণা করছে। 

এ বিষয়ে বাঘা উপজেলা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক ব্যবসা এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান দিপু বলেন, একটি ক্লিনিক কিংবা ডায়াগনস্টিক ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে যে সকল কাগজের প্রয়োজন হয় তার সবগুলো অনেকেরই নেই। আমরা পরিবেশ অধিদপ্তর এবং ড্রাগ (মাদক) এর লাইসেন্স কেউই পাইনি। তবে আবেদনের কপি সংগৃহীত আছে। 

বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন রেজা বলেন, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সেটি যদি প্রমাণিত হয় তবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

ইত্তেফাক/এএএম