বরেন্দ্রে কৃষকের স্বপ্নের ধান খাচ্ছে ইঁদুরে!

স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী

অগ্রহায়ণ মাস সমাগত। বরেন্দ্র অঞ্চলের সবুজ ধান গাছ থেকে শিষ বের হচ্ছে। পাকা ধানের আশায় রঙিন হয়ে উঠছে প্রান্তিক কৃষকের স্বপ্ন। বলা যায়, ধান নিয়ে কৃষক পল্লিতে স্বপ্নের ছড়াছড়ি। তবে কৃষকের সেই রঙিন স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করছে ইঁদুরের দল। খেতের কচি আমন ধান কেটে সাবাড় করছে ইঁদুর। ইঁদুরের আক্রমণে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছে কৃষকরা। ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, এবার রোপা আমন আবাদের মাঝামাঝি সময়ে গোড়া পচনসহ নানা রোগে ভরপুর ছিল। অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করে কিছুটা কমেছে। এখন শুরু হয়েছে ইঁদুরের অত্যাচার। খেতে বিষ মাখা প্রয়োগসহ বিভিন্ন পদ্ধতি বিশেষ করে টোপ, আতব চালের টোপ কিংবা ফাঁদ পেতেও প্রতিকার মিলছে না। জমি থেকে ইঁদুর তাড়াতে না পেরে অসহায় হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। তাই সরকারের কাছে ইঁদুর দমনের নতুন পদ্ধতি চেয়েছেন তারা। না হলে খেতের অর্ধেক ফসল ইঁদুরের পেটে চলে যাবে। লোকসানে পড়বে প্রান্তিক কৃষক।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় আমনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৩ হাজার ৩৮৭ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে পোকা দমনের পদ্ধতিতে পার্চিং-লগ, লাইন এবং ধনিচা গাছ লাগানো হয়েছে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে। এছাড়াও রাজশাহী অঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আমন চাষাবাদ হয়েছে ৩ লাখ ৫০ হাজার হেক্টরের ওপরে।

রাজশাহী ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান কর্মকর্তা কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. রফিকুল ইসলাম সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৩ সালের এক গবেষণার উদাহরণ দিয়ে জানান, বাংলাদেশে ইঁদুর ৫০ থেকে ৫৪ লাখ লোকের এক বছরের খাবার নষ্ট করে। তাই ইঁদুর প্রতিহত করতে সরকারসহ কৃষকদের সচেতন হতে হবে। তবে গবেষণাটি সাত বছর আগের। বর্তমানে ইঁদুরের দ্বারা ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করলে দ্বিগুণ হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। বরেন্দ্রের উঁচু নিচু পটভূমি হিসেবে পরিচিত রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলা। এ দুই উপজেলায় বন্যার ও অতিরিক্ত বৃষ্টির পানিতেও জলাবদ্ধতা হয় না। তাই ধানসহ যে কোনো ফসলের উপযোগী। এ বছর দুই উপজেলায় প্রায় ৯৫ ভাগ জমিতে আমন ধান চাষাবাদ হয়েছে। আর প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ভাগ কৃষকের জমিতে কিছু না কিছু কাঁচা ধান কেটেছে ইঁদুর। গোদাগাড়ীর পাকড়ি ইউপির মোত্তজাপুর গ্রামের কৃষক হাসিম আলী চলতি বছর চার বিঘা জমি বর্গায় আমন চাষাবাদ করেছেন। এবার বাজারে ধানের দাম দেখে তার মনে অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু তার স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে ইঁদুরের দল। তার চার বিঘা আমন খেতের প্রায় ১৫ শতকের কাঁচা ধান এরই মধ্যে কেটে সাবাড় করে দিয়েছে ইঁদুর। এতে করে তার ২০ মণ ধান কম হবে বলে জানান তিনি। একই গ্রামের কৃষক জোনায়েত আলীসহ আরো ১০-১৫ জন কৃষকের কাঁচা ধান কেটে সাবাড় করেছে ইঁদুরের দল।

তানোরের পাঁচন্দর স্কুলপাড়ার কৃষক ডাবলু জানান, চলতি মৌসুমে অন্যের ছয় বিঘা জমি বর্গা আমন চাষ করেছেন তিনি। এর মধ্যে প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতক মতো কাঁচা ধান কেটে ফেলেছে ইঁদুর। রাতে খেতের পাশে পুরোনো টায়ার পোড়ানো, পটকা ফোটানো, বিষ টোপ ব্যবহার করেও ইঁদুর দমন করা যাচ্ছে না। ধান ঘরে তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। একই গ্রামের ইঁদুরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক হুমায়ন কবির, জামিনুর ও রয়েল বলেন, তারা এলাকার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ গ্রহণ করে ইঁদুর দমন করতে পারছে না। ইঁদুরের এমন সমস্যা শুধু দুই/চার জন কৃষকের একাই নয়, রাজশাহীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলে চলতি আমন মৌসুমে অন্যসব বছরের চেয়ে এবার ইঁদুরের আক্রমণ বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যা হাজার হাজার কৃষকের কাঁচা-আধাপাকা ধান কেটে সাবাড় করে ফেলছে। এ বিষয়ে মাঠ পর্যায়ের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা বলেন, শুধু বিষ টোপ নয়, কলাগাছ, লাঠি কিংবা বাঁশের কঞ্চিতে পলিথিন বেঁধে দিলে ও রাতে ফসলের খেতে টায়ার পোড়ানোর পদ্ধতি ব্যবহার করলে ভয়ে ইঁদুর খেত ছেড়ে চলে যাবে। কৃষকদের দেওয়া হচ্ছে এই পরামর্শ।