ইংরেজিতে একটি প্রবাদ রহিয়াছে—মর্নিং শোজ দ্য ডে। অর্থাত্ সকাল দেখিলেই দিনটি বুঝা যায়। ‘ভোরের টর্চার’ দেখিয়াও আমরা কি অন্য সকল টর্চার সেলের অবস্থা অনুমান করিতে পারি? ঘটনাটি ঘটিয়াছে সিলেটে। গত বুধবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, সিলেট নগরীর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িটি সাধারণ মানুষের নিকট ‘ভোরের টর্চার’ নামে পরিচিত। অভিযোগ রহিয়াছে যে, প্রায় দিনই শেষ রাত হইতে সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত ঐ ফাঁড়ির ভিতরে মানুষের আর্তচিত্কার শুনা যায়। না, ইহা কোনো ভৌতিক কাহিনি নহে। ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা অত্র এলাকার ভোরের যাত্রী, পর্যটক, মাজারে আসা দম্পতিদের ঐ ফাঁড়িতে আটকাইয়া পিটাইয়া কিংবা মামলার ভয় দেখাইয়া অর্থ আদায় করে। আর্তচিত্কার ঐ সকল নিরীহ ভুক্তভোগীর। আশপাশের লোকজনের ভাষ্য অনুযায়ী অধিকাংশ ঘটনা ঘটে ভোরের দিকে। ভুক্তভোগীরা অধিকাংশ জেলার বাহিরের বিধায় এই ধরনের ঘটনা এতদিন সেইভাবে আলোর মুখ দেখে নাই। তাহা ছাড়া অনেকেই ভয়েও চুপ থাকিতেন; কিন্তু একটি মৃত্যুর ঘটনা পুরা চিত্রটিকে দগদগে ক্ষতের মতো জনসম্মুখে প্রকাশ করিয়াছে। গত রবিবার ঐ ফাঁড়িতে ‘পুলিশি নির্যাতনে’ রায়হান আহমদ নামে যুবকের মৃত্যু হয়। রায়হানের জীবনের বিনিময়ে ঐ ফাঁড়ির অনেক অজানা তথ্য বাহির হইয়া আসিতে থাকে। গত সোমবার সাময়িক বরখাস্তও করা হইয়াছে ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভুঁইয়াকে। তবে ‘ভোরের টর্চার’ বুঝাইয়া দেয়, এমন রাতের অন্ধকার দেশের আরো অনেক ফাঁড়ির মধ্যে জমাট বাঁধিয়া আছে।
এই ক্ষেত্রে প্রহসনের মতো শুনাইতে পারে যে, পুলিশ শব্দের প্রথম ‘পি’ অক্ষরের অর্থ হইল পিস—অর্থাত্ শান্তি। শিল্পোন্নত দেশেই ইহা অক্ষরে অক্ষরে সত্য বটে; কিন্তু এই উপমহাদেশের জনমানসে পুলিশ বহুকাল ধরিয়া বহু ক্ষেত্রেই মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। প্রথাগত ভীতি এইরূপ যে, বাঘে ছুঁইলে আঠারো ঘা, আর পুলিশে ছুঁইলে ছত্রিশ ঘা। মুশকিল হইল, আমাদের পুলিশের ভিতর হইতে আধাসামন্তবাদী ভাবমূর্তি এখনো পুরাপুরি দূর হয় নাই। যেই কারণে তাহারা ভুলিয়া যান—পুলিশ হেফাজতে এইভাবে নির্যাতন করা আইনবিরুদ্ধ। কেবল তাহাই নহে, বাংলাদেশে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন প্রতিরোধে একটি আইনও ২০১৩ সালে প্রণয়ন করা হইয়াছে। এই আইনে ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তা হেফাজতে শারীরিক, এমনকি মানসিক নির্যাতনেরও বিচার চাহিতে পারেন। জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসাবেই বাংলাদেশ এই আইনটি প্রণয়ন করিয়াছে। নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী কেহ নির্যাতনের শিকার হইলে আদালতে সহজেই অভিযোগ করিতে পারেন; কিন্তু দুঃখের বিষয় হইল, এই আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষ খুব কমই জানেন। ইহার প্রচার-প্রচারণাও খুব কম। যেই কারণে পুলিশি হেফাজতে নিষ্ঠুর নির্যাতনের অভিযোগ প্রচুর; কিন্তু বিচার চাহিয়া গত সাত বত্সরে এই আইনে হাতেগোনা কয়েকটি মামলা হইয়াছে।
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করিতে পারে বটে, তাহা হইলে ইহা কোনোভাবে এই ধরনের শারীরিকভাবে নির্যাতন নহে। আমরা আশা করিব, একটি সুষ্ঠু সমাজের পুলিশ কখনই উত্পীড়ক হইবে না, হইবে মানুষের বন্ধু। আমাদের পুলিশ বাহিনী তাহাদের অনেক নেতিবাচক ভাবমূর্তি হইতেই ক্রমশ বাহির হইয়া আসিতেছে। বহু ক্ষেত্রেই পুলিশ এখন জনগণের নিকট ভরসার নাম। সুতরাং নিজেদের ভিতরের এই ধরনের ক্ষত পরিষ্কারের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গাফিলতি কাম্য নহে।