নারীরা মুণ্ডুবিহীন কোনো প্রাণী নয়

রোকসানা সুইটি

ধর্ষণ একটি মানসিক রোগাক্রান্ত পুরুষের নোংরা মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। কিছুদিন যাবত্ এই ধর্ষণ মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেছে। ফেসবুক, সংবাদ মিডিয়া ও খবরের কাগজ জুড়ে কেবলই দেখতে পাই ধর্ষণের নানা রকম খবর। কারা ধর্ষিত হচ্ছে—এ প্রশ্নের জবাব দিতে নিজেরই লজ্জা হচ্ছে। এখানে ৯ মাস বয়সি শিশু থেকে ৬০ বছরের বৃদ্ধাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। কেন হচ্ছে? তার জবাব কেবল সেই ধর্ষকই দিতে পারবে। আমি একজন নারী হিসেবে বলব, এর সঠিক উত্তর কোনো নারীই  দিতে পারবে না।

ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর যদি সেই নারীর পোশাককে দায়ী করা হয়, তাহলে আমার প্রশ্ন, যে শিশুটি ধর্ষিত হচ্ছে, তার পরনে কী পোশাক ছিল? যে বৃদ্ধা ধর্ষিত হচ্ছে, সেই-বা কেমন পোশাক পরে ছিল? যে পাগলিটা নোংরা পোশাকে কোনো রকম তার আব্রু ঢেকে রাখে, সে-ই বা কেমন করে ধর্ষণের শিকার হয়? কেমন করে কামনা জাগায় পুরুষের মনে! হিজাব ও বোরকা পরা নারীও তো ভোগের পণ্য হচ্ছে! তবে কেমন পোশাক পরনে থাকলে আর পোশাককে দায়ী করা হবে না তা প্রশ্নই থেকে গেল।

যে ঘরে আমরা থাকি, আজ তো সেখানেই নিরাপত্তা নেই। ঘরে ঢুকেই ধর্ষণ করছে কিছু বিকৃত রুচির পুরুষ। যে মা তার মেয়েকে হাত ধরে নিয়ে যেতেন, যাতে করে তার কন্যাসন্তানটি নিরাপদে চলতে পারে, এখন সেই মা-ই ধর্ষিত হচ্ছেন। তাহলে মেয়ের নিরাপত্তা কোথায়?

ভাবতে অবাক লাগে, এই সময়ে এসে কেমন করেই-বা ধর্ষণের মাত্রা বাড়তে পারে? যখন করোনাকালীন  উত্কণ্ঠায় আমাদের জীবন চলছে, ঠিক সেই সময়ে এসে কেমন করে এই ব্যাধি আবার সংক্রমিত হচ্ছে? এর কারণে দুই ধরনের উত্কণ্ঠায় আমাদের সময় পার করতে হচ্ছে। আমি নির্দিষ্ট করে কারো উদাহরণ দিতে চাইছি না। তবে এটুকু বলতে পারি, এই সমাজে কোনো নারীরই নিরাপত্তা নেই। অনেকেই বলে থাকেন, ইন্টারনেটে এ ধরনের ভিডিও দেখে কিছু নেশাখোর তাদের কামনা মেটাতে সামনে যাকে পাচ্ছে ধর্ষণ করছে।

আমার প্রশ্ন হলো, এমন কি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় না, যেখানে এই ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ করা যায়? আর নেশা কেনই বা এত সহজলভ্য হয়ে গেছে? তার জবাব কে দেবে? যে শিশুরা গৃহে নিজের কাছের আত্মীয় দ্বারা ধর্ষণের স্বীকার হচ্ছে, মামা-চাচা-শিক্ষক থেকে শুরু করে—আমার লিখতে বিবেক বাধা দিচ্ছে, তবু লেখছি—যে শিশুটি তার আপনজনের কাছেই নিরাপদ নয়, সেখানে আমরা আর কার কাছে নিরাপত্তা আশা করতে পারি? এর জন্য আমি মনে করি বিচারহীনতাই দায়ী। তবে একমাত্র দায়ী তা বলব না। এর সঙ্গে আমাদের সামাজিকভাবে সচেতনতা বাড়াতে হবে। যে সন্তান ধর্ষণে লিপ্ত হচ্ছে তাদের বাবা-মাকেও সচেতন হতে হবে। তারা কোথায় যায়, কী করে, কাদের সঙ্গে চলাফেরা করে, সেদিকে তীক্ষ নজর দিতে হবে। ধর্ষক যে-ই হোক না কেন, তার কোনো জাত থাকতে পারে না, কোনো দল থাকতে পারে না। সে শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত, তার সাজা একই হওয়া উচিত।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছেন, এর জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমার মতে, ধর্ষণের মামলার রায় দ্রুত কার্যকর করে তার সাজা দেওয়া হলে কিছুটা হলেও তাদের টনক নড়বে। আমার শিশুসন্তানটিকে কেমন করে বোঝাব ধর্ষণ কাকে বলে? চিড়িয়াখানায় যেমন করে হিংস্র পশুদের আটকে রাখা হয়, তেমন করে একটা খাঁচায় ধর্ষককে বন্দি করে রেখে তার ওপরে ধর্ষক লিখে রাখতে হবে। তাহলে আমার সন্তানকে বোঝাতে পারব—দেখো, এর নাম ধর্ষক, সেও হিংস্র জানোয়ারের মতো। কবেই বা নিরাপদে হাঁটতে পারব মাথা উঁচু করে? পেছনে ফিরে দেখতে হবে না জানোয়ার পিছু নিয়েছে কি না। ঘরে রেখে যাওয়া সন্তানকে নিয়ে উত্কণ্ঠায় মায়ের কাটাতে হবে না সময়। নিরাপত্তাহীনতায় কাটবে না কোনো তরুণীর সময়। কোনো স্বামীর সামনে হতে হবে না তার স্ত্রীকে ধর্ষণের শিকার। কোনো ভাইয়ের সামনে বোনকে। কবে পাব আমরা সুস্থ সময়, সুস্থ পরিবেশ, সুস্থ সমাজ? মেয়েমানুষ শব্দটি কবে মাথা উঁচু করে কেবলই ‘মেয়ে’ হবে, ‘নারী’ হবে? শুধুই সংসারে আবদ্ধ হয়ে না থেকে নির্ভয়ে পথ চলবে? অবদান রাখবে আমাদের সমাজ-সংসারে নির্ভয়ে? আতঙ্কিত না হয়ে ধর্ষককে পরিচিত করতে হবে এবং করাতে হবে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা।

নারী কেবল ভোগের পণ্য নয়। তার শরীরটাকে ছিন্নভিন্ন করার আগে দেখে নিতে হবে সে মুণ্ডুবিহীন কোনো প্রাণী নয়। সব ধর্মেই নারীকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। সে আমাদের সমাজের সম্মানিত উপাধি পাওয়ার যোগ্য অংশীদার। কোনো সভা-মিছিল করে সে যেন অধিকার আদায়ের জন্য রাস্তায় না নামে। তার সম্মান তার যোগ্যতা যেন শ্রদ্ধার সঙ্গে সে পেয়ে থাকে, সবার কাছে এটাই একান্ত কাম্য।

n লেখক :সাবেক শিক্ষার্থী,

নোয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজ