ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানার হাত থেকে জনগণকে রক্ষায় রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। রায়ে বলা হয়েছে, যার প্রতি পরোয়ানা ইস্যু করা হয়েছে সেই অভিযুক্তের নাম ও ঠিকানা এবং এজাহার বা চার্জশিটে উল্লেখিত মামলার নম্বর ও ধারা সুস্পষ্টভাবে পরোয়ানায় উল্লেখ থাকতে হবে। যারা পরোয়ানা কার্যকর করবেন তাদের নাম, পদবি ও ঠিকানা উল্লেখ করতে হবে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিলমোহরকৃত খাম খুলে প্রাপ্ত গ্রেফতারি পরোয়ানা পরীক্ষা করে এর সঠিকতা যাচাই করে পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য ব্যবস্থা নেবেন। ভুয়া পরোয়ানার শিকার এক ব্যক্তির মামলায় বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল বুধবার সাত দফা নির্দেশনা দিয়ে এই রায় দেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুয়া পরোয়ানায় গ্রেফতার হয়ে অনেক ব্যক্তিকে দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে কাটাতে হয়েছে। এই হয়রানির হাত থেকে রক্ষায় উচ্চ আদালতের এই রায় যুগান্তকারী। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রায়ের নির্দেশনাসমূহ প্রতিপালন করলে ভুয়া পরোয়ানার হাত থেকে নিরপরাধ মানুষ রক্ষা পাবে।
রায়ে আরো ছয় নির্দেশনা :ওপরের নির্দেশনা ছাড়াও আরো ছয়টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে রায়ে। (এক). গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যুর সময় পরোয়ানা প্রস্তুতকারী ব্যক্তিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৭৫ ধারার বিধান মতে নির্ধারিত ফরমে উল্লেখিত চাহিদা অনুযায়ী সঠিক ও সুস্পষ্ট তথ্যাদি পূরণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট জজ বা ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষরের নিচে নাম ও পদবির সিলসহ সংশ্লিষ্ট আদালতের সুস্পষ্ট সিল ব্যবহার করতে হবে। পরোয়ানা প্রস্তুতকারী ব্যক্তির (অফিস স্টাফ) নাম, পদবি ও মোবাইল নম্বরসহ সিল ও তার সংক্ষিপ্ত স্বাক্ষর ব্যবহার করতে হবে।
(দুই). গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রস্তুত হলে স্থানীয় অধিক্ষেত্র কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্ট পিয়নবহিতে এন্ট্রি করে বার্তাবাহকের মাধ্যমে তা পুলিশ সুপারের কার্যালয় কিংবা সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠাতে হবে। পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের বা থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্তৃক উক্ত পিয়নবহিতে স্বাক্ষর করে তা বুঝে নিতে হবে। পরোয়ানা প্রেরণ ও কার্যকর করার জন্য পর্যায়ক্রমে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার কাজে লাগানো যেতে পারে। (তিন). স্থানীয় অধিক্ষেত্রের বাইরের জেলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করার ক্ষেত্রে পরোয়ানা ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষ গ্রেফতারি পরোয়ানা সিলগালা করে এবং অফিসের সিলমোহরের ছাপ দিয়ে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে প্রেরণ করবেন।
(চার). গ্রেফতারি পরোয়ানা গ্রহণকারী কর্মকর্তা সেটি কার্যকর করার আগে পুনরায় পরীক্ষা করে যদি কোনো সন্দেহ পোষণ করেন সেক্ষেত্রে পরোয়ানা প্রস্তুতকারীর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে সঠিকতা নিশ্চিত হয়ে তা কার্যকর করবেন। (পাঁচ). পরোয়ানা অনুসারে গ্রেফতারের পর সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে উক্ত আসামি বা আসামিদের আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেট বা জজ আদালতে পরোয়ানাসহ উপস্থাপন করতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেট বা জজ গ্রেফতারকৃত আসামি কিংবা আসামিদের জামিন প্রদান না করলে আদেশের কপিসহ হেফাজতি পরোয়ানামূলে জেল হাজতে প্রেরণসহ ক্ষেত্রমত সম্পূরক নথি তাত্ক্ষণিকভাবে গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যুকারী আদালত বরাবর প্রেরণ করবেন। (ছয়). সংশ্লিষ্ট জেল সুপার কিংবা অন্য কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হেফাজতি পরোয়ানামূলে প্রাপ্ত আসামি বা আসামিদের গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যুকারী আদালতে অবিলম্বে এই মর্মে অবহিত করবেন যে, কোন থানার কোন মামলার সূত্রে বা কোন আদালতের কোন মামলায় বর্ণিত আসামিদের পরোয়ানামূলে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে আসামিদের নতুন কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা পেলে জেল সুপার পরবর্তী গ্রেফতারি পরোয়ানার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালত হতে নিশ্চিত হয়ে পরোয়ানা কার্যকর করবেন।
এই নির্দেশনাসমূহ বাস্তবায়নের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, সুরক্ষা ও সেবা বিভাগের সচিব, আইন সচিব, পুলিশের আইজি, আইজি প্রিজন্স ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে রায়ের অনুলিপি সব দায়রা জজ ও মহানগর দায়রা জজসহ সব ট্রাইব্যুনাল, বিশেষ জজ আদালতের বিচারক, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে অবগত করতে বলা হয়েছে।
আশুলিয়ার মির্জা নগর এলাকার আওলাদ হোসেন গণস্বাস্থ্য কেন্দে র কৃষি বিভাগের প্রোগ্রাম অফিসার। কক্সবাজারের একটি নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলায় গত বছর ৩০ অক্টোবর তাকে আশুলিয়া থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর তাকে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে হাজির করা হয়। কিন্তু গ্রেফতারি পরোয়ানাটি ভুয়া হওয়ায় তাকে জামিন দেয়নি আদালত। পরে তার বিরুদ্ধে একাধিক ভুয়া পরোয়ানা তৈরি করে এক আদালত থেকে আরেক আদালতে হাজির করা হয়। পরে এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন তার স্ত্রী।