জানা-অজানা

বাটারফ্লাই ইফেক্ট

কোনো একটি স্থানের ছোট একটি পরিবর্তন পরবর্তীকালে অন্য কোনো জায়গার বড় ধরনের ঘটনার জন্য দায়ী হতে পারে। এটি পরিচিত ‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ নামে। এই নামটি মূলত এসেছে প্রজাপতির ডানা থেকে।  আমেরিকান ম্যাথমেটিশিয়ান ও আবহাওয়াবিদ এডওয়ার্ড লরেঞ্জ এটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন।

আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্সের ১৩৯তম অধিবেশনে এডওয়ার্ড লরেঞ্জ একটি বিশেষ প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। প্রশ্নটি ছিল এমন যে, ব্রাজিলে যদি কোনো একটি প্রজাপতি তার ডানা ঝাপটায়, তবে সেই ডানা ঝাপটানোর সুবাদে টেক্সাসে টর্নেডো হতে পারে কি না?

আপাতদৃষ্টিতে হাস্যকর মনে হলেও এডওয়ার্ড লরেঞ্জ গাণিতিকভাবে দেখান যে, বিশ্বের যে কোনো তরঙ্গকে সামান্য পরিবর্তন করা হলে সেই পরিবর্তন বিশ্বের অন্য সব তরঙ্গকে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করে। এ বিষয়টি তরঙ্গের উপরিপাতন (Superposition of wave) দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায়। তাঁর মতে, পরিবেশ বা আবহাওয়ার সূক্ষ্ম কোনো পরিবর্তন পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের প্রাকৃতিক পরিবর্তন বা দুর্যোগের কারণ হতে পারে।

১৯৬১ সালে আবহাওয়াসংক্রান্ত এক গবেষণায় নিয়োজিত থাকার সময় লরেঞ্জ বিস্ময়কর একটি ব্যাপার লক্ষ করেন। তিনি তাঁর কাগজের ফাইল থেকে যাবতীয় ডাটা নিউমেরিক্যাল কম্পিউটারে লেখার সময় দশমিকের পর ছয়টি সংখ্যা না নিয়ে তিনটি সংখ্যা (সংখ্যাটি ছিল ০.৫০৬১২৭) নিয়ে হিসাবের ফলাফল বের করেন। ফলাফল আগের পূর্বাভাস থেকে সম্পূূর্ণ আলাদা ছিল, যদিও এমনটি হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। তিনি ভেবেছিলেন যে তার হিসেবে বা মেশিনে কোনো সমস্যা আছে। তিনি আবার ডাটাগুলো কম্পিউটারে লিখে আগামী দুই মাসের আবহাওয়ার পূর্বাভাস বের করে যা দেখলেন তা ছিল বিস্ময়কর। আগের হিসেবের সঙ্গে এর কোনো মিলই নেই! এত ক্ষুদ্র কিছু ডাটার জন্য আবহাওয়ার এই পুরোপুরি বিপরীত রূপ দেখে তিনি অবাক হন। ১৯৬৩ সালে এর ওপর ভিত্তি করে তিনি একটি তাত্ত্বিক গবেষণাপত্র বের করেন যা পরবর্তীকালে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। এভাবেই জন্ম নেয় বাটারফ্লাই ইফেক্ট নামের বিশৃঙ্খলা তত্ত্ব (Theory of Chaos)।

এই প্রভাবকে ‘প্রজাপতি প্রভাব’ বলার পেছনে একটি কারণ আছে। লরেঞ্জ যখন তাঁর এই আবহাওয়ার পূর্বাভাস মডেল নিয়ে কাজ করছিলেন, তখন আবহাওয়ার বিভিন্ন প্রভাবক যেমন তাপমাত্রা, বাতাসের গতি বা আর্দ্রতার অনেকগুলো মান ব্যবহার করেছিলেন। তিনি দেখলেন যে প্রতিবারই আলাদা ফলাফল পাচ্ছেন। কিছুতেই তিনি একটি নির্দিষ্ট ফলাফল আবার তৈরি করতে পারছেন না। তিনি বিভিন্ন প্রভাবকের মানও একটু হেরফের করে দেখলেন, কিন্তু প্রতিবারই ভিন্ন ফলাফল আসতে থাকে। তার ব্যবহূত এসব মানকে গ্রাফে বসালে এমন একটি গ্রাফ পাওয়া যায়, যা দেখতে অনেকটা প্রজাপতির মতো।

শুধু আবহাওয়া নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও ‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’-এর প্রভাব রয়েছে। আমাদের ছোট ছোট কাজ, ক্ষুদ্র চিন্তাভাবনা পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে আমাদের জীবনে। আমরা সবাই ভবিষ্যতের কথা ভেবেই আমাদের বর্তমানের কাজকর্ম সাজাই। আমাদের একটিমাত্র পদক্ষেপই যদি সহস্র সম্ভাবনা বদলে দিতে পারে, হয়তো আমাদের ভবিষ্যত্ও বদলে দিচ্ছে মহাবিশ্বের কোনো প্রান্তের অন্য কেউ!