সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী হিসেবে আমরা কতটা স্মার্ট?

আমাদের দৈনন্দিন এখন সোশ্যাল মিডিয়াময়। আবেগ অনুভূতি, প্রয়োজন, অপ্রয়োজন, তথ্য-উপাত্ত, গুজব—সবকিছুই এখন সোশ্যাল মিডিয়াকে ঘিরে। কিন্তু এই মাধ্যমটির ব্যবহারকারী হিসেবে আমরা কতটা সচেতন? এই প্রশ্নটিকে সামনে রেখেই আমাদের এবারের আয়োজনে উঠে এসেছে বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের বিভিন্ন নেতিবাচক দিকগুলো।

সম্পাদনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও গ্রন্থনা করেছেন সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার

 

 

সবকিছুই কি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করছেন?

সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক দিকটাও যে মানবসৃষ্ট এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। যেহেতু ব্যবহারকারীদের বেশিরভাগই তরুণ, তাই যেকোনো সমস্যায় বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন তরুণেরাই। সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে নেহাত মজার ছলে কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যার জের ধরে ভুয়া খবর রটিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত ও অহেতুক হয়রানি করার ঘটনা অহরহ ঘটছে। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোকে এখন অনেকে মিথ্যা মনে করে এড়িয়ে যান। এখানে এমনকি জীবিত মানুষকে মৃত ঘোষণা করে আবার মৃত মানুষকে জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনার মতো ভুয়া খবরও আমাদের সবার চোখেই পড়ে। একশ্রেণির মানুষ কাউকে ট্রল করতে, অন্যকে নিয়ে সোশ্যাল সাইটগুলোতে বাজে মন্তব্য করতে গিয়ে দু বার ভাবে না। উসকানিমূলক মন্তব্য করে অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে কোন্দল সৃষ্টি হওয়ার মতো ঘটনার নজিরও আছে। আর ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে অবলীলায় এই মানুষগুলো তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কাউকে আক্রমণ করার জন্য ফেসবুকসহ অন্যান্য সোশ্যাল সাইট যেন এখন ধারালো অস্ত্রের মতোই কাজ করছে।

অন্যদিকে, অনেকেই মাথায় যখন যা ঘুরপাক খায় সেটাই ফেসবুকে পোস্ট করেন, তা যতই ব্যক্তিগত হোক না কেন! আমাদের ফ্রেন্ডলিস্টের সবার সঙ্গেই যে আমাদের সম্পর্ক খুব ভালো এমন তো নয়। কখনো রাগের মাথায়, কখনোবা খুব ইমোশোনাল হয়ে আমরা ফেসবুকে এমন কোনো কিছু পোস্ট করে ফেলি, যেটা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরক্ষণেই ডিলিট করে ফেলি। কিন্তু এটুকু সময়ের মধ্যে ব্যক্তিগত সমস্যাটা হয়তো অনেকের চায়ের আড্ডার মুখোরোচক বিষয় হয়ে যায়। অনেকের ক্ষেত্রেই এমন হয়েছে যে, ফেসবুক বন্ধুদের সঙ্গে সমস্যা শেয়ার করে সমাধান খুঁজতে গিয়ে সমস্যার সমাধান তো হয়-ই না, বরং নানা উটকো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তা ছাড়া খুব কাছের মানুষ, বন্ধু বা পরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে মতের অমিল কিংবা মন কষাকষি হলে সেটাও অনেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে ফেলেন। দুই পক্ষের এই সমস্যাগুলো অনেক সময় তারা নিজেরা চাইলেই খুব সহজে মিটমাট করতে পারেন। কিন্তু পাবলিকলি শেয়ার করার ফলে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ কখনো কখনো দুই পক্ষের মধ্যে মীমাংসা করে না দিতে পারলেও, শেষ চেষ্টা করার অবশিষ্ট পথটাও বন্ধ করে দিয়ে যায়।

তাই নিজের ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনের কিছু বিষয় সোশ্যাল মিডিয়ায় ঠিক কতটুকু, কিভাবে উপস্থাপন করা উচিত তার একটা সীমা নির্ধারণ করে, একটু সতর্কতা ও সচেতনতা অবলম্বন করলে এই সমস্যাগুলো হয়তো অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব হবে।

 

পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে, এখন মুঠোফোনে বন্দি

স্কুল-কলেজে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুবান্ধব বা কখনো মনে মনে খুঁজে ফেরা মানুষটাকে এখন খুব সহজে ফিরে পাওয়া যায়। পুরোনো আবেগ, ভালোবাসা নতুন করে ফিরিয়ে দেওয়ার কারিগর হলো আজকের দুনিয়ার ফেসবুক। যোগাযোগের ব্যাপারটা যেন আরও বেশি সহজ করে তুলেছে হালের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক। শুধু যোগাযোগ নয়, নিজেকে প্রকাশ করার যে তৃপ্তি তাও সম্ভব হয়েছে এই ফেসবুকের কল্যাণে।         

কখন ফোন আসবে, কখন অপেক্ষার শেষ হবে এই তাগিদে শুরু হলো হোয়াটসঅ্যাপের চলন। আর তা এতই যুগপোযোগী হয়ে উঠেছে যে কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষাও করতে হয় না। কারও জন্য সারাদিন অপেক্ষা করার প্রয়োজন হয় না, এক মিনিটে হোয়াটসআপ করে জেনে নেওয়া যায় নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে। এমনকি এখন চায়ের আড্ডায় ঝড় ওঠে না, বরং হোয়াটসআপের আড্ডায় ঝড় উঠছে প্রতি মুহূর্তে। যেকোনো বয়সের মানুষের জন্য এই মাধ্যম এখন খুব জনপ্রিয়। নিজেদের যত ভালো-মন্দ মুহূর্তগুলোও এখানেই প্রকাশ করছে সবাই। আর ভিডিও চ্যাটের উপকারিতা বলে শেষ করা যাবে না। মা-সন্তানের ভালোবাসা, স্বামী-স্ত্রীর শপিং সমস্যা এক নিমিষেই মিটিয়ে ফেলছেন তারা এই ভিডিও চ্যাটের মাধ্যমে।      

গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে যেই ভাববেন পথ হারাবেন হয়তো, অমনি জিপিএস আপনাকে পথ দেখাতে শুরু করবে। সারাদিন কাজের শেষে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তায় খেয়াল হলো, বাড়ি গিয়ে খাবেন কী! চাল, ডাল, তেল, ডিম, পাউরুটি, মাখন, মসলা, সবজি, তরিতরকারি, আমিষ—কিছুই তো ঘরে নেই। এ সময়ও সেই মুঠোফোনই ত্রাণকর্তা। এ বোতাম সে বোতাম টিপে অনলাইন অর্ডার দিয়ে দিলেন। মুহূর্তেই দোরগোড়ায় যাবতীয় দরকারি জিনিস হাজির। হঠাত্ মনে পড়ল, বাবা-মাকে একটা ফোন করবেন। অ্যান্ড্রয়েড ফোনটা হাতে নিয়ে বলুন, ‘ওকে গুগল, কল বাবা!’ চট করে কল চলে যাবে।

এ এক এমন যন্ত্র, যা থেকে চাইলেও দূরে থাকা এখন অসম্ভব কাজ বটে। আর কেনই বা থাকব, এর এত এত যে উপকারিতা! দুনিয়া যে এখন হাতের মুঠোয়, তা তো শুধু এর কারণেই সম্ভব হয়েছে। এই যেমন জল, গ্যাস, বিদ্যুতের সব বিল বাকি, কিছুই মেটানো হয়নি! মোবাইল টিপে অনলাইন পেমেন্ট। আবার রাতে ঘুমানোর সময় গান শোনা, সকালে উঠে অ্যালার্মে ঘুম ভাঙ্গা, সবই করে দিচ্ছে এই মুঠোফোন। মহিনের ঘোড়াগুলোর সেই বিখ্যাত গান—‘পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে স্যাটেলাইট আর ক্যাবলের জালে ড্রয়িং রুমে রাখা বোকাবাক্সতে বন্দী...’ এখন সেই বোকাবাক্স ড্রয়িংরুমে রাখা দরকার পড়ে না। স্যাটেলাইট, ক্যাবলের সব কাজই করে দেয় পকেটের সেই ছোট বুদ্ধিমান বাক্স—মুঠোফোন!

 

বোঝা দায়, কখন কোথায় কে কাকে ট্রল করে বসে

 

বলিউডের তারকা প্রিয়াঙ্কা চোপড়া বিয়ে করছেন। প্রিয়াঙ্কার বর তারচেয়ে বয়সে ছোট, এ নিয়ে মানুষের চিন্তার শেষ নেই। প্রবাদ আছে, যার বিয়া তার খবর নাই পাড়াপড়শির ঘুম নাই। এটারই বাস্তব চিত্র আজকাল দেখা যাচ্ছে ফেসবুকে! একই ঘটনা বাংলাদেশের ক্রিকেটের তারকা সাকিব আল হাসানের বেলায়, তাসকিনের আহমেদের বেলায়। তারা তাদের পছন্দমতো বিয়ে করেছেন, অথচ এ নিয়ে ভক্তদের মধ্যে অনেকেই আক্রমণাত্মক মন্তব্য করতে পিছ-পা হচ্ছেন না!

অন্যের স্ত্রীকে দেখতে কেমন লাগছে, সাজটা কেমন হলো, এত জৌলুসমাখা ছবি কেন আপলোড করল, সবকিছুতেই পাণ্ডিত্য জাহির করতেই হবে। 

একটা পর্যায়ে যেকোনো বিষয়ে অতিরিক্ত আলোচনা থেকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করতে করতে তা ট্রলে পরিণত হচ্ছে। ট্রল হলো যেকোনো বিষয়কে ব্যঙ্গ করে প্রচার করা।

যেমন ভারতীয় ক্রিকেটার, ব্যাটসম্যান বিরাট কোহলি। বিয়ে করেছেন রুপালি পর্দার তারকা আনুশকা শর্মাকে। এ নিয়ে মানুষের কত জল্পনাকল্পনা! ক্রিজে বোলারদের সামলানোর পাশাপাশি কোহলিকে ট্রলারদেরও সামলাতে হয়েছে!

আসলে স্রেফ মজা করে কাউকে নিয়ে কিছু বলা আর হেনস্থা করার মাঝে যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে, সেটা আন্দাজ করতে পারেন না সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের অধিকাংশ। যার জেরে সোশ্যাল মিডিয়ায় মাঝেমধ্যেই তারকারা আক্রান্ত হন, তবে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করতে চান না!

বাদ যাচ্ছেন না কেউই। যেমন হিরো আলম। গরিব ছিলেন। চেহারায় সুদর্শন নন। খাটো আকৃতির মানুষ। কিন্তু তার শখ ছিল তিনি পর্দায় তারকা হবেন। যেমনটা পারেন না কেন, তিনি তার মতো করে চেষ্টা করেছেন। অনেকে হিরো আলমের চেষ্টার প্রশংসা করেন। কিন্তু ট্রল কি কম হয়?

ট্রলের তালিকায় রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে বাদ যাচ্ছেন না কেউই। দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, সাংসদ, স্থানীয় নেতা, সবাই কমবেশি বিভিন্ন সময় ট্রলের শিকার হচ্ছেন। 

ট্রল করবেন করুন, মজা করবেন করুন। কোনো অসুবিধা নেই। মজা করার অধিকার সবার আছে। মজা করলে একটু হাসার সুযোগ পাবেন, হাসলে শরীর ও মন ভালো থাকবে।

কিন্তু আজকাল কে কখন কোথায় কাকে ট্রল করে বসে তা তো বোঝা দায়! তাই ট্রল করার আগে মাথায় রাখতে হবে, এটা যেন স্রেফ মজার উদ্দেশ্যেই করা হয়। কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করার জন্য নয়। একসময় দেশের গুরুত্বপূর্ণ কোনো ইস্যুতে রাজনীতিবিদদের কোনো কথা বা আচরণকে ব্যঙ্গ করে কার্টুন প্রকাশ করা খুব জনপ্রিয় ছিল। এতে সবাই মজা পেতেন। যাকে নিয়ে কার্টুন আঁঁকা হয়েছে, তিনিও আহত হতেন না। এই নিছক মজার আড়ালেও থাকত কোনো একটা মেসেজ। এখন হয়তো সেই ছাপা কার্টুনের আবেদন কমে গিয়ে ট্রলই বেশি আকর্ষণ কাড়ছে, কিন্তু ট্রল কাউকে আহত করছে কি না সেটা মাথায় রাখতে হবে। 

 

নিউটনের সময় ফেসবুক থাকলে

মহাকর্ষ সূত্র কি আবিষ্কার হতো?

নিউটনের সময় ফেসবুক থাকলে তিনি কি মহাকর্ষের সূত্রগুলো আবিষ্কার করতে পারতেন? বিজ্ঞানী নিউটনের মাথায় যখন আপেল পড়ল, তখন তিনি চিন্তা করলেন, আপেলটা নিচের দিকে কেন পড়ল, উপরের দিকে গেল না কেন? তারপর তিনি অনেক গবেষণা করে মহাকর্ষের সূত্রগুলো আবিষ্কার করেন। কিন্তু তার সময় ফেসবুক থাকলে দেখা যেত তিনি ফেসবুকে আপেলের সঙ্গে নিজের সেলফি আপলোড করে জিজ্ঞেস করতেন, ‘বন্ধুরা গাছ থেকে আপেলটা নিচের দিকে কেন পড়ল?’ তখন হয়তো তার কোনো বন্ধু মজা করে বলতেন, ‘উপরে যে আপেল খাওয়ার কেউ নাই।’ এই হাসি-তামাশার মধ্যেই দিন কাটিয়ে ফেলতেন আর আমরাও বেঁচে যেতাম এসব কঠিন সূত্র পড়াশোনা করার থেকে।

আমরা সবাই এখন কম বেশ ফেসবুক, টুইটার ও ইন্সটাগ্রাম ব্যবহার করি। এই সোশ্যাল সাইটগুলোতে নিজেদের ছবি দেওয়ার আগে ভালো মতো এডিট করে মোটা লাগলে চিকন করে নিই, ভালোমতো ফর্সা করি। এতে করে নিজের নিজস্বতা আর থাকে না। আমি হয়ে যাই এক অন্য আমি। আর অন্য ‘আমি’র জন্যই কমেন্ট বক্স প্রশংসায় ভেসে যায়।

ইদানীং সেলফি তোলাও একটা মহামারী রোগের আকার ধারণ করেছে। নতুন কোনো জায়গায় ঘুরতে গেলে আগে আমাদের মাথায় ঘুরে কিভাবে নিজের সেলফির মধ্যে নতুনত্ব আনা যায়, যা দেখে মানুষ খুশি হবে। সেলফিতে লাভ রিয়েক্ট দেবে আর কমেন্টে বাহবা দেবে। এই ভার্চুয়াল বাহবার মোহে আমরা নিজেরা তখন এনজয় করাটা ভুলে যাই। এসব দিক বিবেচনায় এটা বলা যায়, সোশ্যাল সাইট কখনো কখনো আমাদের অগ্রগতিতে বাধা স্বরূপ। কিন্তু আবার এই সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য মুহূর্তের মধ্যেই ইমার্জেন্সি রোগীর জন্য রক্তদাতা খুঁজে বের করা যাচ্ছে। আবার মানুষজন অনলাইনে নিজেদের কাজের বিজ্ঞাপন দিতে পারছে। আগে টিভিতে যেমন বিজ্ঞাপন দিয়ে কাস্টমারদের আগ্রহ বাড়িয়ে তুলত, সেই জিনিসটাই বরং আরও বড় পরিসরে আরও ইফেক্টিভলি করা যাচ্ছে অনলাইনে আর সোশ্যাল মিডিয়াগুলোয়।

আবার অনেক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও অনলাইন এখন অনেক বড় একটি ক্ষেত্র। আগে গুটি কয়েক মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও এখন তা পৌঁছে গেছে সবার ঘরে ঘরে। তাই কোনো এক বিষয় নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করলে সেই প্রতিবাদে সাড়া দিতে পারছেন লাখো কোটি মানুষ নিজের ঘরে বসেই। সামান্য একজনের প্রতিবাদ হয়ে উঠছে গণআন্দোলন।

আবার এই অনলাইনেই ট্রল করার ব্যাপারটাও বেশ ভালোভাবেই হচ্ছে এখন। মজার কিছু হোক বা না হোক সবাই সব জায়গায় মজা নিতে পটু হয়ে যাচ্ছে। কেউ তার বোনের সঙ্গে ছবি দিল ফেসবুকে, দেখা যাবে মানুষ কমেন্ট করছে ‘নতুন বান্ধবীর সঙ্গে ভালো লাগছে’। এসবের কারণে অনেকেই সোশ্যাল সাইট এভয়েড করে চলে উটকো ঝামেলা মনে করে। 

 

মিথ্যা খবরের ভিড়ে চাপা পড়ে যায় অনেক দরকারি খবর

শুরুর দিকে সোশ্যাল মিডিয়া ছিল শুধু যোগাযোগের মাধ্যম। এর মাধ্যমে দূরে থাকা পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করা যায় বলে এর গ্রহণযোগ্যতা ছিল অনেক বেশি। তখন থেকেই এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবেই নিয়েছি। তবে বর্তমানে এর মাত্রা একটু বেড়েছে। শেয়ার করা কিছুতে যত বেশি লাইক, তত বেশি ভালোলাগা কাজ করে সবার মধ্যে। নিউজ শেয়ার করা হলে সেটারও প্রসার বাড়ছে। আবার এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। উসকানি দিতে চায়—এমন ব্যক্তি বা নিউজ পোর্টাল ভুল তথ্য বা ভুল খবর হেডলাইন করে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে, তখনো সেটাও ছড়িয়ে পড়ে দ্রুতগতিতে। আবার অনেকে ওইসব নিউজের হেডলাইন পড়েই কমেন্ট করে বসছেন, নিউজটি খুলে পড়েনও না।

ফেসবুক, টুইটার ও এই ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি গুজবের রমরমা দেখা যাচ্ছে এবং যারা পাঠক বা দর্শক আছেন, তারা গুজবটাকেই প্রকৃত খবর থেকে বেশি গ্রহণ করছেন। এই ধরুন না ২০১৬ সালের মার্কিন ইলেকশনের কথাটাই। ফেসবুকের ভুয়া খবরে জনমত ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। ভুয়া খবর জনগণের মতামতকে অন্যদিকে টেনে নিয়েছে, যার ফলাফল নির্বাচনে প্রকাশিত হয়েছে, হিলারি যাবতীয় জরিপে এগিয়ে থাকলেও নির্বাচনে জয়ী হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প, এবং অনেক নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মনে করছেন এর পিছনে রয়েছে ফেসবুকের ভুয়া খবরের প্রভাব। এইসব ভুয়া খবরে একজন নারী হিসেবে হিলারি ক্লিনটনকে অবমাননা করা হয়েছে, তাকে দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে; অর্থাত্ যে সাধারণ মানুষ খুব বেশি সচেতন নয়, সে এইসব খবর পড়ে খুবই প্রভাবিত হওয়ার কথা, এবং তা-ই হয়েছে বলা চলে।

ইন্টারনেট ব্যবহারীকারীদের অধিকাংশের ক্ষেত্রেও সংবাদ আহরণের প্রধান মাধ্যম ফেসবুক। তাই এদের কাছে ভুয়া খবর, গুজব পরিবেশন করা হলে তা চক্রবৃদ্ধিহারে সামাজিকভাবে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর প্রভাব টের পাওয়া যায় সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের প্রতিক্রিয়ায়। দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে ভুয়া খবর ও গুজবের প্রতি সরকারের যেমন মনোযোগ দেওয়া দরকার তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোরও সজাগ থাকা দরকার কিভাবে এই ভুয়া খবর ও গুজবকে ব্যবহার করে জনমতকে প্রভাবিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এবং সাম্প্র্রতিক কিছু বিপর্যয়ে ফেসবুক কেন্দ্রিক ভুয়া খবরের ভাইরাল হওয়া দায়ী।

ফেসবুক নিজেকে একটি সেবা হিসেবে দাবি করলেও এটি মূলত একটি ব্যবসা, এটি শেয়ারবাজারে নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠানের আয়ের উত্স। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ফেসবুক তার আয়ের প্রধান অংশ কামাই করে, তাই হয়তো এইসব ভুয়া খবরে ফেসবুকের আয়ের কমতি নয়, বরং বাড়তি সম্ভাবনা থাকার কারণে ফেসবুক ভুয়া খবর নিয়ন্ত্রণে উদাসীন। তাই তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার সময় এসে গেছে।