করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীরাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলিত জীবনের বাইরে একটি নতুন জীবন পেয়েছে, হোমওয়ার্ক নেই, ঘণ্টা ধরে পড়া নেই, শিক্ষকের শাসন নেই। মুক্ত, স্বাধীন। তাদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে স্মার্ট ডিভাইস। লুডু, দাবা, ক্যারাম ঘরোয়া এসব খেলার চাইতে ডিভাইসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে তারা। বাইরের বইয়ের প্রতি অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের আকৃষ্ট করতে চাইলেও, তা উপেক্ষা করে বন্ধ-বান্ধবদের সঙ্গে অনলাইনে সময় কাটানো, ভিডিও দেখা, গেম খেলা ইত্যাদি বিষয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।
স্মার্ট ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহারে শিক্ষার্থীরা শারীরিক ক্ষতি যেমন চোখ, কান, পেটসহ বিভিন্ন রোগে তারা আক্রান্ত হবে। আচার-ব্যবহারেও আসবে পরিবর্তন। স্বাভাবিক স্বভাবটা, খিটখিটে স্বভাবে পরিবর্তন হবে। সবচেয়ে বড় যে সমস্যায় পড়বে তা হলো মস্তিষ্কের সমস্যা। প্রত্যেকটি মানুষের শরীরে যেমন পুষ্টি দরকার, তেমনি মস্তিষ্কেরও পুষ্টি দরকার হয়। মস্তিষ্কের পুষ্টি হলো ভালো চিন্তা। সারা দিন ফেসবুক-ইউটিউবে থাকলে মস্তিষ্কের সৃজনশীলতা নষ্ট হয়ে যায়। ভালো চিন্তা বাদ দিয়ে খারাপ চিন্তাগুলো মস্তিষ্কে ঘুরপাক খায়। রুটিন পরিবর্তন হয়ে সারা রাত অনলাইনে থেকে দিনের বেলা ঘুমায়। অনেকেই নিজের রুমে একান্তে সময় কাটাতে পছন্দ করে। ভয়ংকর ব্যাপার হলো ভিডিও গেমস বা পর্ণোগ্রাফির প্রতিও আসক্ত হয়ে পড়ছে অনেকেই।
সরকার শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাস কার্যক্রম চালু করেছে। অনলাইনে ইন্টারনেট ব্যবহার করে ছয়টি পদ্ধতিতে ভার্চুয়ালি ক্লাস শুরু হয়েছে। বেশ কয়েকটি পদ্ধতিতে ভার্চুয়াল ক্লাস নেওয়ার পদ্ধতি থাকলেও ইউটিউব লাইভ, ফেসবুক লাইভ, গুগল ক্লাসরুম, মাইক্রোসফট টিম, জুম এবং কোর্সের পদ্ধতিতে ক্লাস কার্যক্রম চলছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্লাসের লেকচার শিট আপলোড করা যায়, সেখানেও শিক্ষার্থীদের বাসার কাজ দেওয়া যায়। অ্যাসইনমেন্টের জন্য গুগুল ফরম, গুগল ডক, গুগল ড্রাইভ ও ইউটিউব ভিডিও যুক্ত করার সুযোগ আছে। ক্লাসরুম থেকে যাওয়ার পর ক্লাসের ভিডিওগুলো পরেও নেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। অনলাইনে ভার্চুয়াল ক্লাস কার্যক্রম প্রশংসনীয় হলেও, দেশের অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী এই কার্যক্রমের বাইরে। যাদের ইন্টারনেট ও ডিজিটাল ডিভাইস নেই, তাদের জন্য ৩৩৩৬ কল সেন্টারের মাধ্যমে (টোল ফ্রি নম্বর) শিক্ষা সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এত ব্যবস্থা নেওয়ার পরেও প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের কতটি পরিবার তাদের সন্তানের জন্য স্মার্ট ডিভাইস পরিচালনায় সক্ষম?
যাদের হাতে স্মার্ট ডিভাইস ছিল না, অনলাইন ক্লাসের কথা বলে স্মার্ট ডিভাইস সংগ্রহ করেছে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, যাদের হাতে স্মার্ট ডিভাইস রয়েছে, তাদের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নিজস্ব অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তাদের ইন্টারনেট অ্যাকটিভ রয়েছে। সুযোগ পেলেই ঘুরে আসছে অনলাইনের অজানা ভুবন থেকে। যারা অনলাইনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় থাকছে, তারা নিজেরাই তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে, বলার অপেক্ষা রাখে না। উঠতি বয়সের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিচার-বিবেচনা এখনো পাকাপোক্ত হয়নি, তারা নিজেদের ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা রাখে না। তাই স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহারের সময় অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখবেন, নতুবা আপনার চোখে ধুলো দিয়ে আপনার সন্তান, আপনার সামনেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রভাষক, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ পাবলিক কলেজ,
ঢাকা