গল্প-কথায় পদার্থবিজ্ঞান:চুম্বকের ডোমেইন তত্ত্ব

মাধব রায়, সহকারী অধ্যাপক, ব্লুবার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ

শুক্রবার দিন নীলকান্তবাবু তানভীর সাহেবদেরকে সিলেট ঘুরিয়ে নিয়ে এলেন। প্রথমে গেলেন রাতারগুল। একটা গাড়িতে করে আনজুম, কমলা, অণু, চন্দ্রা, রেখা, সীমা, আকাশ, বিন্দু আর এরা দুই বন্ধু। বিন্দুর আনন্দ আর দেখে কে। রাতারগুলের জলাবন ঘুরতে গিয়ে এক অন্যরকম অনুভূতি। নৌকা করে ঘুুরতে ঘুরতে পানির মধ্যে গাছের ছায়া, অপরূপ সৌন্দর্য। এরপর গেলেন জাফলং। পাথর তোলার দৃশ্য চমত্কার। পানিতে ভেসে ডুবে আসছে পাথর। বিন্দুর শুধু নেশা ম্যাগনাস নামে যে রাখাল বালক লাঠির মাথার লোহা দিয়ে চুম্বক আবিষ্কার করে ফেলেছে, জাফলং এর পাথরে এরকম কোনো চুম্বক মেলে কি না। পাথর খণ্ড পেলেই হাতের ঘড়িটা কাছে নিয়ে দেখছে লেগে থাকে কি না। এই নিয়ে তানভীর সাহেব হাসলেন।

জাফলং সীমান্তে ভারতের ডাউকি পাহাড়। ডাউকি নদী দুই দেশকে আলাদা করে রেখেছে। নদীর ওপর একটা ঝুলন্ত ব্রিজ আছে, ভারতের অংশে। গাড়ি যাতায়াত করে। বাংলাদেশ থেকে দেখতে খুব ভালো লাগে। নদীর বাংলাদেশ অংশে নৌকা করে বেড়ানো যায়। নৌকায় বসেও আকাশ তানভীর সাহেবকে প্রশ্ন করতে ছাড়ে না। সে একটু ভালো করে বুঝে নিতে আগ্রহী। আঙ্কেল, পদার্থ কেন একটা ডায়াচৌম্বক, একটা ফেরোচৌম্বক আর একটা প্যারাচৌম্বক?

আনজুম বললেন— ভালো বলেছ। এটি ডোমেইন তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।

বিন্দু বলল- ডোমেইন তত্ত্ব আবার কি?

আনজুম তানভীর সাহেবকে বললেন— তুমি বুঝিয়ে দাও না, ডোমেইন তত্ত্বটা ওরা ভালো বুঝবে।

তানভীর সাহেব বললেন- স্পিন বোঝ ?

সীমা বলল— স্পিন বল, ক্রিকেটে যে বল করে, শ্যান ওর্য়ান তো স্পিন বল করত।

হ্যাঁ এই রকমই। স্পিন মানে ঘূর্ণি। স্পিন বলকে ঘূর্ণি বল বলে না?

মাথা ঝাঁকালো সবাই। তানভীর সাহেব আবার বললেন, আমরা তো জানি পদার্থের পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে বৃত্তপথে চক্কর দেয়। ইলেকট্রনগুলো আবার লাটিমের মতো নিজ অক্ষের ওপর পাক খায়। এই ঘূর্ণিকেই বলে স্পিন।

অণু বলল- ও, এই জন্যই স্পিন বল ঘুরে ঘুরে বোল্ড করে।

হ্যাঁ। ইলেট্রন হলো চার্জযুক্ত কণা। চার্জযুক্ত কণা ঘূর্ণনের জন্য পরমাণু মধ্যে চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি করে। পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রনগুলো যে কোনো অভিমুখে ঘূর্ণায়মান থাকে। কোনো পরমাণুতে যদি সমান সংখ্যক ইলেকট্রন পরস্পর বিপরীতমুখী হয়ে ঘুরে, তাহলে একটি ইলেকট্রন যে চৌম্বকক্ষেত্র উত্পন্ন করে অন্য ইলেকট্রন তার বিপরীতমুখী চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি করে তা নষ্ট করে দেয়। অর্থাত্ এই পদার্থে কোনো লব্ধি চৌম্বকক্ষেত্র থাকে না। এই পদার্থকে কোনো শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রে স্থাপন করা হলে ইলেকট্রনের ঘূর্ণন সামান্য প্রভাবিত হয়ে ক্ষীণ চৌম্বকত্ব সৃষ্টি হয়। এদেরকে বলা হয় ডায়াচৌম্বক বা অচৌম্বক পদার্থ বা তিরশ্চৌম্বক পদার্থ।

বিন্দু নদী থেকে পানি হাতে নিয়ে বলল- পানি তো এই ধরনের পদার্থ, তাই না আঙ্কেল।

তানভীর সাহেব বললেন— হ্যাঁ, পানি, তামা, বিসমাথ, দস্তা, রুপা, সোনা, সীসা, আর্গন, হিলিয়াম, মার্বেল, ইত্যাদি এই ধরনের ডায়াচৌম্বক পদার্থ।

কমলা বললেন— বিন্দু পানিতে হাত দিস না, পড়ে গেলে কিন্তু  বিপদ হবে।

অণু বলল— কিন্তু আপনি যে বললেন ডোমেইন তত্ত্ব, সেটা কি?

বলছি, বললেন তানভীর সাহেব। কোনো পরামাণুতে যদি ঘূর্ণনরত বিপরীতমুখী ইলেট্রনের সংখ্যা সমান না থাকে, তাহলে ইলেক্ট্রন দ্বারা সৃষ্ট চৌম্বকক্ষেত্র নাকচ হয় না। তখন পরমাণুটি ক্ষুদ্র চৌম্বক হিসেবে আচরণ করে। যাকে বলা হয় চৌম্বক দ্বিপোল। দ্বিপোলগুলো বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে থাকে বলে এই ধরনের পদার্থে কোনো লব্ধি চৌম্বকক্ষেত্র বোঝা যায় না। কিন্তু যদি অন্য কোনো চৌম্বকক্ষেত্রে স্থাপন করা হয়, তাহলে দ্বিপোলগুলো আংশিকভাবে বিন্যস্ত হয়ে পড়ে এবং সামান্য চৌম্বকত্ব প্রদর্শন করে। এই ধরনের পদার্থই প্যারাচৌম্বক পদার্থ। কিন্তু ফেরোচৌম্বক পদার্থে অনেকগুলো অণু এক একটা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে একই অভিমুখে সংঘবদ্ধভাবে থাকে। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চুম্বকিত এলাকাকেই বলা হয় ডোমেইন। প্রত্যেকটি ডোমেইনই এক একটি আলাদা চুম্বকের মতো আচরণ করে। একটি পদার্থে এরকম অসংখ্য ডোমেইন থাকে এবং এরা বিভিন্ন দিকে মুখ করে থাকে। ফলে ফেরোচৌম্বককে সাধারণভাবে অচুম্বকিত মনে হয়। কিন্তু এই পদার্থকে যখন বহি:চৌম্বকক্ষেত্রে স্থাপন করা হয়, তখন ডোমেইনগুলো এই বহি:চৌম্বকক্ষেত্রের সাথে সমান্তরালভাবে নিজেদেরকে বিন্যস্ত করে ফেলে। ফলে একটি সামগ্রিক চুম্বকায়ন ঘটে।

তার মানে, বলল আকাশ, ফেরোচৌম্বক পদার্থগুলো যখন চুম্বকিত নয়, তখনও এর ডোমেইনগুলো চুম্বকিত থাকে?

ঠিক বলেছো, বললেন তানভীর সাহেব।

এর মধ্যে নৌকা নদীর তীরে এসে ভিড়ল। একে একে সবাই নেমে এলেন তীরে। বিন্দু হঠাত্ চেঁচিয়ে বলল- বাবা ঐ দেখো পৃথিবী।

সবাই তাকিয়ে দেখল, একজন লোক একটা ঝুড়িতে করে কমলা নিয়ে বসে আছেন। বিন্দু কমলাকেই পৃথিবী বলছে মজা করে। বিন্দুর কথায় সবাই মজা পেলো।