অটোরিকশা ইজিবাইক বাড়ছে গাইবান্ধায়!

করোনায় পোশাক কারখানায় চাকরিচ্যুতি

গাইবান্ধা প্রতিনিধি

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার হবিবুল্যাপুর গ্রামের পরিতোষ চন্দ্র (৪০) বিগত ৯ বছর গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেছেন। কিন্তু করোনার কারণে গত জুলাই মাসে তিনি চাকরি হারিয়েছেন। সংসারে তার দুই ছেলেমেয়ে ও বাবা-মাকে নিয়ে ছয় সদস্য। ছেলে প্রান্ত অষ্টম ও মেয়ে অনামিকা নবম শ্রেণিতে পড়ে। এ অবস্থায় বাড়িতে ফিরে তিনি বেকার হয়ে পড়েন। পরে হাতের জমানো টাকা বসে বসে খেয়ে শেষ হবার পর বাধ্য হয়ে স্থানীয় একটি এনজিও থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক কিনেন। এখন সেই ইজিবাইক চালিয়ে তার মাসিক আয় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। অথচও পোশাক কারখানায় থাকতে তার মাসিক আয় ছিল ১৭ হাজার টাকা। পরিতোষ চন্দ্র বললেন, আগে মাসিক ১৭ হাজার টাকা পেতাম। তা থেকে বৃদ্ধ বাবা-মাকে কিছু দেওয়ার পর অবশিষ্ট টাকা দিয়ে কোনো মতো সংসার চলতো। আর এখন নিজেই চলতে পারছি না। তাই বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে গোটা সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। উপরন্ত ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি আড়াই হাজার টাকা দিতে হচ্ছে।

শুধু পরিতোষ চন্দ্র নয়। তার মতো অসংখ্য পোশাকশ্রমিক এখন ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা-ভ্যান চালাচ্ছেন গাইবান্ধায়। সাদুল্লাপুর উপজেলার জয়েনপুর গ্রামের জাকির মিয়া (২৬) বলেন, ঢাকার উত্তর বাড্ডায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতাম মাসিক ১৬ হাজার টাকা বেতনে। করোনার কারণে কোরবানি ঈদের আগে চাকরি চলে যায়। বেকার হয়ে বাড়িতে ফিরে আসি। এনজিও থেকে ঋণ করে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় একটি অটোরিকশা কিনি। এখন মাসিক আয় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। এরমধ্যে সপ্তাহে ২ হাজার ৫১০ টাকা ঋণের কিস্তি দিতে হয়। অবশিষ্ট টাকা দিয়ে সংসার চলছে না। কষ্টে দিন যাচ্ছে। একই উপজেলার খোর্দ্দরুহিয়া গ্রামের বেলাল হোসেনের (৩৮) গল্পটাও একই ধরনের। পরিতোষ, জাকির ও বেলাল হোসেনের মতো জেলার মোট কত জন পোশাকশ্রমিক চাকরিচ্যুত হয়েছেন তার সঠিক হিসাব জানা যায়নি।

গাইবান্ধা জেলা শহরে মোট কতগুলো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও রিকশাভ্যান আছে, তার কোনো সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে গাইবান্ধা পৌরসভা, ট্রাফিক পুলিশ, অটোরিকশা মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, জেলা শহরে ১০ হাজারের বেশি অটোরিকশা ও রিকশাভ্যান চলাচল করে। এগুলোর বেশির ভাগই রেজিস্ট্রেশন নেই। গাইবান্ধা পৌরসভার সহকারী কর আদায়কারী জাহাঙ্গীর আলম বলেন,  শহরে চলাচল করে এমন ৩ হাজার ২৮৫টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ১ হাজার ৭১৯টি রিকশাভ্যানের রেজিস্ট্রেশন রয়েছে।

গাইবান্ধা যুব নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক জিয়াউল হক বলেন, শহরে অটোরিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা ব্যাপকহারে বেড়ে গেছে। ফলে গাইবান্ধার মতো ছোট শহরে এখন দিনরাত যানজট লেগেই থাকে। শহরের অলিগলিতেও এখন অটোরিকশা ও ইজিবাইকের জট লেগে থাকছে। রাস্তায় বের হলে ভোগান্তির সীমা থাকে না। বেকারত্বের কারণে অটোরিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা বাড়লেও এগুলো পৌরসভার নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।

গাইবান্ধা পৌরসভার প্যানেল মেয়র জিএম চৌধুরী বলেন, যারা ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন, করোনার কারণে তাদের অনেকে চাকরিচ্যুত হয়েছেন। চাকরিচ্যুত পোশাকশ্রমিক অটোরিকশা বা ইজিবাইক হাতে নিয়েছেন। তাই কর্মসংস্থানের অভাবে অটোরিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা বেড়েছে।

গাইবান্ধা ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (প্রশাসন) নুর আলম সিদ্দিক বলেন, অটোরিকশা ও ইজিবাইকের কারণে শহরে যানজট বেড়েছে। ফলে যানজট কমাতে ট্রাফিক বিভাগকেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।