ইহার সমাধান কঠিন বইকি

কথায় আছে—এক রামে রক্ষা নাই, সুগ্রীব দোসর। বাংলা চলচ্চিত্র একরকম কোমায় রহিয়াছে। যদিও ইহা রাতারাতি ঘটে নাই। অনেকটাই সময় লইয়া ধীরেসুস্থে ঘটিয়াছে। একসময় দেশে তেরো শতাধিক সিনেমা হল থাকিলেও এখন সচল মাত্র ৬২টি। অর্থাত্ অবস্থা এমনিতেই খুব খারাপ ছিল, তাহার সহিত ঘাড়ে চাপিয়াছে সুগ্রীবরূপী করোনা ভাইরাস। গত ১৮ মার্চ হইতে অদৃশ্য এই ভাইরাসের কারণে বাক্সবন্দি হইয়া আছে সকল ছবি। অতঃপর গত বুধবার তথ্য মন্ত্রণালয়ের একটি বিজ্ঞপ্তিতে কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করিয়া সিনেমা হলের আসনসংখ্যা কমপক্ষে অর্ধেক খালি রাখিবার শর্তে সিনেমা হল খুলিয়া দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হইয়াছে। গত শুক্রবার মুক্তিও পাইয়াছে হিরো আলমের একটি নূতন ছবি; কিন্তু দর্শক কতটা হলমুখী হইল, তাহার চিত্রটি ভীষণ ঝাপসা। কোথাও কোথাও পুরাতন ছবিও চালানো হইয়াছে। এবং গত দুই দিনে পত্রপত্রিকায় সরেজমিনে রিপোর্ট ছাপা হইয়াছে যে, দর্শকের অভাবে কোনো কোনো শো বন্ধ রাখা হইয়াছে। কোথাও চলিয়াছে নামকাওয়াস্তে।   

সিনেমা হল খুলিয়া দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসিলেও দ্বিধায় পড়িয়াছেন দেশের সিনেমা হলের অনেক মালিক। যদিও সেনসর সনদ পাওয়া প্রায় ২২টি নতুন ছবি মুক্তির অপেক্ষায় রহিয়াছে; কিন্তু দর্শক-খরার আশঙ্কায় নূতন ছবি এখনই মুক্তি দিতে চাহিতেছেন না অনেক ছবির প্রযোজক। আবার নূতন ছবি না পাইলে সিনেমা হল খুলিতেও নারাজ অধিকাংশ সিনেমা হলের মালিক। অর্থাত্ একটি চক্রাকার সমস্যার আবর্তে পড়িয়াছেন হলমালিক ও ছবির প্রযোজকরা। বাংলাদেশের পাশাপাশি আমরা দেখিয়াছি—ভারতেও কিছু সিনেমা হল খুলিয়া দেওয়া হইয়াছে। ভারতেও করোনা পরিস্থিতিতে হল দর্শকশূন্যই রহিয়াছে বলা যায়। মার্কেট পলিসি হিসাবে কোনো কোনো হলমালিক পুরাতন ছবি দিয়া নামমাত্র প্রবেশমূল্যে দর্শক টানিতে চেষ্টা করিয়াছেন বিনা মূল্যে চা খাওয়াইবার মতো করিয়া। এইদিকে ঢাকার সিনেপ্লেক্স সার্কেলের হলসমূহ আগামী সপ্তাহে খুলিবে। বসুন্ধরা বা যমুনা শপিংমলে অবস্থিত আধুনিক হলগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হলিউডের ছবি প্রদর্শন করে বিধায় ইহাদের নির্দিষ্ট দর্শক রহিয়াছে। সুতরাং ইহাদের সহিত সমগ্র দেশের হলের অবস্থার তুলনা করিলে চলিবে না। মালটিপ্ল্যাক্স সার্কেলে খুব অল্পসংখ্যক হলে হাতেগোনা কয়েকটি শোতে বাংলা সিনেমা চালানো হয়। সুতরাং বাংলা সিনেমার সংকটে ইহারা খুব অধিক সহায়ক নহে বলিয়া অনেকে মনে করেন। আবার ভালো কনটেন্টের অভাবের কথাও বলিয়া থাকেন চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টরা। একটি ছবির প্রাণ হইল উহার চিত্রনাট্য। বিশ্বখ্যাত পরিচালক সত্যজিত্ রায় এক জায়গায় বলিয়াছেন—একটি ছবির অর্ধেক ভাগ্য নির্ধারণ করিয়া দেয় উহার চিত্রনাট্য। অর্থাত্ সুন্দর চিত্রনাট্যের মাধ্যমেই একটি ছবির অর্ধেক কাজ শুরুতেই আগাইয়া যায়; কিন্তু আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রের অধিকাংশ ছবির চিত্রনাট্য তৈরি করা হয় তামিল, হিন্দি আর বিদেশি ছবির গল্পের আদলে। 

মানুষের হাতে হাতে এখন স্মার্ট ফোন। বাড়িতে ওয়াইফাই কানেকশনের মাধ্যমে নূতন প্রজন্মের অধিকাংশ দর্শকই বিশ্বের উচ্চমানের ছবি দেখিয়া থাকেন। সুতরাং তাহাদের কিন্তু ঐ তথাকথিত ফর্মুলা ছবির কাহিনি দিয়া সিনেমা হলে টানা সম্ভব হইবে না। বাংলা সিনেমার সমস্যাটি বেশ পুরাতন, তাই ইহার সমাধানও সহজ সম্ভব নহে। নূতনের কেতন উড়ানোর মতো নূতন স্রোত দরকার।