ফেনীতে ধর্ষণবিরোধী লংমার্চে ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলা

 ‘ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ স্লোগানে ঢাকা থেকে শুরু হওয়া লংমার্চ গতকাল শনিবার নোয়াখালীতে সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। বিকালে জেলা শহর মাইজদীর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার চত্বরে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তারা বলেন, ‘এই সরকার ধর্ষকদের লালন করে যাচ্ছে। যারা ধর্ষকদের লালন-পালন করছে, তাদের বিচার চাই।’ এর আগে গতকাল দুপুরে ফেনী শহরের জজকোর্ট এলাকায় লংমার্চে অংশগ্রহণকারীদের ওপর হামলা করেছেন স্থানীয় যুবলীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এতে লংমার্চে অংশ নেওয়া ২০ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকেও লাঠিচার্জ করতে দেখা গেছে। অবশ্য সংবাদ সম্মেলন করে হামলার কথা অস্বীকার করেছে ছাত্রলীগ।

ঐ হামলার প্রসঙ্গ টেনে নোয়াখালীতে সমাবেশে বক্তারা বলেন, ‘আমাদের শান্তিপূর্ণ লংমার্চে ফেনীসহ চার স্থানে সরকারদলীয় সন্ত্রাসীরা হামলা করেছে। আমাদের কত আর মারবেন? এদেশের তরুণেরা লড়াই করে যাবে। আমাদের আন্দোলন চলবে।’ সমাবেশ থেকে নেতারা ফেনীতে হামলার প্রতিবাদে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ১৯ অক্টোবর সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশ এবং ২১ অক্টোবর সারা দেশে রাজপথ অবরোধের ঘোষণা দেন।

জানা গেছে, গতকাল সকাল পৌনে ১০টায় লংমার্চের বহরটি ফেনীর শহিদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়ক হয়ে শহরের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সমাবেশে মিলিত হয়। এ সময় শহিদ বেদিতে তারা গণসংগীত ও পথনাটক উপস্থাপন করে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সমাবেশ শেষ হয়। সমাবেশ শেষে লংমার্চে অংশগ্রহণকারীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনের সড়ক দিয়ে পাগলা মিয়ার সড়কে অপেক্ষমাণ তাদের বাসের দিকে যাচ্ছিলেন। তখন ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর অতর্কিত হামলা করেন। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।

ছাত্র ইউনিয়নের আহত কর্মী সানজিতা ইমা দুপুরে বলেন, ‘ডিবি পুলিশের পোশাক পরিহিত একজন আমাকে পেছন থেকে জোরে ধাক্কা দেয়। এতে আমি পড়ে গিয়ে কোমরে আঘাত পাই। পরে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা পুলিশের উপস্থিতিতে হামলা করে। পুলিশ নিশ্চুপ ছিল।’

ছাত্র ইউনিয়নের আহত কর্মী আসমানি আশা বলেন, ‘পুলিশের ইশারায় ছাত্রলীগের কর্মীরা লাঠি ও লোহার রড নিয়ে হামলা করে। মিছিলের পেছন থেকে ইট, লোহার টুল ছুড়ে মারে। পুলিশ কিছুই করেনি।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার ফেনী শহরের শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে ধর্ষণবিরোধী সমাবেশ চলছিল। পাশে দোয়েল চত্বরে ফেনী-২ আসনের এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারীর ছবি সংবলিত বড় বাঁধানো ফেস্টুন ছিল। ফেস্টুনের ওপর কে বা কারা লাল রং দিয়ে ‘ধর্ষকদের পাহারাদার’ কথাটি লিখে দেয়।

এদিকে ফেনী জেলা ছাত্রলীগ তাত্ক্ষণিক শহরে প্রতিবাদ মিছিল করেছে। বেলা ৩টার দিকে শহরের একটি রেস্টুরেন্টে সংবাদ সম্মেলন করে লংমার্চে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা ছাত্রলীগ। সংবাদ সম্মেলনে নিজাম হাজারীর ফেস্টুনে আপত্তিকর  লেখার নিন্দা জানিয়েছে সংগঠনটি। এ সময় লিখিত বক্তব্য প্রদান করেন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সালাহ উদ্দিন ফিরোজ।

ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন হামলার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ঐ ঘটনায় সর্বোচ্চ চার-পাঁচ জন আহত হয়েছেন।

হামলাকারীরা লংমার্চকারীদের ছয়টি বাস ভাঙচুর করেছে। আহত কয়েক জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ফেনীতে হামলার পর বেগমগঞ্জের চৌমুহনী ও একলাশপুরে দুপুরে লংমার্চের সমাবেশ স্থগিত করেন আন্দোলনকারীরা। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি আল কাদরি জয় জানান, ‘লংমার্চের সমাবেশে আহত ২৫ জন নেতাকর্মীকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল ও চৌমুহনীর একটি প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিত্সা দেওয়া হয়েছে। নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে চিকিত্সা নেওয়া ১১ জনের মধ্যে সানজিতা ইমার (২১) অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় সন্ধ্যার পর তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নেওয়া হয়। অন্য আহতরা তাদের লংমার্চের গাড়িবহরে ঢাকার পথে রওনা হন।’

ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গণজাগরণ তৈরির লক্ষ্যে ও ৯ দফা দাবিতে শুক্রবার শাহবাগ থেকে নোয়াখালীর পথে লংমার্চ শুরু করে ‘ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’। বাম ছাত্র সংগঠনগুলো ছাড়াও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও নারী সংগঠন এতে যোগ দেয়।