মহিলা অঙ্গন প্রতিবেদক
ধর্ষণ আইন সংস্কারসংক্রান্ত প্রচারণা শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। প্রচারণার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ধর্ষণ রোধে ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইনি এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ফাঁক-ফোকর শনাক্ত করা এবং এই ফাঁকগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য সংস্কারসংক্রান্ত প্রস্তাবনাসমূহ প্রণয়ন করা। এই প্রচারণার অংশ হিসেবে ধর্ষণসংক্রান্ত আইনে সংশোধনের দাবির জন্য ধর্ষণ আইন সংশোধন জোট তৈরি হয়েছিল।
রেইপ ল রিফর্ম কোয়ালিশন (ধর্ষণ আইন সংস্কার জোট) ১৬টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত এই কোয়ালিশন যার মধ্যে রয়েছে—আইন ও সালিশ কেন্দ্র, আইসিডিডিআরবি, উইক্যান, উইমেন ফর উইমেন, একশন এইড, এসিড সার্ভাইভারস ফাউন্ডেশন, ওয়াইডাব্লিউসিএ, কেয়ার বাংলাদেশ, ডাব্লিউডিডিএফ, নারীপক্ষ, বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি, ব্র্যাক, বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।
চলমান পরিস্থিতিতে সংস্কার জোট ধর্ষণের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে ১০ দফা দাবি করেছে : ১। মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধর্ষণ আইনের সংস্কার : ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিদের (লিঙ্গ, জেন্ডার, যৌনতা, ধর্ম, বর্ণ, জাতি, জাতীয়তা, প্রতিবন্ধিতা ও বয়স নির্বিশেষে) সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারে অভিগম্যতা নিশ্চিত করতে এবং নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সবার অধিকার রক্ষা করতে বাংলাদেশের সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের (সিডো, সিআরসি এবং আইসিসিপিআরসহ অন্যান্য) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধর্ষণ আইন সংস্কার করতে হবে।
২। ধর্ষণের সংজ্ঞাকে বিস্তৃত করে তা বৈষম্যহীন করা :অপরাধী বা ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিদের জেন্ডার নির্বিশেষে ধর্ষণকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করতে হবে।
৩। ধর্ষণের আইনে ‘পেনিট্রেশন’কে সংজ্ঞায়িত করা।
৪। শাস্তির আনুপাতিকতা প্রদান করা এবং সাজা প্রদানের নির্দেশিকা প্রবর্তন করা : সাজা প্রদানের ক্ষেত্রে বিচারকদের সুবিবেচনা প্রয়োগ করার জন্য আইন সংশোধন এবং প্রয়োজনীয় সাজা প্রদান নির্দেশিকা প্রণয়ন করা যা শাস্তির আনুপাতিকতা নিশ্চিত করে এবং অন্যান্য যৌক্তিক বিষয়সমূহ (যেমন-অভিযুক্ত ব্যক্তির বয়স বা মানসিক স্বাস্থ্য) এবং উদ্বেগজনক পরিস্থিতির (যেমন-অস্ত্রের ব্যবহার, বল প্রয়োগ বা সহিংসতা এবং ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির স্থায়ী শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি) বিবেচনা করে।
৫। ধর্ষণের শিকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা :ধর্ষণের শিকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ন্যায়বিচারের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে হবে। ভাষা, শ্রবণ ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ যেন প্রতিবন্ধিতার কারণে ধর্ষণের বিচারের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতার শিকার না হন তার জন্য ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের সংস্কার করতে হবে।
৬। ধর্ষণ মামলায় অভিযোগকারী ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির চরিত্রগত সাক্ষ্যের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা :সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারা এবং এ সংক্রান্ত অন্যান্য ধারা সংশোধনের মাধ্যমে ধর্ষণ মামলার বিচারে অভিযোগকারীর চরিত্রগত সাক্ষ্য বিবেচনায় আনা বন্ধ করতে হবে। এরূপ সংস্কারের মাধ্যমে বিচারকগণ যাতে নিশ্চিত করতে পারেন যে আসামি পক্ষের আইনজীবীগণ জেরার সময় অভিযোগকারীকে ও সাক্ষীকে অভিযোগকারীর চরিত্র সম্পর্কে কোনো অবমাননাকর বা অবজ্ঞামূলক প্রশ্ন না করে।
৭। সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন : খসড়া ভিকটিম ও সাক্ষী সুরক্ষা বিল (২০০৬ সালে আইন কমিশন প্রথম খসড়া তৈরি করেছিল এবং পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালে এটি পর্যালোচনা করা হয়েছে) পুনর্বিবেচনা করে এই বিলটি পাশ করা যাতে করে ভিকটিম ও সাক্ষীগণ প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা, জরুরি আশ্রয়, জীবিকা নির্বাহের সহায়তা, মনোসামাজিক সহায়তা এবং প্রয়োজন অনুসারে তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ভিকটিম ও সাক্ষীর নিরাপত্তা যেন হুমকির মুখে না পড়ে তাদের নিরাপত্তার জন্য সন্তোষজনক বিকল্প ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত এ জাতীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
৮। ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিদের জন্য রাষ্ট্র পরিচালিত একটি ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন করা :রাষ্ট্র পরিচালিত একটি ‘ক্ষতিপূরণ তহবিল’ গঠন করা, যেন ধর্ষণ প্রমাণ হওয়া সাপেক্ষে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তি ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অপরাধী চিহ্নিত হয়েছে কি না বা তার বিচার হয়েছে কি না তা বিবেচিত হবে না। এই ধরনের তহবিল হতে ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া শিশুর ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা।
৯। বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জেন্ডার সংবেদনশীলতাবিষয়ক প্রশিক্ষণ :জনপ্রতিনিধি, পুলিশ, আইনজীবী (প্রসিকিউশন/ডিফেন্স), বিচারক, ডাক্তার, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, সাংবাদিক এবং সমাজকর্মীদের জন্য জেন্ডার সংবেদনশীলতাবিষয়ক প্রশিক্ষণের আয়োজন করা, যেন বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়ায় ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির সঙ্গে সংবেদনশীল আচরণ করা হয়।
১০। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠক্রমে সম্মতি সম্পর্কিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা:জেন্ডার এবং নারীর প্রতি সহিংসতা সম্পর্কে ধারণা এবং প্রচলিত নেতিবাচক সামাজিক রীতিনীতি পরিবর্তন করার জন্য সম্মতি ও পছন্দের ধারণাসহ লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা (বিশেষত ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার অন্যান্য ধরন) সম্পর্কিত তথ্য প্রাথমিক শিক্ষা স্তর থেকে পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত।