হংকংয়ের আদলে বিক্ষোভ :চ্যালেঞ্জের মুখে থাই সরকার

তালেব রানা

 

বিক্ষোভ-প্রতিবাদে উত্তাল থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক। প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুথ চান-ওচার পদত্যাগ ও রাজার ক্ষমতা খর্ব করার দাবিতে গত বুধবার থেকে রাজপথে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে ছাত্র-জনতা। জরুরি অবস্থা, পুলিশের বল প্রয়োগের প্রেক্ষাপটেও বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছে তারা। থাই রাজা মাহা ভাজিরালংকর্ণ বছরের বেশির ভাগ সময় বিদেশেই কাটান। সম্প্রতি বিদেশভ্রমণ শেষে দেশে ফিরেছেন তিনি। বুধবার রাজধানীর রাচাদামনোন এভিনিউতে রাজদম্পতি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। সেখানেই অবস্থান নেয় বিক্ষোভকারীরা। থাইল্যান্ডের আইন অনুযায়ী রাজতন্ত্রের সমালোচনা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা এই বিধান লঙ্ঘনের সাহস দেখাচ্ছে। ইতিমধ্যে রানির বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগে দুই বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।

জরুরি অবস্থা জারির পর থাই প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুথ চান-ওচা পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। শুক্রবার তিনি এক ঘোষণায় বলেন, তার সরকার ক্ষমতার ব্যবহার করতে দ্বিধা করবে না। সরকারের হুমকির পরও দাবিতে অনড় রয়েছে বিক্ষোভকারীরা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, সরকার ও রাজতন্ত্রবিরোধী এই বিক্ষোভের অবসানে থাই নেতাদের কোনো সহজ ‘অপশন’ নেই।

গত কয়েক দশকে থাইল্যান্ডে দমন-পীড়ন, ক্যুর মাধ্যমে সরকারের পতন হয়েছে, নতুন সরকার এসেছে। রাজপথে বিক্ষোভের সমাপ্তি হয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। কিন্তু এবারের বিক্ষোভ থাইল্যান্ডের সরকারের জন্য অনেক বড় সংকট। ছাত্রদের নেতৃত্বে চলমান এই বিক্ষোভ নিজেদের ক্ষমতার জন্য নয় বরং থাইল্যান্ডের মৌলিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীরা প্রকাশ্যে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে যেটা আগে হয়নি। রাজপথে বিক্ষোভের বাইরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে অসন্তোষের কথা বলা হচ্ছে।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, পুলিশকে অমান্য করতে হংকংয়ের বিক্ষোভকারীদের মতো কৌশল অবলম্বন করছে থাই বিক্ষোভকারীরা। তারা এক জায়গায় রাতে থাকছে না বরং প্রতিদিনই সময়মতো বিক্ষোভে জড়ো হচ্ছে। এমন অবস্থায় বিক্ষোভ দমাতে হলে সরকারকে ব্যাপক বলপ্রয়োগ করতে হবে। যেটা থাইল্যান্ডে ১৯৭৩, ১৯৭৬, ১৯৯২ ও ২০১০ সালে দেখা গিয়েছিল। আর রাস্তার বিক্ষোভ দমন করা গেলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে বিক্ষোভ নিশ্চিহ্ন করতে থাই সরকারকে আরো কিছু উপায় খুঁজতে হবে। কারণ, এই বিক্ষোভ সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু হয়েছে। বিক্ষোভকারী নেতাদের আটকের পর নতুন নেতা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে এই সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণেই।

ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে, করোনার কারণে বিশ্বের সব দেশের অর্থনীতি কম-বেশি ধুঁকছে। করোনার কারণে থাইল্যান্ডে পর্যটন খাত মুখ থুবড়ে পড়েছে। থাইল্যান্ডের এই অর্থনৈতিক পরিস্থিতিই শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পথে নিয়ে গেছে। থাইল্যান্ডের সাধারণ মানুষ যখন অর্থনৈতিক চাপের মুখে তখন রাজা বিদেশ ভ্রমণে ব্যস্ত। এটিও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীরা এই বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছে কারণ তারা কোনো ভালো অথনৈতিক ভবিষ্যত্ দেখছে না। আর দেশটি এখন পরিচালিত হচ্ছে স্নায়ুযুদ্ধকালীন রাজনৈতিক ধারায়। যেখানে নির্বাচিত নেতারা নয় বরং সবকিছুর নিয়ন্ত্রণে সেনা ও রাজতন্ত্র। জীবিকার সংস্থান নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকা মানুষেরা একটি জবাবদিহিমূলক সরকার চাইছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে থাইল্যান্ডের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে স্থিতিশীলতা জরুরি। এজন্য সরকারকে দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছে। সরকার মনে করছে, কিছু মানুষকে ধরে জেলে ঢোকালে পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ১৫ বছরের শিক্ষার্থী যেভাবে পুলিশের বেরিকেড ভেঙে রাস্তায় নামছে সেটা অতীতে দেশটিতে দেখা যায়নি।