সময় এখন বাংলাদেশের!

সাইফুল ইসলাম হাফিজ

স্বাধীনতার পর থেকেই বৈদেশিক নীতিতে বাংলাদেশ একটি বন্ধুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বন করে চলছে। ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়’—এই সৌহার্দ্যপূর্ণ ভিত্তির উপরেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে দাঁড় করিয়ে গেছেন। বাংলাদেশ সবসময়ই এই নীতিতে বিশ্বাস করে। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ তার শক্তিশালী কূটনৈতিক তত্পরতার মাধ্যমে অনেক সমস্যা সমাধান করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু সমস্যা সমাধানের জন্য একটি সুযোগ এসেছে বাংলাদেশের সামনে। বিশ্বরাজনীতিতে অন্যতম একটি শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে তার পররাষ্ট্রনীতিকে আরো শক্তিশালী করতে পারবে অনায়াসে। এর জন্য খুব বেশি কাঠখড় পোড়াতে হবে না। এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে অস্ত্র ক্রয়েরও প্রয়োজন হবে না। শুধু প্রয়োজন হবে শক্তিশালী কূটনীতির। কারণ, বাংলাদেশের সামনে চলে এসেছে এক সুবর্ণ সুযোগ। যে সুযোগকে কাজে লাগিয়েই আমরা বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি। এই সুযোগটা তৈরি হয়েছে মূলত বাংলাদেশের  ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, চীন, মুক্তিযুদ্ধের শত্রু পাকিস্তান এবং স্বয়ং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই সুযোগ আসলে নতুন নয় কিন্তু অধুনা ভারত-চীন ও ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্বের কারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চীনের অগ্রযাত্রা রোধ করতে ভারতকে কাছে টানছে যুক্তরাষ্ট্র। চীনের সঙ্গে ভারতের দ্বন্দ্ব মীমাংসা না হওয়ার এটাও অন্যতম কারণ। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই লাদাখ নিয়ে চীনের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে আছে এবং ভারতও চীনকে দমাতে অনড় অবস্থানে। তাই আমেরিকা-ভারত গলায় গলায় খাতির! এই উষ্ণ সম্পর্ক এত দিন তেমন ছিল না। যখন চীন তার প্রাচীনকালের সিল্ক রোড নতুন করে নির্মাণের পরিকল্পনা নিল, ঠিক তখনই আমেরিকার কানে পানি গেল। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই চীনকে শায়েস্তা করতে  ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করতে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল’ গ্রহণ করলেন।

২০১১ সালে চীনকে রুখতে বারাক ওবামা ‘রিব্যালেন্সিং’ কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। ট্রাম্পের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল’-এ বাংলাদেশের অবস্থান খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহে মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন ই. বিগানের বাংলাদেশ সফরের অন্যতম কারণ এটি। এর দ্বারা স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব অনেক। তাই ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে তারা আরো যাতায়াত বৃদ্ধি করবেন। ভারত এত দিন বাংলাদেশকে বন্ধু ভাবলেও বেশ কিছু চুক্তি ও কাজ নিয়ে গড়িমসি করেছে। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ায় সেই নীতি থেকে সরে আসতে চাইছে ভারত। ভারতও বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে তত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীন তাদের ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বৃদ্ধি করছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার ও মালদ্বীপকে তাদের কূটনৈতিক বলয়ে নিতে চাচ্ছে। তার আঞ্চলিক প্রভূত্ব বজায় রাখতে বাংলাদেশকে কাছে টানছে চীন।

বাংলাদেশের সঙ্গে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ বৃদ্ধি করে আগের চেয়ে দ্বিগুণ বিনিয়োগ করছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শক্তিধর দেশ এবং বিশ্ব মোড়ল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। ঢাকা সফরকালে স্টিফেন বিগান তা স্পষ্ট করেই বলেছেন। তাই বাংলাদেশকে এমন একটা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে যেন সমস্যা সমাধানে সবার কাছ থেকেই ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে এবং ভারতকে অবহেলা করে পুরোপুরি চীনমুখীও হওয়া যাবে না। সব রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে প্রয়োজনে ‘একলা চল’ নীতিই থাকবে কিন্তু কোনো দেশ নির্ভর হলে সবার শত্রুতে পরিণত হতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যা, সীমান্ত হত্যা, তিস্তা নদীর পানি বণ্টনসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সমস্যা মাথায় নিয়ে হাঁটছে বাংলাদেশ। কিন্তু এর সুরাহা কবে হবে তা জানা নেই।

রোহিঙ্গাদের মতো দুর্ধর্ষ একটি জনগোষ্ঠীকে জায়গা ও ভরণপোষণ দিয়ে যাচ্ছি আমরা। দিনে দিনে তাদের বেপরোয়া ব্যবহার প্রকাশ পাচ্ছে। মিয়ানমারের ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ, ধূর্ত নীতির কারণে আমাদের এই সমস্যা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। সীমান্ত হত্যাও বন্ধ করতে হবে শিগিগরই। বড় বড় শক্তিগুলো যেহেতু বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী তাই আমাদের সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে তাদের সহযোগিতা নিয়ে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ এখন মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবে। এখনো সীমান্তে সেনা সমাবেশ করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে দেশটি। যা সহ্য করার মত নয়।

ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সীমান্ত হত্যা বন্ধ ও পানির ন্যায্যহিস্যা আদায় করতে হবে। সবাই যখন বন্ধুত্বের সাইনবোর্ডে বাংলাদেশকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য পাঁয়তারা করছে—তখন বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে থাকবে? বাংলাদেশকেও তার স্বার্থ আদায়ে অটল থাকতে হবে। অন্যথায়, পরাশক্তিগুলোর কূটচাল আর স্বার্থবাদী নীতির কাছে সমকালীন বিশ্বে টিকে থাকা কঠিন হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়