করোনার নেতিবাচক প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়-বাণিজ্য। ব্যাবসায়িক পরিবেশ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। আর্থিক লেনদেনও পুরোদমে চালু হয়নি। ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতাও ফেরেনি স্বাভাবিক গতিতে। এমন পরিস্থিতিতে শিল্পোদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হারিয়েছেন। যদিও ঋণের কিস্তি পরিশোধে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ সময়ে কোনো ঋণগ্রহীতাকে খেলাপি করা যাবে না বলে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে। তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে হলে এ সময়সীমা আরো বাড়ানো উচিত।
ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, হঠাত্ করে করোনা ভাইরাসের আঘাতে ব্যবসায়-বাণিজ্যের লন্ডভন্ড অবস্থা। এখনো পর্যন্ত সবকিছু গুছিয়ে ওঠা যায়নি। আগামী মাস থেকেই দেশে শীত শুরু হবে, সে সময় করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। সেটাই যদি ঘটে তাহলে পণ্য উত্পাদন করে তা দেশীয় বাজারে বিক্রি কিংবা রপ্তানি করা কঠিন হয়ে পড়বে।
তারা বলছেন, কর্মসংস্থান ধরে রাখতে চলমান ব্যবসায়-বাণিজ্যকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি নতুন মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণের ব্যবস্থা করার দরকার। যাতে পুরাতন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি নতুন নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য অর্থের সরবরাহ বাড়াতে হবে বলেও জানান তারা।
ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ঋণ শোধের সময়সীমা আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মতে, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণ শোধ না করলেও ঋণের শ্রেণিমানে কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না। অর্থাত্ চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ঋণটি যে মানে শ্রেণিকৃত ছিল, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সেই একই মানেই রাখতে হবে। তবে কোনো ঋণের শ্রেণিমানের উন্নতি হলে তা যথাযথ নিয়মে শ্রেণিকরণ করা যাবে। করোনা ভাইরাসের কারণে ব্যবসায়-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় গত ১৯ মার্চ প্রথম দফায় ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ঋণগ্রহীতারা ঋণ শোধ না করলেও ঋণের শ্রেণিমানে কোনো ধরনের পরিবর্তন না করার নির্দেশ দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর গত ১৫ জুন দ্বিতীয় দফায় এ সময় বাড়িয়ে সেপ্টেম্বর করা হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির (ইএবি) সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, করোনার কারণে ব্যবসায়-বাণিজ্য এখনো পুরো স্বাভাবিক হয়নি। পুরো স্বাভাবিক হওয়ার পর তা আরো বাড়াতে হবে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। পণ্য উত্পাদন বা রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে কার্যক্রমও আগের চেয়ে বাড়াতে হবে। এটি আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এখন চলমান বাণিজ্যই ধরে রাখাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আওয়াজ উঠেছে। তিনি আরো বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কা সামাল দিতে সরকারকে যেমন প্রস্তুতি নিতে হবে, তেমনি উদ্যোক্তাদেরও আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। ব্যবসার গতি স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের ঋণ পরিশোধের সময়সীমাও বাড়াতে হবে।
বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারম্যান ও ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান এ বিষয়ে বলেন, ব্যবসায়-বাণিজ্য এখনো পুরো মাত্রায় স্বাভাবিক হয়নি। গত এপ্রিল-মের তুলনায় ৭০ শতাংশ সচল হয়েছে। আর ৩০ শতাংশ সচল হলে পুরো স্বাভাবিক হবে। এর মধ্যেই আবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসছে। করোনার থাবা থেকে বিশ্ব অর্থনীতি কবে মুক্ত হবে সে ব্যাপারে কোনো দেশ কোনো রোডম্যাপ করতে পারছে না। ফলে দীর্ঘমেয়াদি কোনো বিনিয়োগও হচ্ছে না। একটা অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে। এ অবস্থায় অর্থের চলাচলও স্বাভাবিক হয়নি। ফলে উদ্যোক্তারা অর্থ সংকটে রয়েছেন। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের উচিত হবে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়ানো।