বাঘায় ৬ মাসে ঝরে পড়েছে ২’শ শিক্ষার্থী, বাল্য বিয়ের হিড়িক

গত শনিবার (অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজশাহীর বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে মোবাইল ফোনে মনিগ্রাম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৮ নং ওয়ার্ড সভাপতি কাওসার রহমান জানালেন একটি বাল্য বিবাহ প্রস্তুতির খবর। তিনি ঐ বিয়ে বন্ধের জন্য নির্দেশ দিলেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামকে। এরপর চেয়ারম্যান পাঠালেন গ্রাম পুলিশ। তিনি সেখান থেকে ম্যানেজ হয়ে ফিরে এলেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অতঃপর রাতের আঁধারে অনুষ্ঠিত হলো বাল্য বিয়ে।

শুধু মনিগ্রাম ইউনিয়নের তুলশীপুর নয়, এমন বাল্য বিয়ের ঘটনা ঘটছে বাঘা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশব্যাপী করোনা সংকট চলমান অবস্থায় গত ৬ মাসে উপজেলার ৭ টি ইউনিয়ন এবং ২ টি পৌরসভা মিলে প্রায় দুই শতাধিক বাল্য বিয়ের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে চকরাজাপুর ইউনিয়নে বাল্য বিয়ের শিকার হয়েছে ৫৫ জন শিক্ষার্থী। যারা এ বাল্য বিয়ের শিকার হচ্ছে তাদের পড়ালেখা ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির মধ্যে। 

এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সমাজের সুধীজনরা। তারা বলছেন, স্থানীয় প্রশাসন বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বড় বড় বক্তৃতা করলেও কার্যক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা নীরব। এ কারণে অসংখ্য শিক্ষার্থী মাধ্যমিকের গণ্ডিও পেরুতে পারছে না। 

তারা আরও অভিযোগ করেন, বাল্য বিয়ে প্রতিরোধের জন্য সরকারিভাবে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও  এ বিষয়ে তার কোন ভূমিকা নেই। 

মনিগ্রাম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৮ নং ওয়ার্ড সভাপতি ও তুলশিপুর গ্রামের বাসিন্দা কাওছার রহমান জানান, বাল্য বিয়ের ঘটনাস্থল তার বাড়ির পাশে। শনিবার সন্ধ্যায় অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক ছাত্রীকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে পার্শ্ববর্তী রুস্তমপুর গ্রামের আব্দুল মতিনের ছেলে রুবেল হোসেনের সাথে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে এ খবর শোনার পর দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমি এই খবরটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানাই। এর আধঘন্টা পর মনিগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম ওই বিয়ে বন্ধের জন্য গ্রাম পুলিশ পাঠান মেয়ের বাড়ি। কিন্তু গ্রাম পুলিশ সেখান থেকে ম্যানেজ হয়ে বাড়ি ফেরে। পরে রাতের আঁধারে বিয়ে সম্পন্ন হয়। 

এর আগে বাঘা পৌর এলাকার বাজুবাঘা নতুনপাড়া গ্রামের এক পিতা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েকে শুক্রবার রাতে বিয়ে দেওয়ার দিনধার্য করলেও প্রশাসনকে খবর দেওয়া হতে পারে এমন সন্দেহে আগের দিন বৃহস্পতিবার তার মেয়েকে অন্য এলাকায় নিয়ে গিয়ে পাকুড়িয়া এলাকার শিমুল(২৫)এর সাথে বিয়ে দেন। পরে (১৯ অক্টোবর) সোমবার তার বাড়িতে অনুষ্ঠান করেন। 

আরও পড়ুন: রামগড়ে স্বাধীনতা বিরোধীচক্রের ইন্ধনে মুক্তিযোদ্ধাকে হেনস্তার অভিযোগ

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাঘায় মাধ্যমিক পর্যায়ে ৫২ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের গোপনে বাল্য বিয়ে দেওয়ার হিড়িক পড়েছে। বিশেষ করে উপজেলার সীমান্তবর্তী পদ্মার চরাঞ্চলের চকরাজাপুর ও পলাশী ফতেপুর এবং সমতল এলাকার হেলালপুর এম.এইচ বালিকা,তেথুরিয়া, চন্ডিপুর,মনিগ্রাম ও বাউসা উচ্চ বিদ্যালয় বাল্য বিয়ে রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। 

হেলালপুর এমএইচ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল খালেক বলেন, তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে গত এক বছরে সপ্তম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ২৫ শিক্ষার্থীর বাল্য বিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তিনি চেষ্টা চালিয়ে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে দু’টি বিয়ে বন্ধ করতে পেরেছেন। তার মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশব্যাপী নারী এবং শিশুদের প্রতি যে সামাজিক নির্যাতন চলছে তার কয়েকটি কুফলের মধ্যে  বাল্য বিয়ে অন্যতম।

চরাঞ্চলের শিক্ষক গোলাম মোস্তফা জানান, সরকার শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরেও গোপনে বাল্য বিয়ে রোধ করা যাচ্ছে না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, গত ৬ মাসে চরাঞ্চলের ২ টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ৫৫ জন শিক্ষার্থী বাল্য বিয়ের শিকার হয়েছে। এ খবর সম্প্রতি একটি দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। তার পরেও প্রশাসনের টনক নড়েনি !

বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিন রেজা বলেন, বাল্য বিয়ে সংক্রান্তে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর পরেও যদি কোন পিতা-মাতা অন্যত্র নিয়ে গিয়ে তাদের কন্যার বিয়ে দেন সে ক্ষেত্রে কিছু করার থাকে না। তিনি বাল্য বিয়ে প্রতিরোধের জন্য শিক্ষক মহল এবং উপজেলা প্রশাসনকে আরও সতর্ক ও সক্রিয় হওয়াসহ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কথা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে ব্যক্ত করে থাকেন বলে জানান। 

ইত্তেফাক/এএএএম