তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের রাজনৈতিক উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য বড় প্রতিবন্ধকতা হইল রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। বড় বড় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের যেইখানে সুবিচার হয় না, সেইখানে স্থানীয় ও তৃণমূলে হত্যাকাণ্ডের বিচার পাওয়া কঠিন বইকি। সেই যে ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধীকে হত্যার মাধ্যমে স্বাধীন ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড শুরু হয়, তাহার পরবর্তী সময়ে কয়েকটি দেশে বড় বড় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভয়াবহ ও নৃশংসতম ঘটনা তো পৃথিবীর তিনটি আলোচিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের অন্যতম। এই সকল ঘটনার রেশ এখনো চলিতেছে বিভিন্ন ছোট-বড় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে, যাহার শেষ কোথায় তাহা কেহ বলিতে পারেন না। ইতিমধ্যে হরতাল, অবরোধ, নির্বাচনি সহিংসতা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও উগ্র রাজনৈতিক মতাদর্শের শিকার হইয়া অনেকে প্রাণ হারাইয়াছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর আমলে ১৯৭২ হইতে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সশস্ত্র রাজনৈতিক দলের ক্যাডারের হাতে আওয়ামী লীগের সাত জন সংসদ সদস্য হত্যাকাণ্ডের শিকার হইয়াছেন।
গৌরচন্দ্রিকায় এই সকল বলিবার কারণ হইল, এখনো এমন সকল রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটিতেছে, যাহা আমাদের মনোবেদনার কারণ হইয়া উঠিতেছে। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বহু কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হইল নির্বাচনি সহিংসতা। কিছুদিন পূর্বে নির্বাচন কমিশন করোনা মহাদুর্যোগে আটকাইয়া থাকা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনসমূহ তথা জেলা পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনসমূহ (আড়াই শতাধিক পদে) অনুষ্ঠানের ঘোষণা প্রদান করে। সেই অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন স্থানে এই সকল নির্বাচনের ডামাডোল বাজিতেছে। আর ইহারই মধ্যে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে লাশ পড়িবার ঘটনাও শুরু হইয়াছে। গত শনিবার রাত্রে ময়মনসিংহের গৌরীপুরে উপজেলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বিআরডিবির চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান শুভ্র পৌরসভার নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী হিসাবে গণসংযোগ চালাইতেছিলেন। এমন সময় একদল দুর্বৃত্ত ও সন্ত্রাসী তাহাকে কুপাইয়া হত্যা করে। তাহার হত্যার প্রতিবাদে তত্ক্ষণাত্ বিক্ষোভ মিছিল করেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। এমন একজন স্থানীয় জনপ্রিয় নেতার হত্যাকাণ্ড সত্যিই দুঃখজনক ও বর্বরতম ঘটনা।
রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ হইতে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ২২ বছরে বিভিন্ন রাজনৈতিক নৃশংস ঘটনায় প্রাণ হারাইয়াছেন কমপক্ষে ২ হাজার ৫১৯ জন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী কেবল ১৯৯৯-২০১৩ সাল পর্যন্ত এই ১৫ বত্সরেই রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ হারাইয়াছেন ২ হাজার ২৩৪ জন। কিছুদিন পূর্বে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত একটি পরিসংখ্যান হইতে জানা যায় যে, ২০০৯ সাল হইতে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার মানুষ রাজনৈতিক কারণে হত্যাকাণ্ডের শিকার হইয়াছেন। চলতি বত্সরের জুন পর্যন্ত এই সংখ্যা ১৩৪ জন। কিন্তু যেইখানে বলা হইতেছে সরকারবিরোধীদের শক্তি ক্ষীণকায়, সেইখানে সরকারপক্ষের লোকজন হামলার শিকার হইতেছেন কেন? ময়মনসিংহের গৌরীপুরের ঘটনাকে আর যাহাই হউক, অন্তর্দ্বন্দ্ব বা কোন্দলের ঘটনা বলিবার অবকাশ নাই। তাই জিজ্ঞাসা, ইহা কীসের আলামত? মোদ্দা কথা, স্থানীয় পর্যায়ের এই সকল নির্বাচন যেন সহিংসতাপূর্ণ না হয়, সেইদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এখন হইতে সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া কোনো উগ্র বা অপশক্তিও যেন মাথাচাড়া দিয়া উঠিতে না পারে এবং ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করিতে না পারে, সেই দিকেও দিতে হইবে বিশেষ নজর।