সুবিধা নিতে চায় দুই দলই

 

যুক্তরাষ্ট্রে শাটডাউন গতকাল রবিবার ২৩তম দিনে পড়েছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা হলেও তা ভেস্তে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটরা বৈঠকে বসলেও তাতে উল্টো তিক্ততা বেড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শাটডাউন সমাপ্তির বিষয়টি রাজনীতির কাছেই পরাজিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে সবাই সুবিধা নিতে চায় যাতে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কাজে লাগে। ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে কখন, কিভাবে এবং কে শাটডাউন থেকে মার্কিনীদের মুক্তি দেবেন। দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে লম্বা সময় ধরে সরকারে অচলাবস্থা চলছে। আট লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী বিনা বেতনে কাজ করছেন বা কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

পরিস্থিতি বেশি ঘোলাটে হয় যখন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটপন্থি স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি ও ডি ক্যালিফ হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। তখন ডেমোক্র্যাটরা বলেন, তারা প্রেসিডেন্টের দাবি অনুযায়ী ৫৭০ কোটি ডলার অনুমোদন দেবেন না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই কথা শুনে টেবিল চাপড়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন এবং বৈঠক থেকে বেরিয়ে আসেন। ডেমোক্র্যাটরা এই তথ্য জানালেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, তিনি শান্তভাবে বৈঠক থেকে বেরিয়ে আসেন।

 

সহজ সমাধান কী

সহজে সমাধান হওয়ার কোনো উপায় দেখা যাচ্ছে না। রিপাবলিকান দলের রক্ষণশীলরা মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণে শতভাগ সমর্থন জানাচ্ছেন। এমনকি এই অচলাবস্থা চলতে থাকলেও তারা তাতে কর্ণপাত করছেন না। ডেমোক্র্যাটদের একটা অংশও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি মানতে নারাজ। দুই দলের কেউই ঝুঁকি নিতে চান না। যদি তারা হেরে যান তাহলে দলের সমর্থকরা তাদের বিরুদ্ধে চলে যেতে পারেন।

 

বের হওয়ার সম্ভাব্য উপায়

জরুরি অবস্থা জারি করে মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণে দলের একটা অংশের চাপ বাড়ছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর। তিনি সেটা ঘোষণাও করতে পারেন বলে হুমকি দিয়েছেন। যদিও সময় নিচ্ছেন। আইন অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জরুরি অবস্থা জারি করে সামরিক বাহিনীর বাজেট থেকে অর্থ নিয়ে দেয়াল নির্মাণ করতে পারেন। এটা একটা কৌশল যাতে উভয় পক্ষই জয় দাবি করতে পারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তি তুলে ধরতে পারেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপদ করতে অর্থ সংগ্রহ করেছেন। ডেমোক্র্যাটদের বাধাও তিনি এড়াতে সক্ষম হয়েছেন। আর ডেমোক্র্যাটরা বলতে পারেন, তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন অর্থ বাঁচানোর। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি বিলে স্বাক্ষরের মাধ্যমে পুনরায় সরকারি কার্যক্রম চালু করতে পারেন।

 

জরুরি অবস্থা এখনই নয় কেন

হুমকি দিলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জরুরি অবস্থা জারি করছেন না। তার দলের মধ্যেই এ নিয়ে মতবিরোধ আছে। তারা দেয়াল চাইলেও জরুরি অবস্থা চান না। প্রতিনিধি পরিষদের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শীর্ষ রিপাবলিকান ম্যাক থর্নবেরি বলছেন, দেয়াল নির্মাণ সামরিক বাহিনীর কাজ নয়। কোনো কোনো রিপাবলিকানের চিন্তা যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জরুরি অবস্থা জারি করলে ভবিষ্যতে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টরাও উদাহরণ টেনে একই কাজ করবেন। ফলে তখন রিপাবলিকানদের বিরোধিতা কাজে আসবে না। ডেমোক্র্যাটরাও চায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জরুরি অবস্থা জারি করেই দেয়াল নির্মাণ করুক। এতে তারা জনগণের সামনে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার অপব্যবহারের কথা তুলে ধরতে পারবেন। প্রেসিডেন্টের জরুরি অবস্থা জারির ক্ষমতা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রিউ বয়েলি বলেন, সীমান্তে জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করলে মানুষের মধ্যে খারাপ ধারণা সৃষ্টি হয়।

 

কতটা জরুরি দেয়াল

অনেকের মতে, দেয়াল নির্মাণের বিষয়টি ট্রাম্পের কাছে রাজনৈতিক ইগোর লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। হোয়াইট হাউসে আসার আগে নিজের ‘ডিল মেকার’ ভাবমূর্তি নিয়ে একাধিকবার ঢোল পেটাতে দেখা গেছে তাকে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলছেন, মেক্সিকো সীমান্তে অনুপ্রবেশকারী, সন্ত্রাসবাদী, মাদক পাচারকারীদের রুখতে দেয়াল তৈরি অত্যন্ত জরুরি। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে অবিলম্বে এই কাজ শুরু করা প্রয়োজন। যদিও সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, অপরাধের পাল্লা ভারী মার্কিন নাগরিকদেরই। ট্রাম্পের দাবি, শরণার্থীদের ভিড়ে মাদক পাচারের মাত্রা ছাড়িয়েছে। অথচ ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের রিপোর্ট বলছে, সবচেয়ে বেশি মাদক পাচার হয় কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা সীমান্ত দিয়ে। তাই ডেমোক্র্যাটরা দেয়াল নির্মাণকে কেবল অর্থের অপচয় বলে উল্লেখ করছেন।

 

মার্কিন ইতিহাসে দীর্ঘতম

শাটডাউন বলতে মার্কিন সরকারের কিছু প্রতিষ্ঠানের কাজ বন্ধ হওয়াকে মনে করা হয়। বিনা বেতনে চাকরিজীবীদের কাজ করতে হয়। কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ বন্ধ হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মার্কিন ইতিহাসে শাট ডাউন বা সরকারের আংশিক অচলাবস্থা শুরু হয় ১৯৭৬ সালে। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট গিরাল্ড ফোর্ডের আমলে ১০ দিন শাটডাউন চলে। ১৯৭৭ সালে তিনবার শাট ডাউনের শিকার হয় যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭৮ (১৭ দিন), ১৯৭৯, ১৯৮১ থেকে ১৯৮৬ এবং ১৯৮৭, ১৯৯০, ১৯৯৫, ২০১৩ (১৬), ২০১৮ সালে শাট ডাউন হয়। সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের শাটডাউন ছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের (ডেমোক্র্যাট) আমলে ২১ দিন। গত ২২ ডিসেম্বর থেকে চলমান শাটডাউন শুরু হয়।