কুনুনরা হারে না

 

এ যেন অষ্টাদশী কোনো তরুণীর বাড়ি থেকে পালানোর ঘটনাকে কেন্দ  করে আবর্তিত এক সিনেমার গল্প। বাড়ি থেকে পালানোর প্রথম পর্বটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারলেও গল্পের দ্বিতীয়পর্বে এসে তরুণীর জীবনে বরাবরই নেমে আসে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট। কিন্তু সৌদি তরুণী রাহাফ মুহাম্মদ আল কুনুনের গল্প যেন সিনেমার সেই গল্পকেও ছাপিয়ে গেছে। কুয়েতে অবস্থানরত রাহাফ মুহাম্মদ আল কুনুন পরিবার থেকে পালিয়ে থাইল্যান্ডে এসে পৌঁছান। এরপর অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে থাইল্যান্ড সরকার তাকে কুয়েতে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু রাহাফের বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত এবং দৃঢ় মানসিকতার জোরে শেষ পর্যন্ত মুক্তি মিলেছে পরিবারের পরাধীন জীবন থেকে, কানাডায় আশ্রয় মিলেছে শরণার্থী হিসেবে।

থাই সরকার তাকে কুয়েতে ফেরত পাঠানোর জন্য জোর করতে থাকলে রাহাফই কেবল এর পরিণাম অনুধাবন করতে পারছিলেন। কোনোভাবে পরিবারের কাছে ফিরে গেলে যে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে পড়তে হবে তা ভালো করেই জানতেন তিনি। তাই শেষ অস্ত্র হিসেবে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলেন হোটেলের কক্ষে। হোটেল কক্ষে নিজেকে আবদ্ধ করলেও এই সময়ের মধ্যে নিজের সমস্যার কথা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে তখন উন্মুক্ত আকাশের মতো বিশাল এক দরজা খুলে দেন। টুইটারের সাহায্যে নিজের সমস্যার কথা বলতে শুরু করেন। সদ্য খোলা তার টুইটার অ্যাকাউন্টে তখন মাত্র ২৪ জন অনুসারী। আরবি ভাষায় লেখা প্রথম টুইটে রাহাফ বলেন, ‘আমি থাইল্যান্ডে পালিয়ে আসা এক মেয়ে। আমি আসলেই বিপদের মধ্যে আছি। কেননা সৌদি দূতাবাস আমাকে জোরপূর্বক ফিরিয়ে নিতে চায়। পরিবার আমাকে পেলে হত্যা করবে। আমি আতঙ্কিত।’

টুইটারে তার এই সাহায্যের আকুতি বৃথা যায়নি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাহাফের আকুতি পৌঁছে যায় হাজারো মানুষের কাছে। সেভরাহাফ হ্যাশট্যাগ ছড়িয়ে পড়ে ভার্চুয়াল জগতের পরতে পরতে। কয়েক মিনিটের মধ্যে মিসরীয় বংশোদ্ভূত এক মার্কিনি রাহাফের আরবি টুইটের ইংরেজি অনুবাদ করে তা প্রকাশ করেন। এবার প্রসিদ্ধ এক মানবাধিকার কর্মীর মাধ্যমে তার সেই ইংরেজি টুইট পৌঁছে যায় লাখো মানুষের কাছে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাহাফের বিষয়টি মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নজরে পড়ে। রাহাফের সাহায্যে এগিয়ে আসেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের ডেপুটি ডিরেক্টর ফিল রবার্টসন। রাহাফকে পরমর্শ এবং সাহস দুটিই যুগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাহাফের অনুসারী ২৫ হাজার ছাড়িয়ে যায়। আর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ৫ লাখেরও বেশি টুইটার ব্যবহারকারী সেভরাহাফ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে টুইট করে। রাহাফের সাহায্যের আকুতি জানানো টুইটগুলো বিশ্ববাসীকে নাড়া দিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তার জন্য করণীয় নির্ধারণেও বিশ্ববাসীকে তাগাদা দিয়েছে।

কিন্তু এরপরও থাইল্যান্ডের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা রাহাফের বিষয়টিকে আইনিভাবেই বিবেচনা করতে থাকেন। তারা তাকে কুয়েতে পাঠানোর সিদ্ধান্তে অটল থাকে। রাহাফের থেকে তার পাসপোর্টটিও কেড়ে নেওয়া হয়। কিন্তু কোনো রকমে নিজের মোবাইল ফোনটি নিজের কাছে রাখতে সক্ষম হন রাহাফ। আর ঐ মোবাইল ফোনটিই মূলত তাকে মুক্ত জীবনের আলো দেখিয়েছে।

নিজের পরিবারে কড়া অনুশাসন আর পরাধীনতার মধ্যে বেড়ে ওঠা রাহাফ হাফিয়ে উঠেছিল। তাই এক সময় বাড়ি থেকে পালিয়ে নিজের মতো করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। এছাড়া নিজের দেশে তার লেখাপড়া করা বা কাজ করার সুযোগ নেই বলেও জানান। তিনি স্বাধীন হতে চান, পড়তে চান, নিজের পছন্দমতো কাজ করতে চান। নিজের পরিবারে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

শেষপর্যন্ত রাহাফ কানাডায় আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তাকে সাদরে গ্রহণ করেছে দেশটি। কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের সামনে রাহাফকে পরিচয় করিয়ে দেন ‘দারুণ সাহসী এক নতুন কানাডীয়’ বলে। যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করার সাহস করেছিলেন রাহাফ তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে   দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল থেকে কানাডার উদ্দেশ্যে আকাশে ওড়ার পূর্ব মুহূর্তে, কয়েকটি ছবি টুইট করে লেখেন, আমি প্রমাণ করতে পেরেছি! কুনুনরা    হারে না।