ভারতের নির্বাচনে এবার উত্তর প্রদেশ ‘ফ্যাক্টর’

 

চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে অনুষ্ঠিত হবে ভারতের লোকসভা নির্বাচন। রাজনীতির সব অঙ্ক এখন এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই। এই নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) যেমন ঘর গোছাতে শুরু করেছে, তেমনই প্রস্তুতি নিচ্ছে কংগ্রেসসহ বিরোধীরাও। আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে জোট গঠনের চেষ্টায় রয়েছে বড় দলগুলো। আবার আঞ্চলিক দলগুলোও ভেদাভেদ ভুলে এক হতে শুরু করেছে।

সর্বশেষ শনিবার ভারতের রাজনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য উত্তর প্রদেশে জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে দুই চির প্রতিপক্ষ দল সমাজবাদী পার্টি (এসপি) ও বহুজন সমাজবাদী পার্টি (বিএসপি)। লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদীকে হারাতে দীর্ঘদিনের শত্রুতা ভুলে জোট গড়েছেন এসপি’র অখিলেশ যাদব ও বিএসপি’র মায়াবতী। শনিবার লক্ষ্নৌ’তে এক যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে জোট গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন তারা। উত্তর প্রদেশে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে মায়াবতীর নেতৃত্বাধীন বিএসপি ও অখিলেশের নেতৃত্বাধীন এসপি’র। উভয় দলের নেতাই মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে মায়াবতী বলেন, এই জোট প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বিজেপি প্রধান অমিত শাহের রাতের ঘুম কেড়ে নেবে। জোট গঠনকে রাজনৈতিক বিপ্লব হিসেবে আখ্যায়িত করে অখিলেশ বলেন, বিজেপির ক্রমবর্ধমান বেপরোয়া মনোভাবকে লাগাম দিতে এই একাট্টা হওয়া প্রয়োজন ছিল। তারা জানান, রাজ্যের মোট ৮০টি লোকসভা আসনে কে কোথায় লড়বেন, তা চূড়ান্ত হয়ে গেছে। কংগ্রেসের জন্য দুটি আসন ছেড়ে দেওয়া হবে। এই দুই আসনে দলটির প্রার্থীরা সব সময় জয়ী হয়ে আসছেন। একটি আসনে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী এবং আরেকটি আসনে তার মা সোনিয়া গান্ধী অতীতে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। আরও দু’টি আসন ছোট শরিকদের ছেড়ে দেবে এসপি ও বিএসপি। বাকি ৭৬টি আসনে জোটের দুই শরিক বিএসপি এবং এসপি ৩৮টি করে আসনে একক প্রার্থী দেবে।

ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশ। বেশিরভাগ সময়েই এই রাজ্যে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলই কেন্দ্রে সরকার গঠন করেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে এই রাজ্যে সবাই আলাদাভাবে নির্বাচন করেছিল। সে সময় লোকসভার ৮০টি আসনের     মধ্যেই বিজেপি পেয়েছিল ৭১টি আসন। আর তার শরিক দল আপনা দল পেয়েছিল ২টি আসন। এসপি পেয়েছিল ৫টি আর কংগ্রেস জয়ী হয়েছিল মাত্র ২টি আসনে। সেই হিসাবে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে বিজেপি। এজন্য আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে মায়াবতী ও অখিলেশের জোটের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে নারাজ বিজেপি নেতৃত্ব।

তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আসলে এই বক্তব্যের মাধ্যমে দলের নেতা-কর্মীর মনোবল চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। কারণ সম্প্রতিকালের কয়েকটি নির্বাচনে বিজেপি ধাক্কা খেয়েছে। গত ডিসেম্বরে পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে চরম বিপর্যয় দেখেছে দলটি। শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হিন্দি ভাষা-ভাষী রাজ্য রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে কংগ্রেসের কাছে হেরেছে তারা। তেলেঙ্গানা ও মিজোরামে জিতেছে স্থানীয় দুটি দল। গত লোকসভা নির্বাচনে এই তিন রাজ্যের ৬৫টি আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছিল ৬২টি আসনে। সেখানে পরাজয় দলটির মনোবল অনেকটাই ভেঙে দিয়েছে। কারণ লোকসভা নির্বাচনের আগে পাঁচ রাজ্যের এই নির্বাচনকে দেখা হচ্ছিল সেমি-ফাইনাল হিসেবে। আর সেমিফাইনালে জিতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই ফাইনালে এগিয়ে যায় জয়ী পক্ষ।

অখিলেশ ও মায়াবতীর জোটের পরও উত্তর প্রদেশে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী বিজেপি। দলটির সভাপতি অমিত শাহ বলেছেন, উত্তর প্রদেশের ৮০টি আসনের মধ্যে ৭৪টিতে জয় পাবে বিজেপি। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এসপি-বিএসপি জোটবদ্ধ হওয়ার ফলে ক্ষমতাসীনদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়বে। কারণ রাজ্যে বিজেপির ভোট ৪০ শতাংশ আর এসপি ও বিএসপির মোট ভোট ৪৪ শতাংশ। লোকসভা নির্বাচনে মায়া-অখিলেশ জোটের দাপটে বেশকিছু আসন হারাতে হতে পারে বিজেপিকে। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মায়াবতী ও অখিলেশের জোট মোদীর পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হওয়াকে হুমকিতে ফেলছে।