রাজশাহীতে ইদানীং বিভিন্ন পেশার চাকরিজীবীরাও কৌশলে আবাসন ব্যবসা শুরু করেছেন। বিভিন্ন পেশার মানুষ একত্রিত হয়ে গড়ে তুলছেন বহুতল ভবন। দেদার বিক্রিও করছেন ফ্ল্যাট। এসব ফ্ল্যাট কেনাবেচা থেকে পুরোপুরি রাজস্ববঞ্চিত হচ্ছে সরকার। তাদের আর্থিক লেনদেনের কোনো হিসাব পাওয়া যায় না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীতে চিকিত্সক, প্রকৌশলী কিংবা অন্য সরকারি কোনো বিভাগের কর্মকর্তারা একত্রিত হয়ে বহুতল ভবন গড়ে তুলছেন। এসব ভবনের কিছু ফ্ল্যাট নিজের মালিকানায় রেখে বাকিগুলো বিক্রি করা হচ্ছে। এগুলো বিক্রির সময় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রেজিস্ট্রি করা হচ্ছে না। যারা কিনছেন তারাও রেজিস্ট্রি করে নিচ্ছেন না। তারা শুধু স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তির ওপর ফ্ল্যাট কিনছেন। অবৈধ উপায়ে আয় করা অর্থ কাজে লাগাতে কোনো কোনো সরকারি কর্মকর্তা শুধু চুক্তির মাধ্যমেই এভাবে ফ্ল্যাট কিনছেন। চুক্তিপত্রে স্ত্রী বা সন্তানের নাম উল্লেখ করে ফ্ল্যাটের মালিকানা বুঝে নেওয়া হচ্ছে। এতে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
নগরীর ভদ্রা আবাসিক এলাকা, উপশহর, বিনোদপুর ও ডাবতলা এলাকায় বিভিন্ন পেশার মানুষ একত্রিত হয়ে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ করছেন। ডাবতলা এলাকার একটি ১১ তলা ভবনের নাম ‘কৃষিবিদ টাওয়ার’। চিকিত্সকেরা গড়ে তুলছেন ‘ডিউড্রপ টাওয়ার’। বেশির ভাগ শিক্ষক মিলে গড়ে তুলেছেন ‘ফ্রেন্ডশিপ টাওয়ার’। এসব ভবনে অনেকে একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক। একাধিক ফ্ল্যাটের কারণে অনেকে বিক্রিও করছেন। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রেজিস্ট্রি হচ্ছে না, শুধু মালিকানা বদলের চুক্তি হচ্ছে।
কৃষিবিদ টাওয়ারে কৃষি বিভাগের ২২ জন বড় কর্তার ফ্ল্যাট আছে ২৭টি। এই ভবনে শফিকুল ইসলাম নামে এক কৃষিবিদের ফ্ল্যাট ছিল। বর্তমানে তিনি ইতালিতে আছেন। সম্প্রতি আবদুল হালিম নামে আরেক কৃষিবিদের কাছে শফিকুল ইসলাম ফ্ল্যাট বিক্রি করেছেন। কিন্তু আবদুল হালিম ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রি করেননি। এ বিষয়ে কথা বলতে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। ইতালিতে অবস্থান করায় শফিকুল ইসলামের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যায়নি। তবে ঐ ভবনের এক বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ইতালিতে থাকার কারণে শফিকুল ইসলাম ফ্ল্যাট করে রেজিস্ট্রি দিতে পারেননি। দেশে এলে হয়তো দেবেন। ফ্রেন্ডশিপ টাওয়ারের নিচতলায় বড় এক সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে ‘ফেন্ডশিপ টাওয়ারের ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবহার নীতিমালা’। কিন্তু কোথাও লেখা নেই ফ্ল্যাট বিক্রি বা কিনলে রেজিস্ট্রি করতে হবে। ভবন নির্মাণের সময় সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে ব্যাংক ঋণ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ভবন তৈরির পর ফ্ল্যাট কেনাবেচার সময় ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে সরকারি রাজস্ব।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে রাজশাহীর কর কমিশনারের কার্যালয়ের কর কমিশনার মুহাম্মদ মফিজ উল্যা বলেছেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও তারা অনেক সময় খবর পান না। ক্রেতা-বিক্রেতার একটা চুক্তির মাধ্যমেই সব হয়ে যায়। কিন্তু কেউ তাদের বিষয়ে কোনো অভিযোগ দিলে তারা অবশ্যই ব্যবস্থা নেবেন। তিনি বলেন, ডেভেলপার কোম্পানি যদি ফ্ল্যাট বিক্রি করে, তাহলে অবশ্যই তার রেজিস্ট্রি হয়। রেজিস্ট্রির সময়ই সরকার রাজস্ব পায়। কিন্তু বিভিন্ন পেশাজীবী বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট বিক্রি করলেও সেগুলো রেজিস্ট্রি হচ্ছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রির পরিবর্তে ৩০০ টাকার ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটা চুক্তির মাধ্যমে ফ্ল্যাট হস্তান্তর করা হচ্ছে। এতে রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। এ ধরনের ফ্ল্যাট আবার ক্রেতার আয়কর ফাইলেও তোলা হচ্ছে না। ফলে লুকায়িত সম্পদ হিসেবে এটা রাখার সুযোগ রয়েছে। যদি আয়কর ফাইলে নথিভুক্ত করা হয়, তাহলে সম্পদের ওপর কর আদায় হয়। অর্থাত্, তারা সম্পদ করও ফাঁকি দিচ্ছেন।
এদিকে পেশাজীবীরা এ ধরনের আবাসন ‘বাণিজ্যে’ নেমে পড়ায় ক্ষুব্ধ আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রাজশাহী রিয়েল অ্যাস্টেট অ্যান্ড ডেভেলপারস অ্যাসোসিয়েশন (রেডা)। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান কাজী বলেন, ‘পেশাজীবী মানুষ ও কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে আমাদের ব্যবসা হুমকির মুখে পড়েছে। তাদের কারণে সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে। অথচ একটা ফ্ল্যাটের জন্য আমরা সরকারকে কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা রাজস্ব দিয়ে থাকি। তাই আমরা আশা করি সরকার এ ব্যাপারে শিগিগর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।