শখ থেকেই জাকিয়ার ‘শখ’

>> মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ

 

একঘেঁয়ে জীবন কারোরই ভালো লাগে না। সবাই এমন কোনো কাজ করতে চায় যা মানুষকে উপার্জনের পাশাপাশি আনন্দ দিবে। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি একটা ছোটখাটো উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় অনেকেই। এমনই একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী শেখ জাকিয়া নূর ঐশী। হাতে তৈরি কাঠ ও মেটালের গহনা নিয়ে তার ক্ষুদ্রব্যবসা।

শুরুটা আকস্মিকভাবে হলেও এখন ভালোই চলছে জাকিয়ার ব্যবসা। খুব বেশি কিছু না ভেবেই ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি একটা ফেসবুক পেজ খুলে ফেলে সে। ব্যবসা করার কথা মাথায় আসার আগে তার মাথায় এসেছিল যে—এমন একটা পেজ খুলবে যেখানে সে তার ভালো লাগার কাজগুলো শেয়ার করবে। যেমন সে ছবি আঁকতে ভালোবাসে, মেহেদী পরাতে আর ক্রাফট বানাতেও পছন্দ করে। এসব টুকটাক কাজ শেয়ার করবে। তাই তার মাথায় ‘শখ’ নামটা এলো। পরবর্তী সময়ে দেখা গেলো এই নামের নতুন অনেক পেজ হয়ে গেছে! তাই শখ-এর সঙ্গে নিজের নাম জুড়ে নাম রাখল ‘শখ—Shokh by Jakia’।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই তার এমন কিছু একটা করার ইচ্ছা ছিল, ফলে সে নিজের ওপর আর্থিকভাবে নির্ভর করতে পারে। টিউশনির জমানো টাকা থেকে মাত্র দেড় হাজার টাকা নিয়ে শুরু ‘শখ—Shokh by Jakia’-এর যাত্রা। ছবি আঁকা, ক্রাফটিং, ডিজাইন এসব নিয়ে

কাজ করতে ভালো লাগতো তার। তার বিশ্বাস ছিল কাঠের গহনায় এর সবকিছুই ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। শৌখিন মানুষদের জন্য হাতে তৈরি কিছু শৌখিন জিনিস নিয়ে এসেছে ‘শখ’। বিশেষ করে হাতে তৈরি গহনা। তাই নিজের রুচি ও নিজস্ব ডিজাইনে তৈরি করতে লাগল কাঠ ও মেটালের গহনা। বর্তমানে সে মালা, কানের দুল, আংটি, পায়েল, চোকার, খোপার কাটা, চাবির রিং নিয়ে কাজ করছে। সে মনে করে তার মায়ের সাপোর্টেই এই সাহসটা পেয়েছে এবং এতদূর আসতে পেরেছে। যদিও তার বাবা অনলাইন বিজনেস করার ব্যপারে কখনোই একমত ছিলেন না। তবে সে এখন বুঝতে পারছে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা সে তার বাবার কাছে থেকেই পেয়েছে। তার ভাইয়ের কাছেও অনেক মেন্টাল সাপোর্ট পেয়েছে। তার বন্ধুরাও সবসময় পাশে ছিল। বিশেষ করে তার প্রিয় বন্ধু তৌসিফের সাহায্য না পেলে হয়তো একার পক্ষে শুরুটা আরো কঠিন হতো। প্রথম আড়াই মাস কাজের পরিধি ক্যাম্পাস পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে তার শখের গহনা। এমনকি দেশের বাইরে নিউইয়র্কেও পাড়ি জমাতে সক্ষম হয়েছে  ‘শখ—Shokh by Jakia’। যা তার উদ্যোক্তা জীবনের সবচেয়ে আনন্দের অভিজ্ঞতা। সাধারণত প্রোডাক্টগুলোর ছবি মূল্যসহ পেজে দেওয়া হয়। ক্রেতা যদি কোনো প্রোডাক্ট অর্ডার করতে চান তাহলে সেই মূল্যসহ ছবি দেখেই অর্ডার করতে পারেন।

পণ্যটি এভেইলেবল আছে কি না তা কনফার্ম করার পর ক্রেতার নাম, পুরো ঠিকানা এবং ফোন নাম্বার দিলেই নিশ্চিত করা হয়। ক্রেতা যদি কোনো প্রোডাক্ট বুক করে রাখতে চায় তাহলে তা সর্বোচ্চ ১৫ দিন রাখা হয়, তবে যদি অ্যাডভান্স পেমেন্ট করে দিতে পারে তাহলে সেটা ক্রেতার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। ক্রেতা তা যখন ইচ্ছা তখন নিতে পারেন। শখের সকল প্রোডাক্ট হাতে তৈরি তাই হাতে ৫-৭ দিন সময় নিয়ে অর্ডার করতে হয়। আর যদি প্রোডাক্ট রেডি থাকে তবে ১-৩ দিনের মধ্যেই পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ব্যবসায় সফল হওয়ার মূল দাবিদার হচ্ছে ক্রেতার বিশ্বাস অর্জন। শখ পেজে আপলোড করা প্রোডাক্টের ছবি যেমন আছে তেমনই দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। যেহেতু হাতের কাজ তাই প্রোডাক্ট রিপিটের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ভুলত্রুটি হওয়াটাই স্বাভাবিক। শখের সকল প্রোডাক্টের প্রাইজ প্রায় ফিক্সড থাকে। হোম ডেলিভারি দেওয়া হয়, ক্যাশ অন ডেলিভারি দেওয়া হয়। ঢাকার মধ্যে এবং ঢাকার বাইরে থানা সদরগুলোতে হোম ডেলিভারি দেওয়া হয়। তবে ক্রেতার বাড়ি সদর থেকে ভেতরে হলে কষ্ট করে ডেলিভারি ম্যানের বলা লোকেশনে গিয়ে পার্সেল রিসিভ করতে হয়। নয়তো সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে নিতে হয়। ক্রেতার সন্তুষ্টিই জাকিয়ার শখের উদ্দেশ্য। এই মূলমন্ত্র নিয়ে প্রতিটা ধাপে সে নিজেকে ক্রেতার জায়গায় রেখেই যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আরো অনেক দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আছে তার। বিশেষ করে হাতে তৈরি বিভিন্ন রুচিসম্মত পণ্য সুলভমূল্যে ক্রেতার কাছে পৌঁছে দিতে চায় সে। যেদিন অন্তত একজনের জন্য হলেও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে  ‘শখ—Shokh by Jakia’, সেদিন মনে করবে তার উদ্যোগ সফল হয়েছে।