নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মামলায় আগাম জামিন পেলেন ফরিদপুর-৪ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী (নিক্সন)। গতকাল মঙ্গলবার হাইকোর্টে হাজির হয়ে তিনি আগাম জামিন চান। উভয় পক্ষের শুনানি নিয়ে বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ আট সপ্তাহের আগাম জামিন মঞ্জুর করে। আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, নিক্সন চৌধুরী মহান জাতীয় সংসদের একজন সংসদ সদস্য। জামিন আবেদনের পক্ষে তার আইনজীবী যে বক্তব্য তুলে ধরেছেন, তা বিবেচনার যোগ্য বলে আমরা মনে করি। এ কারণে সীমিত সময়ের জন্য শর্তসাপেক্ষে তাকে জামিন দেওয়া হলে তা ন্যায়সংগত হবে।
এদিকে আদালতের আদেশের পর নিক্সন চৌধুরী বলেন, ‘আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এটা নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের একটি মামলা। ঐ মামলায় আদালত আমাকে আগাম জামিন দিয়েছে। আমি বারবার বলে এসেছি, আমার ফোনালাপের রেকর্ডিংয়ে যতটুকু কথাই আছে, ততটুকু তো ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছেই আছে। কিন্তু ওনার মাধ্যমে এটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কীভাবে এলো, সেই প্রশ্ন আমি তুলে আসছি এবং এটারও বিচার হওয়া উচিত। ওনাকে (ডিসি) তো বলতে হবে এটা কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গেল। এটাও তো আইনত অপরাধ। সরকারই ওনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, সে আশা আমি করছি এবং জনগণ করছে। জেলা প্রশাসক সেটা যখন দেবেন সরকারকে, তদন্ত হবে, তখনই প্রমাণিত হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে, ইনশাল্লাহ তা আদালতেই মোকাবিলা করব। আর আমি তো প্রথম থেকেই বলেছি, এটা অসত্য জিনিস, এটা এডিটিং করে বানানো হয়েছে।’
গত ১০ অক্টোবর চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে গত ১৫ অক্টোবর ফরিদপুর-৪ (ভাঙ্গা-সদরপুর-চরভদ্রাসন) আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন ফরিদপুরের জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কর্মকর্তা নওয়াবুল ইসলাম। মামলা দায়েরের পর তা মিথ্যা ও বানোয়াট আখ্যায়িত করে এমপি নিক্সন চৌধুরীর নেতাকর্মীরা তিন উপজেলাতেই বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এছাড়া ঢাকায় দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সভা-সমাবেশ থেকে নিক্সন চৌধুরীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ইসির মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহারেরও দাবি জানানো হয়েছে।
ইসির মামলায় গত রবিবার হাইকোর্টে আগাম জামিন চেয়ে আবেদন করেন নিক্সন চৌধুরী। মঙ্গলবার শুনানির জন্য দিন ধার্য করে আদালত। সেই মোতাবেক সকালে হাইকোর্টে হাজির হন স্বতন্ত্র এই সংসদ সদস্য। হাজির হন তার নির্বাচনি এলাকার কয়েক শ নেতাকর্মী। দুপুর দেড়টায় জামিন আবেদনের ওপর শুনানি শুরু হয়।
জামিন শুনানিতে তার আইনজীবী ড. শাহ্দীন মালিক বলেন, সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে চিঠিপত্র এবং সকল নাগরিকের যোগাযোগের গোপনীয়তার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১-এ বলা হয়েছে, সরকার জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার স্বার্থে টেলিফোন কোম্পানিকে রেকর্ড (কোনো ব্যক্তির কথোপকথন) করার আদেশ দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে রেকর্ড করার আদেশটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর আদেশক্রমে হবে। কিন্তু নিক্সন চৌধুরীর ফোনালাপ রেকর্ডের ক্ষেত্রে সে ধরনের কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি। তাই তার ফোনালাপ বেআইনিভাবে রেকর্ড করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করায় সংবিধানের লঙ্ঘন হয়েছে। আর ঐ ভাইরাল হওয়া অডিও রেকর্ড দিয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে ইসি। এ কারণে উক্ত মামলা প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি বলেন, সম্প্রতি হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চের রায়ে নাগরিকের ফোনালাপ ফাঁস নিয়ে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ঐ রায়ে বলা হয়েছে, সংবিধানেই নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। চাইলেই কোনো স্বার্থে নাগরিকের সাংবিধানিক এই অধিকার লঙ্ঘন করা যায় না। সেই রায়ের আলোকে এই অডিও রেকর্ড ফাঁস সংবিধান ও রায়ের লঙ্ঘন। তিনি বলেন, জামিন আবেদনকারীর বিরুদ্ধে নির্বাচনের পরে সভা-সমাবেশ করে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু মামলার এজাহারে নিক্সন চৌধুরী ছাড়া অন্য কারো নাম নাই। নেই অজ্ঞাতনামাও। কারণ একজন মানুষের পক্ষে একা সভা-সমাবেশ করা কখনোই সম্ভব নয়।
জামিনের বিরোধিতা করে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জান্নাতুল ফেরদৌসি রুপা বলেন, একজন সংসদ সদস্য নির্বাচনের পরে মিছিল ও শোডাউন করে আইন ভঙ্গ করেছেন। এতে শপথের লঙ্ঘন হয়েছে। এই পর্যায়ে আদালত বলেছে, এক ব্যক্তির পক্ষে কি মিছিল-শোডাউন করা সম্ভব? ডিএজি বলেন, একজন করেননি, আরো অনেকেই ছিল। আদালত বলেছে, এজাহারে তো একজনকে আসামি করা হয়েছে, অজ্ঞাতনামাও নেই। তাহলে এক ব্যক্তি কীভাবে মিছিল-শোডাউন করল?
জামিনের বিরোধিতার জবাবে ড. শাহ্দীন মালিক বলেন, মেম্বারস অব পার্লামেন্ট ডিটারমিনেশন অব ডিসপিউটেড অ্যাক্ট, ১৯৮০তে বলা হয়েছে, যে কোনো সংসদ সদস্য যদি শপথ ভঙ্গ করেন, তাহলে তা দেখার এক্তিয়ার জাতীয় সংসদের স্পিকারের। এটা দেখার দায়িত্ব কোনো থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নেই। শুনানিকালে ড. শাহ্দীন মালিককে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট মনজুর আলম। শুনানি শেষে আগাম জামিন মঞ্জুরের পাশাপাশি মামলার তদন্তে সহযোগিতা করা এবং সাক্ষীদের প্রভাবিত না করার জন্যও বলেছে হাইকোর্ট।
আগাম জামিনের পর আদালত থেকে বেরিয়ে আসেন নিক্সন চৌধুরী। এ সময় সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থান করা নেতাকর্মীরা তাকে ঘিরে ধরেন এবং বিজয়সূচক ‘ভি’ চিহ্ন প্রদর্শন করেন শতশত নেতাকর্মী।
ভাঙ্গায় আনন্দ মিছিল
ভাঙ্গা (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন পাওয়ার সংবাদে ভাঙ্গায় আনন্দ মিছিল হয়েছে। দুপুরে উপজেলা পরিষদ চত্বরে শত শত নেতাকর্মী উল্লাসে ফেটে পড়েন। নিক্সন চৌধুরীর পক্ষে ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ দিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে মিছিলটি শহর প্রদক্ষিণ করে। মিছিল ভাঙ্গা কোর্টপাড় বার কাউন্সিল ভবনের সামনে এসে শেষ হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, নৌকার পক্ষে কাজ করে নৌকাকে বিজয় করেছেন এমপি নিক্সন চৌধুরী। নির্বাচন কমিশন যে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে, তা অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করে নৌকাপ্রেমিক মানুষদের রক্ষা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আহ্বান জানান। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফাইজুর রহমান বলেন, নৌকার পক্ষে কাজ করে যদি মামলা খেতে হয়, তাহলে আগামীতে কেউই নৌকার কাজ সরাসরি করবে না। তিনি আরো বলেন, ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রকিবুর রহমান খান, যিনি নৌকার লোকদের ভয় দেখিয়ে অহেতুক ১৪৪ ধারা জারি এবং রাতে উপজেলা পরিষদের ভেতরে ফাঁকা গুলি করে জনমনে যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন তার জন্য তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। তিনি প্রকৃত পক্ষে বিশেষ একটি দলের এজেন্ট হয়ে কাজ করে নৌকার ক্ষতি করছেন।
আনন্দ মিছিলে আরো উপস্থিত ছিলেন পৌর কাউন্সিলর ওমর ফারুক হবি, ভাঙ্গা বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ আবু জাফর মুন্সি, তুজারপুর ইউপি চেয়ারম্যান পরিমল দাস, আওয়ামী লীগ নেতা ইসমাইল মুন্সী, শাহাদাত্ হোসেন, মেহেদী পারভেজ চন্দন, ইমরান মুন্সী প্রমুখ।