নিরাপদ সড়ক দিবস ও প্রসঙ্গ

মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী

আমরা সবাই সড়কনিরাপত্তা বিষয়ে প্রতি দিনই উদ্বিগ্ন। সংবাদপত্র বা টেলিভিশন খুললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সড়ক দুর্ঘটনায় অসংখ্য তাজা প্রাণহানির খবর। সড়ক দুর্ঘটনায় মুহূর্তে কর্মক্ষম জনসম্পদ বা প্রাণগুলো হারিয়ে সংখ্যায় পরিণত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৫ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২১ হাজার ৩১৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, যদিও বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে দেখা গেছে—একই বছর বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ৬৪২ জন নিহত হয়েছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৫ সাল থেকে সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী গত ৫ বছরে ২৬ হাজার ৯০২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৭ হাজার ১৭০ জন নিহত ও ৮২ হাজার ৭৫৮ জন আহত হয়েছে। সংখ্যা যা-ই হোক, সড়কে মৃত্যুর মিছিল যে থামানো যাচ্ছে না তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে জাতিসংঘ ২০১১ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়কে ‘সড়ক নিরাপত্তা দশক’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এসব সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণকালে দেখা যায়, বর্তমান সরকারের সময়ে সড়ক-মহাসড়কে উন্নয়নের ফলে যানবাহনের গতি বেড়েছে, এই সময়ে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো এবং বিপজ্জনক অভারটেকিং বেড়ে যাওয়ার কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। এ সময়ের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনার বিষয়ে সদস্য দেশগুলো একমতও হয়েছে। এটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সড়ক নিরাপত্তা দশককে কেন্দ্র করে পৃথিবীর দেশে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ফলে ইতিমধ্যে বহু দেশে সড়কনিরাপত্তায় দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে; কিন্তু বাংলাদেশ এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যথাযথ কোনো পরিকল্পনা তৈরি করেনি। সড়ক নিরাপত্তায় যুক্ত বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে নেওয়া পরিকল্পনাগুলো ছিল গতানুগতিক। এর মাধ্যমে কী অর্জিত হয়েছে আর কী অর্জিত হয়নি বা কী অর্জন করা প্রয়োজন—তার সঠিক কোনো ব্যাখ্যা নেই।

সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (এআরআই) গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৩ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বেপরোয়া গতি; কিন্তু গতি নিয়ন্ত্রণ, মহাসড়কে ছোট যানবাহন বন্ধ ও বেপরোয়া যানবাহন চলাচল বন্ধে সাফল্য নেই। এখনো দেশের সড়ক মহাসড়কে দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে ১০ লাখ নছিমন-করিমন-ইজিবাইক। অবাধে আমদানি হচ্ছে অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক। দেশব্যাপী ৫ লাখ ফিটনেসবিহীন বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, হিউম্যান হলার অবাধে চলছে। নিবন্ধনবিহীন ৪ লাখ অটোরিকশা ও মোটর সাইকেল চলাচল করছে সড়ক-মহাসড়কে। এসব যানবাহন সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।

দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির প্রায় ৪৭ শতাংশ পথচারী। আমাদের সড়ক-মহাসড়কে স্বল্পখরচে ফুটপাত, জেব্রাক্রসিং, আন্ডারপাস, ওভারপাস নির্মাণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব। ফুটপাত দখলমুক্ত করে পথচারীর যাতায়াত নিশ্চিত করা গেলে এই বিশাল অর্জন সম্ভব।

উন্নত বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে যেসব পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সেগুলো খুবই সুনির্দিষ্ট হয়; কিন্তু বাংলাদেশে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন দায়সারা গোছের। কত বছরে কী পরিমাণ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমানো হবে। কীভাবে তা অর্জিত হবে, কারা তা সফল করবে। এটা স্পষ্ট করা দরকার। পরিকল্পনা করে রেখে দিলে বা প্রতিদিন নতুন নতুন কথার ফুলঝুড়ি দিলে বা রাস্তায় রাস্তায় লিফলেট দিলে দুর্ঘটনা কমে যাবে—এটা আশা করা ঠিক নয়। আইন প্রয়োগের দুর্বলতা। সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন চলাচলে বিশৃঙ্খলা। চালক-মালিকদের বেপরোয়া মনোভাব এই সেক্টরকে দিনদিন অনিরাপদ করে তুলছে। সরকার জনবান্ধব যে কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গেলে তারা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এহেন পরিস্থিতিতে সড়কনিরাপত্তা আজ মারাত্মক হুমকির মুখে।

দেশের বিভিন্নস্তরের জনসাধারণের মধ্যে সড়কনিরাপত্তা ও দুর্ঘটনাপ্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর নিরাপদ সড়ক দিবস পালন করা হচ্ছে। এই জন্য আমরা সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। দেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ সড়কে প্রাণ দিচ্ছে, আহত হচ্ছে, পঙ্গু হচ্ছে। তাদের সুরক্ষা দিতে এই দিবসটি অন্যান্য জাতীয় দিবসের ন্যায় গতানুগতিকভাবে এক দিন পালন না করে, নিরাপদ সড়ক দিবসকে কেন্দ্র করে মাসব্যাপী স্কুলকলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারসংক্রান্ত আলোচনাসভা, মসজিদ-মন্দির-গির্জায় সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতাসংক্রান্ত আলোচনাসহ দিবসটির তাত্পর্য তুলে ধরে সমাজের সব স্তরে নিরাপদ সড়কের বার্তা পৌঁছে দেওয়া গেলে দিবসটি উদ্যাপনের সুফল পাওয়া যাবে।

২০২১ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে জাতিসংঘের অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সড়কে পথচারীর মৃত্যুর হার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এই অঙ্গীকার নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে মনে করি।।

n লেখক : মহাসচিব, বাংলাদেশ যাত্রী

কল্যাণ সমিতি