মা এক শাশ্বত ভালোবাসার নাম! মা এক আবেগময় বন্ধন। মা মানব জীবনে সবচেয়ে সংবেদনশীল একজন। স্পর্শকাতর শুদ্ধতার নাম। সভ্যতার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মায়ের অবস্থান গভীর মহিমায় সবার জীবনে পরিব্যাপ্ত। এ যে জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। মায়ের মানবিক বোধের অলিন্দে সন্তানের অবাধ চলাফেরা এক আশ্চর্য শক্তি ও সাবলীলতায়। মা সকল সৌন্দর্য, শান্তি, নির্ভরতার প্রতীক—জন্ম জন্মান্তরে, কাল থেকে মহাকালে। অনন্ত সীমারেখায় মা অনিন্দ্য, অজর, অমলিন।
মাকে নিয়ে বিভিন্ন ভাষায় অনেক কবিতা, উপন্যাস, গল্প, গান, ছড়া রচিত হয়েছে। মাকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যেও লেখা খুব কম নয়। তবে শামসুর রাহমানের কবিতা এক্ষেত্রে নতুন মাত্রার সূচনা করেছে। সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে মাকে নিয়ে তিনিই সবচেয়ে বেশি কবিতা লিখেছেন। মাকে কাছ থেকে দেখা আবেগময় অন্তরঙ্গতার ছবি এঁকেছেন কবিতায়।
মায়ের স্বপ্নময়তা, মায়ের অব্যক্ত কথা, অদেখা অনুভব, আকুলতা, অবদমিত হূদয়ের আকুতি তাঁর প্রতিটি কবিতায় ধ্বনিময় হয়ে উঠেছে। মায়ের একান্ত স্বপ্ন, একান্ত বাসনার বাস্তবায়ন যেন কোনোকালেই হয় না। বাঙালি সমাজের মা’দের সম্পর্কে অন্তত একথা বলা যায়। সময়ের পরিবর্তনে আজকাল নারীর মর্যাদা ও ক্ষমতা বেড়েছে অনেকটা। সমাজও তা স্বীকার করছে। আইনের দৃষ্টিতে তার মানবিক অধিকার ও মর্যাদার কোনো হেরফের নেই। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন এখনো সব সমাজে সমান নয়। কিন্তু বাঙালি মা নিজেকে ততটুকুই ব্যক্ত করতে পারেন, যতটুকু তা সংসার, সন্তানের জন্য কল্যাণকর। ততটুকুই তিনি প্রকাশিত যতটুকু সমাজ সহজে গ্রহণ করে। তাই তার আবেগ, অনুরাগ, না বলা কথাগুলো অনেকটা আড়ালে থেকে যায়। অব্যক্ত আঁধারে যেন হারিয়ে যায়। অথবা নীরবে বেদনাসিক্ত ভোরের ফুল হয়ে ফোটে।
শামসুর রাহমান গভীর সহমর্মিতায় মাকে আবিষ্কার করেন। মায়ের প্রতি ভালোবাসা, অন্তর্লীন অনুরাগ, অনিন্দ্য আবেগের প্রতিধ্বনি তাঁর কবিতায় প্রাণময় হয়ে ওঠে। ‘রৌদ্র করোটিতে’ কবিতাগ্রন্থে ‘আমার মাকে’ কবিতায় তারই প্রতিফলন ঘটে অত্যন্ত সাবলীলভাবে :
‘মাকে দেখি প্রতিদিন ধ্যানী প্রদক্ষিণে/ছায়াবৃতা আপন সংসারে। তাকে চিনে/নিতে পারি সহজেই যখন নিভৃত অনুভবে বারবার/একটি ভাস্বর নদী, ফুলের বাগান, মাঠ আর/শস্যক্ষেত, দূরের পাহাড়/মা’কে দেখি। আজো দেখি কী এক মায়ায়/পাখি তার হাত থেকে স্নেহের খাবার খেয়ে যায়/দুবেলা আবেগ ভরে/দেখি তসবী গুণে/সন্ধ্যার মিনারে/সত্তার কিনারে/ঐ দূরায়নী আজানের ধ্বনি শুনে/আর সুবেহ-সাদেকের তীব্র শুভ্রতায় নির্মেঘ আনন্দ শোকে/আজীবন সমর্পিতা কোরানের শ্লোকে।...’
‘আমার মাকে’ কবিতাটিতে চিরচেনা বাঙালি মায়ের নিপুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। মাকে দেখেছেন তিনি শুভ প্রত্যাশা আর স্রষ্টার প্রতি অঢেল বিশ্বাস ও আস্থায়। এ অনড় বিশ্বাস, যে মাকে চিরকাল আছন্ন করে রাখে, তা মায়ের প্রকৃত চিরন্তন মহিমাকেই তুলে ধরে।
শামসুর রাহমানের মাকে নিয়ে ব্যাপক পাঠকপ্রিয় ও বিখ্যাত কবিতা ‘কখনো আমার মাকে’। এ কবিতায় চিরন্তন বাঙালি মা চিরায়ত রূপে প্রতিফলিত হয়েছে। মায়ের যে জীবন কাটে এক আবহমান শাসন, ভয় ও লজ্জার আবরণে। সেখানে তার একান্ত অনুরাগ, ভালোলাগা, আবেগময় মুহূর্তগুলো মুখরিত হওয়ার কোনো সুযোগ পায় না। বুকের গভীরে একান্ত নির্জনে তা চাপা পড়ে থাকে। সময়ের বিবর্তনে তা কখনো স্ফুরিত হয়। আবার কখনো বা হারিয়ে যায় বিষণ্ন নিদারুণ খরায়। শামসুর রাহমান নিজে মায়ের জীবন ঘিরে তা প্রত্যক্ষ করেছেন কাছ থেকে। সেই পর্যবেক্ষণ, অনুভূতির প্রকাশ এক আশ্চর্য কুশলতায় :
‘কখনো আমার মাকে কোনো গান গাইতে শুনিনি।/সেই কবে শিশু রাতে ঘুম পাড়ানিয়া গান গেয়ে/আমাকে কখনো ঘুম পাড়াতেন কি না আজ মনেই পড়ে না।/যখন শরীরে তার বসন্তের সম্ভার আসেনি/যখন ছিলেন তিনি ঝড়ে আম-কুড়ায়ে বেড়ানো/বয়সের কাছাকাছি হয়তো তখনো কোনো গান/লতিয়ে ওঠেনি মীড়ে মীড়ে দুপুরে সন্ধ্যায়,/পাছে গুরুজনদের কানে যায়। এবং স্বামীর/সংসারে এসেও মা আমার সারাক্ষণ/ছিলেন নিশ্চুপ বড়ো, বড়ো বেশি নেপথ্যচারিণী। ... যেন তিনি তার সব গান দুঃখ-জাগানিয়া কোনো কাঠের সিন্দুকে/রেখেছেন বন্ধ করে আজীবন, এখন তাদের/গ্রন্থিল শরীর থেকে কালেভাদ্রে সুর নয়, শুধু/ন্যাপথলিনের তীব্র ঘ্রাণ ভেসে আসে!’ (বিধ্বস্ত নীলিমা)
‘নিজ বাসভূমে’ কাব্যের আরেকটি কবিতা ‘মা’। এ কবিতাটিতে তিনি মায়ের চিরন্তন মহিমা ও ত্যাগকে চিত্রিত করেছেন অনবদ্য শৈল্পিকতায়। আন্দোলন, বিপ্লবে সন্তানহারা একজন মায়ের, মানুষের সর্বজনীন স্লোগানে এক হয়ে যাওয়ার অনন্য উপাখ্যান এ কবিতা :
‘কত যে খবর আসে, কত আত্মদান/রাঙায় দেশের মাটি; সন্তানের রক্তমাখা জামার আহ্বান/টানে গ্রাম্য জননীকে। অনেক পেছনে রইলো পড়ে/লাউয়ের সবুজ মাচা, নদী, মাঠ:/কলাইয়ের ক্ষেত আর পুকুরের ঘাট। পড়ছে পায়ের ছাপ আজ তাঁর জনপথে, আনাচে-কানাচে, সবখানে,/মেলালেন পুত্রহীন হূদয়ের দীপ্ত কান্না শ্লোগানে, শ্লোগানে।’
নানা স্মৃতি, আবেগময় মুহূর্ত মানুষকে টেনে নিয়ে যায় দূর অতীতে। স্মৃতিরোমন্থনের পথে পথে কত রাগ, অনুরাগ, ভালোবাসা, দুঃসহ যন্ত্রণা জীবনকে ভাবিয়ে তোলে। কখনো বা রাঙিয়ে দেয়। মা তো এসব থেকে আলাদা নন। সেই কবে বউ হয়ে এসেছিলেন বেনারসি শাড়ি পরে স্বামীর সংসারে। অবচেতন মনে সেই সময় তাকে কখনো বিহ্বল করে তোলে। কবির ভাষায় :
‘নানা কাপড়ের ভাঁজে কী যেন তন্ময়/খুঁজছেন; ঘরে ওড়ে প্রজাপতি। ফটোগ্রাফ থেকে/আমার পিতার চক্ষুদ্বয়/চেয়ে থাকে, যেন-বা আবৃত্তি করে জন্মদিন। কারুকাজময়/আলমারি থেকে/একটি বানারসী শাড়ি হাতে/নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখলেন কিছুক্ষণ,/তাকিয়ে লাজুক চোখে এদিকওদিক/জড়ালেন গায়ে।/একটু পরেই—/কখন যে মদির গোলাপী বানারসী হয়ে যায়/পশ্চিম আকাশ আর তিনি/আছেন দাঁড়িয়ে/একাকিনী : প্রতীক্ষায় কাতর প্রতিমা।’ (বহুদিন পর মা’কে, ধুলায় গড়ায় শিরস্ত্রাণ)।
আরেকটি কবিতা ‘মার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে’। কবিতাটি পরলোকগত মায়ের জন্য হাহাকার-বিক্ষত হূদয়ের প্রতিধ্বনি। ভুলে যেতে না পারার কষ্ট, মাকে না পাওয়ার বেদনা, মাকে দেখার ব্যাকুল বাসনা এক আশ্চর্য মহিমায় কবি ধারণ করেছেন।
কবিতায় ফুটে উঠেছে তা গভীর ব্যঞ্জনায় :
‘কী করে যে তোমাকে শুইয়ে দিতে পেরেছি এখানে/শীতল মাটির নিচে? তুমি নিথর নিদ্রা মুড়ি/দিয়ে আছো; ফাল্গুনের রোদ/বিছানো কাফন-ঢাকা শরীরে, তোমার/উন্মোচিত মুখ স্পর্শ করি শেষবারের মতন/বজ্রের আওয়াজ কর্জ করে/ যদি ডাকি বারবার, তবু তোমার এই ঘুম/ ভাঙ্গবে না কোনওদিন, কোনওদিন আর।’ (সৌন্দর্য আমার ঘরে)
এভাবে শামসুর রাহমান নানাভাবে, নানা অনুভবে মাকে চিত্রিত করেছেন কবিতায়। তুলে এনেছেন মাতৃহূদয়ের অফুরন্ত কোমল শুদ্ধতা। মাকে দেখেছেন পরম বোধ ও আবেগমথিত অন্তরে। শামসুর রাহমানের কবিতার বৈচিত্র্য, বহুমুখিতা, শ্রেষ্ঠত্বের এ এক অনন্য অধ্যায়।
শামসুর রাহমান [২৩ অক্টোবর ১৯২৯—১৭ আগস্ট ২০০৬], প্রতিকৃতি অঙ্কন :সোহেল আশরাফ