গোটা ঐতিহাসিক কালব্যাপী দেখা যায়, মানুষের জীবনের সঙ্গে তার ভাষার কিংবা নিজের ভাষার সঙ্গে মানুষের জীবনের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। দেখা যায়, জীবন যেখানে উন্নত, ভাষাও সেখানে উন্নত এবং ভাষা যেখানে উন্নত, জীবনও সেখানে উন্নত। ভাষার উন্নতি সাধিত হয় ভাষায় জ্ঞানবিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টির এবং জাতীয় উন্নতির মধ্য দিয়ে। নিজের ভাষাকে উন্নত না করে কোনো ব্যক্তি কিংবা জাতি উন্নতি করতে পারে না।
জাতি ও রাষ্ট্রের উন্নতির সঙ্গে ভাষার উন্নতি কিংবা ভাষার উন্নতির সঙ্গে জাতি ও রাষ্ট্রের উন্নতি অবিচ্ছেদ্য। মানুষের জীবন ও পরিবেশ বিকাশশীল। উন্নত জাতিগুলো তাদের ভাষার উন্নতির জন্য পরিকল্পনা নিয়ে অনেক কাজ করে। সাম্রাজ্যবাদীরা তত্পর থাকে নিজেদের ভাষার উন্নতি সাধনে এবং দুর্বল জাতিগুলোকে ভাষার দিক দিয়েও নির্ভরশীল রাখতে।
মানুষ ভাষা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না, জন্মের পর ভাষা আয়ত্ত করে। ভাষা আয়ত্ত করার এবং ভাষাকে বিকশিত করার সামর্থ্য মানুষের আছে। আদিতে মানুষের ভাষা ছিল না, মানুষই ভাষা সৃষ্টি করেছে। কেবল বাক্যন্ত্রের ক্রিয়া দিয়ে ভাষার মর্ম বোঝা যায় না। ভাষার সঙ্গে মানুষের গোটা অস্তিত্ব ও পরিবেশ জড়িত থাকে। ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত জীবনপ্রয়াসে মানুষের ইচ্ছাশক্তি, চিন্তাশক্তি ও শ্রমশক্তি একসঙ্গে কাজ করেছে ভাষা সৃষ্টিতে। মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণীরই ভাষা সৃষ্টি করার মতো জৈবিক সামর্থ্য নেই। মানুষের মতো ক্রমাগত নিজেকে এবং নিজের পরিবেশকে উন্নত করার সামর্থ্যও আর কোনো প্রাণীর নেই।
দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় এমন মাত্র ২০০ ভাষা দুনিয়ায় আছে। এসব ভাষা বিকাশশীল। এগুলোর মধ্যে জ্ঞানবিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যের দিক দিয়ে বাংলা ভাষার স্থান এখনো ওপরের দিকেই আছে। এগুলো ছাড়াও বিভিন্ন মহাদেশে কয়েক হাজার ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী আছে। তাদেরও আলাদা আলাদা ভাষা আছে, এসব ভাষা বিলীয়মান।
বাংলাদেশে ৪৫টি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ৪৫টি বিলীয়মান মাতৃভাষা আছে। এই ৪৫টি জনগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশের সামান্য বেশি। এরা জন্মের পর থেকেই নিজেদের ভাষার মতো বাংলা ভাষাও শেখে। এদের বলা যায় দ্বিভাষিক। বাংলা ভাষাকেই তারা উন্নতির অবলম্বন মনে করে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের এবং বাংলাদেশেরও বিলীয়মান মাতৃভাষাগুলোকে রক্ষা করার চেষ্টা বাস্তবসম্মত নয়। এক্ষেত্রে ইউনেসকোর প্রচার ও কাজ বাস্তবতাবিরোধী। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহের লোকেরা জীবনযাত্রার ও উন্নতির প্রয়োজনে নিজেদের ভাষার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রভাষা শিখছে। এর মধ্যে রয়েছে তাদের উন্নতির সম্ভাবনা। বিভিন্ন রাষ্ট্রে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহের উন্নতির ও মানবজাতির মূলধারায় আসার সুযোগ সর্বত্র বাড়াতে হবে।
আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মূল চেতনা ও উদ্দেশ্য থেকে ইউনেসকোর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এর দ্বারা রাষ্ট্রভাষারূপে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা ব্যাহত হচ্ছে। বিলীয়মান মাতৃভাষাগুলোর উন্নতির জন্য রাষ্ট্রভাষা বাংলার উন্নতিকে স্থগিত রাখা ঠিক হবে না। উন্নত নতুন ভবিষ্যত্ সৃষ্টির লক্ষ্যে আমাদের এগোতে হবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ধারা ধরে। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহকে নিজেদের উন্নতির জন্য পার্শ্ববর্তী বৃহত্ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে রাষ্ট্র গঠন করতে হয় এবং রাষ্ট্রভাষা শিখতে হয়। তারা যদি বাইরে থেকে কিছুই গ্রহণ না করে কেবল নিজেদের বিলীয়মান মাতৃভাষা ও নিজেদের অভ্যস্ত জীবনযাত্রা নিয়ে চলে, তাহলে তারা কোনো কালেই উন্নতি করতে পারবে না।
রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও উন্নতির জন্য বাংলা ভাষার অস্তিত্ব ও উন্নতি অপরিহার্য। চলমান বহু ঘটনা আছে, যেগুলো দেখে বলা যায়, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা না টিকলে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ টিকবে না। দেশ থাকবে, মাটি মানুষ গাছপালা পশুপাখি নদীনালা ও আকাশ-বাতাস থাকবে কিন্তু রাষ্ট্র থাকবে না। দেশ ও রাষ্ট্র এক নয়। দেশ প্রকৃতির সৃষ্টি, রাষ্ট্র মানুষের। আমাদের রাষ্ট্র না থাকলে কেবল দেশ থাকলে আমরা কি ভালো থাকব?
ভৌগোলিক বাস্তবতা ও বাঙালি চরিত্র লক্ষ করে ১৯৭৩ সাল থেকেই কোনো কোনো চিন্তাশীল ব্যক্তি বলে আসছেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার মতো নয়। তারা জোর দিয়েছেন বাঙালি চরিত্রের নিকৃষ্টতায়। তাদের যুক্তি ও মত কখনো আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তারা অনেকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় নাগরিকত্ব নিয়েছেন এবং প্রায় সবাই তাদের সন্তানদের ঐসব রাষ্ট্রে নাগরিক করেছেন। তারাই আবার বাংলাদেশে কর্তৃত্ব করছেন। আমার মতে, অন্য দেশের নাগরিক হওয়ার সুযোগ সবারই থাকা উচিত, কিন্তু কেউ অন্য দেশের নাগরিক হলে কিংবা সন্তানকে অন্য দেশে নাগরিক করলে বাংলাদেশে কোনো রাষ্ট্রীয় পদে থাকার কিংবা যোগদানের অধিকার তার থাকা উচিত নয়। সংবিধানে অবশ্যই এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকা উচিত।
আমি সব সময় বাঙালি-চরিত্রের উন্নতি সম্ভব বলে মনে করেছি। আমি সব সময় মনে করেছি এবং এখনো মনে করি, বাংলাদেশকে অবশ্যই বাংলাদেশের জনগণের প্রগতিশীল রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলা যাবে। সে লক্ষ্যেই আমাদের চিন্তা ও কাজ, দরকার নৈতিক উন্নতি।
জাতীয় হীনতাবোধ বাংলাদেশের ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ক্ষমতাবান-ক্ষমতাবঞ্চিত সব মানুষকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। জনসাধারণ ঘুমন্ত। জাতীয় হীনতাবোধ থেকে জাতিকে মুক্ত করতে হবে। ঘুমন্ত জনসাধারণকে জাগাতে হবে। অবস্থার উন্নতির জন্য যা-কিছু করা দরকার, সবই করতে হবে। জাতীয় উন্নতির লক্ষ্যে গবেষক, চিন্তক ও শিল্পী-সাহিত্যিকদের কাজ করা উচিত।
বড় দুই রাজনৈতিক দল জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের কথা না ভেবে কেবল রাজত্ব করার চিন্তায় মগ্ন। বাংলাদেশের সব প্রচারমাধ্যম ১৯৮০-র ও ১৯৯০-এর দশকে বিবিসি রেডিওর অন্ধ অনুসারী হয়ে কাজ করেছে। বিরোধী দলগুলোও তা-ই করেছে। ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে বড় দুই রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সাহায্যের আবেদন নিয়ে ক্রমাগত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার এবং ভারতেরও স্থানীয় দূতাবাসগুলোতে সাহায্য চাইতে যান। তারা চলে যান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্কে। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্যও কোনো কোনো নেতা নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের হেড অফিসে গিয়ে তদবির করেন। সাম্রাজ্যবাদী অর্থসংস্থাগুলো ‘দাতা সংস্থা’ ও ‘উন্নয়ন সহযোগী’ নাম নিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় নীতিনির্ধারণে যুক্ত হয়। বাংলাদেশে একদিকে আছে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ব্রিটিশ কাউন্সিলের ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত ও-লেভেল, এ-লেভেল এবং অন্যদিকে আছে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত ইংলিশ ভার্শন। এ সবই বাংলাদেশের জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
বাংলা উন্নত ভাষা। এর ভিত্তিতে আছে আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রীয় বিরাট সম্ভাবনা। এই ভাষাকে তুচ্ছজ্ঞান করে ইংরেজি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করে বাংলাদেশে রাষ্ট্র গঠন সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের উন্নতির জন্য ইংরেজি ও আরো কয়েকটি বিদেশি ভাষা শেখার ভালো ব্যবস্থা অবশ্যই বাংলাদেশে করতে হবে। বর্তমান শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার দরকার।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যত্ নিয়ে ভাববার সময় চলে যাচ্ছে। সময় থাকতে চিন্তা ও কাজ করতে হয়। সময় চলে গেলে সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়। আজকের মূল প্রশ্ন—বাংলাদেশকে আমরা রাষ্ট্ররূপে গড়ে তুলব কি তুলব না। যদি সিদ্ধান্ত হয় গড়ে তুলব তাহলে সময় নষ্ট না করে কাজ আরম্ভ করতে হবে। রাষ্ট্র গঠনের জন্য চেষ্টা লাগবে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাষ্ট্র গঠিত হয় না। বাংলাদেশের জনগণের চেতনায় নিজেদের রাষ্ট্র গঠনের মহান লক্ষ্য দরকার।
কেউ কেউ বলে থাকেন, এখন বিশ্বায়নের কাল, বাংলাদেশকে রাষ্ট্ররূপে গঠন করা এখন গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার ধারণা, এই দৃষ্টিভঙ্গি ও মত বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিশ্বসরকার গঠিত হলেও জাতীয় সরকার থাকবে। বিশ্বসরকার হবে জাতীয় সরকারসমূহের ঊর্ধ্বতন এক সরকার। তার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ থাকার কেবল আন্তঃরাষ্ট্রিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। তা হবে জাতিসংঘের মতো। জাতিসংঘ বহুলাংশে অকার্যকর বিশ্ব সরকার কার্যকর হতে পারে। কার্যকারিতা নির্ভর করে তার গঠনপ্রকৃতির ওপর।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পর্যায়ে এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরে প্রথম দুই দশকে বাংলা ভাষার উন্নতি এবং রাষ্ট্রভাষারূপে বাংলা ভাষার প্রচলন অনেকটুকু হয়েছে। কিন্তু ১৯৯১ সাল থেকে বিদেশি সহায়তায় রাজনীতি যে রূপ নিয়েছে, তাতে রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়নি।
একুশে ফেব্রুয়ারিকে উদ্যাপন করতে হবে রাষ্ট্রভাষা দিবস রূপে। রাষ্ট্রভাষা দিবস উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের এবং রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নবচেতনা সৃষ্টি করতে হবে। ১৯৭৫ সালে বিলুপ্ত করা বাংলা উন্নয়ন বোর্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। সামনের দিকে এগোবার উদ্দেশ্যে নানাজনের মতামত প্রকাশিত হোক—এটাই কাম্য। অবস্থার উন্নতি সাধনের জন্য অবশ্যই ঐক্যের তাগিদ ও ঐক্য দেখা দেবে।
n লেখব :অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশিষ্ট চিন্তাবিদ