নারীর সুরক্ষা বনাম রাজনীতি

প্রাণবিক মানুষ প্রকৃতির অবদান, নারী-পুরুষ গড়ে দুনিয়াদারি। ২০১১ সালের এক গবেষণায় চোখ বোলানো যাক। নারী নিপীড়নকারী পুরুষদের ৩০ শতাংশ মনে করেন, এমনটা করার অধিকার তাদের আছে। নারীকে শাস্তি দিয়ে নিজেদের ক্রোধ প্রশমিত করারও হকদার তারা। আর এই নিপীড়কদের ৭৯ শতাংশের বক্তব্য, যৌনতা পুরুষেরই অধিকার।

পুরুষের বিকৃত ও একপেশে এই চিন্তার গোড়াটি পোঁতা নারীবিদ্বেষী সমাজ-সংসারের উর্বর ভূমিতে; রাজনীতির অনুকূল আবহাওয়ায় এর চাষবাস, বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে যা পুষ্ট। অর্থাত্ পুরুষের চিন্তায় রাজনৈতিক-সামাজিক সিলমোহরের গভীর ছাপ। এই আমাদের দুনিয়াদারি। আর এ কারণেই যে কর্মকাণ্ড মানবীয় পরিচয়কে রীতিমতো মুছে ফেলে, যার প্রতিক্রিয়ায় আত্মধিক্কারে ভেঙে পড়ার কথা, জর্জরিত হওয়ার কথা অনুশোচনার বিষে, তার পরও নিপীড়ক পুরুষটি নির্বিকার থাকে। এই নির্বিকারত্বের রসদ পায় সে রাজনীতি প্রযোজিত, সমাজনির্মিত ‘পৌরুষ’ থেকে। অর্থাত্ লৈঙ্গিক দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে নারীর প্রতি এমন বিদ্বেষী, এমন বলপ্রয়োগকারী করে তোলে, যা তার ভাবনায় ‘অধিকার’-এর আদল পায়। নারীর প্রতি সহিংসতায় পুরুষের গায়ের জোরের বিষয়টিও ধর্তব্যের বাইরে নয়।

‘পুরুষ’ হওয়ার ভিত শৈশবেই গড়া হয়, নারী বানানোর প্রক্রিয়ার শুরুটাও শিশুকালে। একই পরিবারের একটি মেয়েশিশু ও ছেলেশিশুকে যে দ্বিমুখী আদব-কেতা তথা লৈঙ্গিক পার্থক্যসূচক রীতিনীতি শেখানো হয়, তাতে শিশুমনেই এই ধারণা স্পষ্ট হয়—কে অধস্তন, কার অধীনে কে থাকবে। ছেলেশিশুটি শুধু খাবারদাবার বা পোশাক-পরিচ্ছদে অগ্রাধিকার পায় না, বাইরের দুনিয়ায় শঙ্কাহীন ঘুরে বেড়ানোর এক্তিয়ার যে তার, শিখে যায় তা-ও। আর মোটাদাগে অন্দরে থাকাই যে তার নিয়তি, অনায়াসে বুঝে যায় মেয়েশিশুটি। পরের পর্বে জীবনভর কায়েমি পুরুষতন্ত্র ছেলেটিকে সম্ভাব্য ‘নিপীড়ক’ করে তোলে। বিপরীতে মেয়েটি অভ্যস্ত হয়ে ওঠে নিজেকে নানামুখী ‘বিপদ’-এর কারণ হিসেবে ভাবতে; এমনকি কত কীভাবে সে পরিবারের ‘বোঝা’, সে ভাবনাও পোক্ত হতে থাকে, নারীত্বের বিপদ ও বোঝা। বাইরে যাওয়ায় বিপদ, একা যাওয়ায় আরো বড় বিপদ, রাতে তো মহাবিপদ, এমন বহুবিধ বিপত্সংকেত নারীকে দেখিয়ে যেতে থাকে সমাজ-সংসার।

‘শিক্ষিত’ তরুণদের নারীর প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষাবঞ্চিত তরুণদের বেলায়ও তা অভিন্ন। অর্থাত্ সমাজের যে স্তরেই বেড়ে উঠুক, একই জল-হাওয়া; উভয়েই একই সামাজিক-রাজনৈতিক ডিসকোর্সের অধীন। ‘শিক্ষা’ও তাদের মধ্যে কিছুমাত্র ফারাক গড়ে দিতে পারেনি। কারণ, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায়ও সেই একই গলদ। প্রশ্নটা ৩২ দিন বা ৩২ মিনিটের নয়, ৩২ মাস-বছরেও এই দুই পক্ষের কারো কোনো বিকার হতো কি? হওয়ার কথাও নয়। কারণ, একে তারা এমন কিছু মহাভারত অশুদ্ধ করার মতো কাজ করেনি, ‘অধিকার’ ফলিয়েছে মাত্র এবং দুই. তারা জানে, তাদের কিছু হবে না। এই দাম্ভিকতা সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনাচরণে অর্জিত; দায়মুক্তির এই বাতাবরণ রাজনৈতিক প্রাপ্তি। এই আমাদের দুনিয়াদারি।

নারীর প্রতি পুরুষের এই বেহদ বিদ্বেষ, আগ্রাসি মনোভাব, হিটলারি হিংসা লালনে যৌন সুড়সুড়ির ভান্ডার হিন্দি-পশ্চিমি সিনেমা-সিরিয়াল, ইন্টারনেটের অবাধ পর্নো দুনিয়ার ভূমিকাও কম নয় কিছু। দেশ-গেরামের মাটির গন্ধমাখা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে সবার চোখের সামনেই। খেলাধুলার চর্চাও অস্তমিত। সে দিকে কারো হুঁশ আছে বলে মনে হয় না।

গত দুই দশকে দেশে নারী ও শিশু নিপীড়নের ঘটনায় দায়ের মামলায় সাজা পাওয়ার হার শূন্যই বলা যায়; দশমিক ৩৭ শতাংশ। আইন থাকার পরও তার প্রয়োগের এমন রুগ্ণ পরিসংখ্যান হ্যাবিচুয়াল রেপিস্ট বা স্বভাবগত ধর্ষকদের যতটা ‘উজ্জীবিত’ করে, রাজনৈতিক-সামাজিক বাহুবলীদের জন্য ততটাই রামরাজ্যের বার্তা, দায়মুক্তির পয়গাম। হাতেগোনা হ্যাবিচুয়াল রেপিস্টের যৌন অপরাধ সংঘটনের হার কোনোভাবেই ১ শতাংশের বেশি নয়, বাকি ৯৯ শতাংশের পেছনে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, একচ্ছত্র ক্ষমতার অনাচার, সামাজিক বাহুবল এবং অবশ্যই বিচারহীনতা। আর তাই আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান সংযুক্তি কতটা সমাধান, সংশয় থাকছেই।

পারিবারিক মোড়কে নারী (ও শিশুর) প্রতি সহিংসতার যে মহামারি, তার প্রতিকারই-বা মিলবে কীসে? ম্যারিটাল রেপ বা বৈবাহিক ধর্ষণ আমলে নেওয়ার জন্য এই সমাজ এখনো প্রস্তুত নয়। স্বামী-শ্বশুর-ভাশুর থেকে শুরু করে ননদ, শাশুড়ির হাতে শারীরিক-মানসিক নিগ্রহের শিকার হন না, এমন গৃহবধূ কজন আছে এই পোড়া দেশে? কর্মক্ষেত্রে একই দক্ষতার হওয়ার পরও নারী সমান পারিশ্রমিক-সম্মান-পদপদবি পান কি? প্রান্তিক জনপদের মাঠে-ময়দানে শ্রম দেওয়া নারী আর চকচকে করপোরেট দুনিয়ায় কর্মরত নারীর বঞ্চনা এক সুতায় গাঁথা। নারীর শ্রমনির্ভর গর্বের পোশাক খাতেও নারীদের অবস্থা অভিন্ন।

এই দুনিয়াদারিতে ‘দারা পুত্র পরিবার, তুমি কার কে তোমার’ প্রশ্ন তোলার অবকাশ থাকলেও দুনিয়াদারির দিকদিশা রাজনীতিই ঠিক করে। রাজনীতিই সমাজের নির্মাতা, সমাজের মেরামতও তাই সক্ষমতার নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্ন। বৃহত্তর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া সামাজিক ন্যায়বিচার বা আইনের শাসন কায়েমের দ্বিতীয় পথটিও নেই। রাজনৈতিক শুদ্ধিকরণেই নিহিত লৈঙ্গিক বৈষম্যের সমাধান।

ঘরে-বাইরে নারীর প্রতি যে হাজারো আঘাত-অপমান-আক্রমণ-বঞ্চনার বন্দোবস্ত বিদ্যমান, তার সমাপন বা সম্প্রসারণ তাই রাজনৈতিক বিষয়, রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার বিষয়।

n লেখক :সাংবাদিক