সাক্ষাত্কার

হজের খুতবা বাংলা ভাষায়ও প্রচারের ব্যবস্থা হওয়ায় মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাই

প্রশ্ন—১. মুহতারাম, আসসালামু আলাইকুম। আপনি কেমন আছেন? আপনি কীভাবে মক্কা আল মুকাররামার অতিথি অনুবাদক হলেন, জানতে চাই।

উওর :মুহতারাম, ওয়া আলাইকুম আস্সালাম। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আমি ২০১৬ সালে ইউরোপে (ফ্রান্সে) আমার সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে ষড়যন্ত্রমূলক একটা পরিস্থিতির শিকার হয়ে যাই। সেই বিপত্কালীন আমি একটা স্বপ্ন দেখি। পরে মক্কা-মদিনার দিকে রওনা দিলাম। পবিত্র মদিনা শরিফে রাসুল হযরত মোহাম্মদ (স)-এর রওজা মোবারকের পাশে মসজিদে নববিতে ফকিরের মতো শুয়ে থাকতাম। হঠাত্ একদিন আহলে বাইত, রাসুল মোহাম্মদ (স)-এর বংশধর সৈয়দ ইব্রাহিম হাফিজাহুল্লাহ আমাকে একটা লাঠি উপহার দিলেন, ঐ দিন রাতেই রাসুল হযরত মোহাম্মদ (স)-এর মিম্বরের পাশে বসে তাহাজ্জুদ নামাজের পর মোনাজাতরত অবস্থায় আমি দেখি নাই, পেছন থেকে এক লোক আমার হাতে একটি সোনার কলম দিয়ে যান। পরে পবিত্র মদিনা শরিফ থেকে পবিত্র মক্কায় চলে গেলাম। মোলাকাত করলাম পবিত্র কাবা শরিফের প্রধান ইমাম শাইখ আব্দুর রহমান সুদাইছির সঙ্গে। তিনি আমাকে দেখে আল কোরআনের একটা আয়াত তিলাওয়াত শুরু করেন, আলা ইন্না আউলিয়া আল্লাহহি লা খাউফুন আলাইহিম ওয়ালা হুম ইয়াহজানুন। এরপর থার্টি ফাস্ট নাইট ইসলামে নাজায়েজ বলে এশার নামাজ পড়ে মাত্র ১৫ মিনিট বয়ান করেন পবিত্র কাবা শরিফের প্রধান ইমাম শাইখ আব্দুর রহমান সুদাইছি। বয়ান শেষে দেখা গেল, অনেক হাজি আরবি ভাষা বোঝেন না, তখন তারা ইংলিশ ভাষায় অনুবাদ করতে বললে আমি ঐ আরবি বয়ান ইংলিশ ভাষায় অনুবাদ করি। এ ছাড়া ‘তাফসিরুল উশরিল আখির মিনাল কুরআনিল কারিম’ নামে পবিত্র আল কোরআন খুব সংক্ষেপে আরবি থেকে বাংলা অনুবাদ করার সৌভাগ্য হয়। তবে সদাকায়ে জারিয়াহর কারণে ঐ তাফসিরের কোনো নাম সেখানে উল্লেখ করা হয়নি। এরপর আল্লাহপাকের মেহেরবানিতে একসময় মক্কা আল মুকাররামার অতিথি অনুবাদক হিসেবে কাজ করার সৌভাগ্য অর্জন করি।

প্রশ্ন—২. আপনি মূল কাবাঘরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছেন কতবার? এ সময় আপনার অনুভূতি কেমন ছিল?

উওর :আল্লাহপাকের পবিত্র ঘরটিতে দুই বার প্রবেশের সৌভাগ্য এই অধমের হয়। তখন অনুভূতি ছিল অন্যরকম। জীবিত থাকা অবস্থায় হযরত ইদরিছ নবি (আ) যেমন জান্নাতে প্রবেশ করেছিলেন, তিনি আর জান্নাত থেকে বের হননি। ঠিক তদ্রূপ আমারও অনুভূতি ছিল যে আমি যেন আর পবিত্র কাবাগৃহ থেকে দুনিয়ার জমিনে ফিরে না আসি। তবে পবিত্র কাবা শরিফের দরজাটা দিয়ে আমার মুখটা ঢেকে ফেলেছি।

প্রশ্ন—৩. আরাফাতের ময়দানে পবিত্র হজের সময় এবার হজের খুতবার অনুবাদ বাংলা ভাষায়ও প্রচার করা হয়েছে। বাঙালি মুসলমানদের জন্য এটি একটি পরম পাওয়া। আমরা জানি, এর পেছনে আপনার মূল্যবান অবদান আছে। এটা কীভাবে সম্ভব হলো?

উওর :আমি বাংলাদেশি। আমার ভাষা বাংলাকে নিয়ে আমি গর্ববোধ করি। আমি এবারের হজে আরবি থেকে বাংলা অনুবাদ করে শোনানোর জন্য মৌখিকভাবে প্রস্তাব করি মসজিদুল হারাম কমিটিকে। ওনারা আমার প্রস্তাবটি সাদরে গ্রহণ করেন। সেজন্য আমি মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি। বর্তমানে ১০টি ভাষায় অনুবাদ হয়।

প্রশ্ন—৪. আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে জানতে চাই।

উত্তর :সিলেটের গোলাপগঞ্জের রানাপিং কওমি মাদ্রাসায় দাওরায়ে হাদিছ টাইটেল পাশ করার পাশাপাশি সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পাশ করি। অর্থাত্, ডাবল টাইটেল।

প্রশ্ন—৫. বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ মসজিদের খতিব থাকাকালে আপনার এমন কোনো স্মৃতির কথা কি মনে পড়ে, যা আপনার হূদয়ে এখনো দাগ কেটে রয়েছে?

উওর :বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ মসজিদের ইমাম ও খতিব থাকাকালীন আমি আল্লাহর অধম বান্দা সবাইকে সম্মান করতাম এবং আমাকেও সবাই মহব্বত করতেন। তবে আমার জীবনের সবচেয়ে একটা ঐতিহাসিক মেমোরির কথা বারবার আমার মনে উঁকি দেয়। কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর ফখরুদ্দিন সাহেবের সময় সিলেটের জেলা প্রশাসন কর্তৃক আয়োজিত বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া উত্তরণে একটা মিটিংয়ে আমি ডক্টর ফখরুদ্দিন আহমদের উপস্থিততে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাদের কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে কথা বলি। এর কিছুদিন পর সব রাজনৈতিক নেতা মুক্তি লাভ করেন এবং বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন শুরু হয়ে যায়।

প্রশ্ন—৬. ইত্তেফাকের ধর্মচিন্তা পাতার পাঠকদের জন্য আপনার তিনটি নসিহত শুনতে চাই।

উওর :আমি নালায়েক, নাদান বান্দা। আমার পক্ষ থেকে নসিহত প্রদানের মতো কোনো ইল্ম ও আমল এই অধমের নেই। তবে আমি নিজে আমল করার চেষ্টা করি। সেটা হলো এক. সদা সর্বদা মহান আল্লাহর নিকট খালিছ নিয়তে তাওবা করা। দুই. পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ আদায়ে মনোযোগসহকারে সচেষ্ট হওয়া। এবং জন্ম থেকে নিয়ে এখন পর্যন্ত জীবনে যত ফরজ নামাজ কাজা হয়েছে সেই কাজা নামাজগুলো যত্নসহকারে আদায় করা। অভ্যাস করলে সবই মানুষের আয়ত্তে চলে আসে বিধায় সালাতুত তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। তিন. সব সময় মহান আল্লাহর জিকরে মগ্ন থাকা। যেমন—হাতে করেন হাতের কাজ, মুখে জপেন আল্লাহর নাম। সময়-সুযোগ করে প্রাত্যহিক আল কোরআন তিলাওয়াত করা। মানুষ মাত্রই তো দোষে-গুণে মানুষ। যতটুকু সম্ভব হয়, ততটুকু চোখের গুনাহ, হাতের গুনাহ, জবানের গুনাহ এমনকি শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গুনাহ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করা।

প্রশ্ন—৭. আপনাকে ধন্যবাদ! জাজাকাল্লাহু বিখাইর।

উওর :মুহতারাম, আপনাকেও অশেষ ধন্যবাদ। মহান আল্লাহর নিকট আপনার ও আপনাদের সবার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। বারাকাল্লাহু ফি হায়াতিকুম। আমিন।

সাক্ষাত্কার গ্রহণ :ফাইজুল ইসলাম