পৃথিবী যখন আলো-আঁধারে নিমজ্জিত হয়েছিল, সর্বত্র চলছিল অশান্তি আর অনাচার, মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নেমে এসেছিল অবক্ষয়; ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গনে বিরাজ করছিল অমানিশার ঘোর আঁধার; সমাজে ছিল না কোনো মান ও ইজ্জতের সামান্য নিরাপত্তা; ঠিক সেই সময়ে আবির্ভূত হন বিশ্বনবি হযরত মোহাম্মদ (স)। তার সময়ে সব মানুষ ছিল অধিকারবঞ্চিত। হানাহানি, হিংসা-বিদ্বেষ, লুটতরাজ, কাটাকাটি, হত্যা, লুণ্ঠন, ব্যভিচার, নারী ধর্ষণ, অপহরণ ইত্যাদিতে মানুষের জীবন বিষিয়ে উঠেছিল। চারদিকে গোত্রীয় দ্বন্দ্ব, ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে যুদ্ধ চলছিল বছরের পর বছর, শতাব্দীর পর শতাব্দী। সমাজের পরতে পরতে জেঁকে বসেছিল বর্বরতা আর কুসস্কারের সর্বনাশা থাবা। এমন এক ক্লান্তিলগ্নে পৃথিবীতে আগমন করলেন রহমাতুল্লিল আলামিন খ্যাত মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ (স), যিনি ঘুণে ধরা এই সমাজকে পরিবর্তন করে মহান স্রষ্টার বাণী সমুন্নত রেখে এমন এক সমাজের উন্মেষ ঘটালেন, যেখানে যাবতীয় অসাম্যের অবসান ঘটল, গোটা সমাজব্যবস্থা উদ্ভাষিত হলো এক স্বর্গীয় আলোকে।
প্রিয় নবি (স) নবুয়ত লাভের পূর্বেই তত্কালীন আরবের সামাজিক নৈরাজ্যের করুণ চিত্র নিয়ে ভাবতেন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সদা উদ্গ্রীব থাকতেন। তত্কালীন সামাজিক নৈরাজ্য আর দুরবস্থা তার কোমল হূদয়ে প্রচণ্ড নাড়া দিয়েছিল। হরবুল ফুজ্জারের করুণ চিত্র দেখে তিনি সমাজ সংস্কারের মহান ব্রত নিয়ে মাত্র ১৭ বছর বয়সে গড়ে তোলেন হিলফুল ফুজুল নামক মানবতাবাদী এক সংগঠন। নিখিল বিশ্বের তরুণ মোহাম্মদ বিশ্বতরুণের আদর্শ হয়ে থাকলেন শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, গরিব-দুঃখীর সাহায্য, অত্যাচারীকে বাধা প্রদান আর মজলুমের সহায়তাকারীর দৃষ্টান্ত হিসেবে। অতঃপর কাল পরিক্রমায় নবুয়তের সুমহান জিম্মাদারি অর্পিত হলো প্রিয় নবির ওপর। এবার খোদায়ী নির্দেশনায় তিনি সমাজ সংস্কারের নবচেতনায় উজ্জীবিত হলেন। মানুষকে আহ্বান জানালেন মিথ্যা, অনাচার, অন্যায়, অবিচার ও সব ধরনের অশ্লীলতা পরিহার করে পরিশোধিত এবং পরিচ্ছন্ন জীবনের দিকে। সমাজ সংস্কারের এই ইনকিলাব বাধাগ্রস্ত হলো চরমভাবে। বিশ্ববিধাতা তাকে মদিনায় হিজরতের নির্দেশ দিলেন। মদিনায় গিয়ে নিবেদিতপ্রাণ সাহাবাদের নিয়ে তিনি মানব ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম কল্যাণ রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন, যার জন্য তিনি পৃথিবীর সব যুগের সব রাষ্ট্রনায়কের অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে পৃথিবীতে চীরভাস্বর হয়ে থাকবেন।
অধপতিত সমাজের উন্নয়নে মহানবি (স) যে যুগান্তকারী ও অনবদ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। তিনি মদিনায় অবস্থিত সব ধর্মের মানুষকে নিজ নিজ ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার মত প্রকাশের পূর্ণ সুযোগ প্রদান করে তিনি ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি নারী জাতিকে মর্যাদার শ্রেষ্ঠ আসনে আসীন করেন। যে নারী জাতি মানবসমাজে পণ্যের মতো বিক্রি হতো, নারীর ন্যূনতম কোনো মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত ছিল না, কন্যাসন্তানকে লোকলজ্জার ভয়ে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো, নারীরা ছিল পুরুষের ভোগের সামগ্রী, সেই নারীকে তিনি মায়ের মর্যাদায় অভিষিক্ত করলেন। ঘোষণা করলেন, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত।
যে সমাজব্যবস্থায় জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তা ছিল না, মহানবি (স) সেই সমাজে জীবনের নিরাপত্তা ঘোষণা দিয়ে বললেন, নরহত্যা হারাম। অন্যায়ভাবে কেউ কাউকে হত্যা করলে সে হবে জাহান্নামি। যে সমাজের মানুষ অন্যের সম্পদ হরণ, লুটতরাজ ও কুক্ষিগত করাকে দোষণীয় মনে করত না; চুরি, ডাকাতি ও দস্যুতা পুরো সমাজকে গ্রাস করে ফেলেছিল, প্রিয় নবি সেই সমাজে সম্পদের নিরাপত্তা প্রদানপূর্বক ঘোষণা করেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি কারো এক বিঘত জমিও জরবদস্তি দখল করে নেয়, কেয়ামতের দিন তার গলায় সাত স্তর জমিন ঝুলিয়ে দেওয়া হবে।’
প্রিয় নবি মানুষের মানসম্মান ও ইজ্জতের নিরাপত্তা প্রদান করেন। এভাবে নারী জাতি ফিরে পেল তাদের স্বাধীকার। নির্বিঘ্নে ও নিশ্চিন্ত মনে হিরা থেকে হাজরামাউত পর্যন্ত সুন্দরী রমণীরা ঘুরে বেড়াল, কেউ তাদের দিকে ফিরেও তাকাল না, ভ্রুকুঞ্চিতও করল না। জাহিলিয়াতের সমাজে ছিল না কোনো ন্যায়নীতি ও ন্যায়বিচার। জোর যার মুল্লুক তার—এই বিধান ছিল প্রচলিত। প্রিয় নবি (স)-এর সংস্কারপূর্ণ জীবনবিধান এমনভাবে কার্যকর হলো যে ন্যায়নীতি আর ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত হলো সর্বত্র। সমাজের দিনহীন মানুষ ধনীর কাছ থেকে তার প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে সক্ষম হলেন। অন্যের সম্পদে গরিবের হক বা অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো। এছাড়া পবিত্র কোরআন ঘোষণা করল, তোমরা যখন বিচার কর, ন্যায় বিচার কোরো। এভাবে প্রিয়নবি বিচারের ক্ষেত্রে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে কোনো বৈষম্য রাখলেন না। সমাজে এক নতুন সভ্যতার জয়জয়কার দেখা দিল। (সংক্ষেপিত)
লেখক :চেয়ারম্যান, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়