বরিশালে মা-ইলিশ নিধন ও বিক্রির মহোত্সব

২২ দিনের মা-ইলিশ রক্ষার অভিযানে নেমে বরিশালে প্রতিদিনই জেলেদের আক্রমণের শিকার হয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে আভিযানিক দলগুলোকে। মূলত বেপরোয়া মৌসুমি জেলেদের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশেই ঘটছে এ ধরনের হামলার ঘটনা। অভিযানে আটক জেলেকে ছাড়িয়ে নিতে চেয়ারম্যান, মেম্বার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও সাংবাদিক নামধারীরা নানাভাবে তদবির শুরু করেন। তদবির না শুনলে পরে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মেহেন্দীগঞ্জের সদর উপজেলায় এক জনপ্রতিনিধির নেতৃত্বে আভিযানিক দলের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এ অবস্থায় হামলার ভীতি নিয়েই অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। অনেক সময় কয়েক শ লোকের সংঘবদ্ধ হামলার কারণে অভিযান থেকে ফিরে আসতে হচ্ছে। এতে নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে মা-ইলিশ নিধন ও বিক্রির মহোত্সব চলছে বলে জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় নদীতীরবর্তী বাড়িগুলো থেকেই ইলিশ কিনে নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কেজি সাইজের মা-ইলিশ ৪০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা তা ক্রয় করছেন। তাছাড়া প্রচুর ইলিশ সংরক্ষণ করে রাখা হচ্ছে পরে বিক্রির জন্য।

মত্স্য কর্মকর্তারা জানান, প্রজনন মৌসুমে এখানকার নদ-নদীর বেশ কিছু পয়েন্টে মা-ইলিশ এলে তা ধরতে জেলেরা আগ্রাসী হয়ে ওঠেন। তবে প্রতি বছর নিষেধাজ্ঞার শেষের দিকে জেলেরা বেপরোয়া হয়ে উঠলেও এবার শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছেন। হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ ও সদর উপজেলায় আভিযানিক দলের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হলেও বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কেউ আটক হয়নি।

বিভাগীয় মত্স্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আনিচুর রহমান জানান, মা-ইলিশ রক্ষায় এবার সবাই তত্পর রয়েছে। তবে মৌসুমি জেলেরা বেপরোয়া হওয়ার কারণে হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের দুই মেম্বারের নেতৃত্বে তাদের টিমের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে আটক জেলেদের ছাড়িয়ে নিতে বিভিন্ন মহল থেকে তদবিরও আসে। তদবির না শুনলে সংঘবদ্ধ চক্র হামলা চালিয়ে থাকে। মেহেন্দীগঞ্জের মত্স্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন জানান, সদর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার আক্তার হোসেনের নেতৃত্বে ১৮ অক্টোবর আভিযানিক দলের ওপর হামলা চালানো হয় এবং একই দিন জাঙ্গালিয়া পয়েন্টেও হামলার শিকার হতে হয়।

মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিজুস চন্দ্র দে            জানান, জেলেদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন মহলের তদবির আসে, তবে কারোর তদবির রাখা হচ্ছে না।

হিজলা নৌ পুলিশের ওসি শেখ বেল্লাল হোসেন জানান, তাদের আভিযানিক দলে সাত-আট জন সদস্য থাকলেও মাছ ধরার একেকটি ট্রলারে জেলে থাকেন ১৫ থেকে ১৭ জন। এছাড়া নদীতীরবর্তী স্থানে জেলেদের রক্ষায় তাদের লোকজন পাহারায় থাকে। ফলে বারবার তাদের ওপর হামলা করে অভিযুক্ত জেলে ছিনতাইসহ পুলিশ সদস্যদের আহত করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে কোস্টগার্ড হিজলা লঞ্চঘাট এলাকার নদীতে মা-ইলিশ ধরার সময় বাক্কু খাঁ নামে এক জেলেকে দুটি রামদাসহ আটক করেছে।

সর্বশেষ মঙ্গলবার গভীর রাতে বরিশাল সদর উপজেলাধীন কালাবদর নদীতে মা-ইলিশ রক্ষায় গঠিত টাস্কফোর্স কমিটির আভিযানিক দলের ওপর হামলা চালান সংঘবদ্ধ জেলেরা। বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মুনিবুর রহমানের নেতৃত্বে এ অভিযান চলাকালে সংঘবদ্ধ একটি দল অতর্কিত হামলা চালালে বরিশাল মেট্রোপলিটনের বন্দর থানার এক এসআই, কনস্টেবল ও স্পিডবোটের চালক আহত হন।

এদিকে বুধবার দিনভর বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার অমিতাভ সরকার ও রেঞ্জের ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম বরিশালের বিভিন্ন নদীতে চলমান অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। অভিযানে মা-ইলিশ ধরা ও বিক্রির অভিযোগে কয়েক জনকে আটক করা হয়।