দাবি মেনে নেওয়ায় নৌযান ধর্মঘট প্রত্যাহার

দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাসে নৌযানশ্রমিকদের চলমান অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে সরকার, নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক শেষে শ্রমিকেরা ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। মালিকপক্ষ শ্রমিকদের খোরাকি ভাতা দিতে রাজি হওয়ায় ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাহ আলম। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, বেতন-ভাতার সুযোগ-সুবিধাসহ বিভিন্ন দাবিতে নৌযানশ্রমিকেরা গত সোমবার মধ্যরাত থেকে ধর্মঘট চালিয়ে আসছিলেন। বৈঠকে দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমিকেরা ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন।

গতকাল শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের নেতৃত্বে সন্ধ্যা পৌনে ৬টার সময় বৈঠকে বসেন দুই পক্ষ। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আলোচনায় নৌপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আইন প্রয়োগের নামে নৌযানশ্রমিকদের হয়রানি বন্ধ, নৌশ্রমিকদের নিয়োগপত্র ও সার্ভিস বুক প্রদান, জীবনবিমা প্রবর্তন, প্রভিডেন্ট ফান্ড গঠন, কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণকারী শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন দাবির বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। তিন ক্যাটাগরিতে শ্রমিকদের খাদ্যভাতা দেওয়া হবে। মালিক ও শ্রমিকপক্ষের আলোচনার পর বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন ও নৌশ্রমিক অধিকার সংরক্ষণ ঐক্য পরিষদ এই ধর্মঘট স্থগিতের ঘোষণা দেয়। যদিও নৌযান ধর্মঘটের কারণে কয়েক কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন মালিকেরা।

এর আগে গতকাল সকালে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, ‘নৌশ্রমিকদের মূল দাবি খোরাকি ভাতা; অবশ্যই তাদের ন্যায্য দাবি। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। ভাতাটা ন্যায্য। এর আগেও শ্রমিকেরা ধর্মঘটে গিয়েছিলেন। আলোচনা করে সমাধান করেছি। শ্রমিকেরা অসহায়। তারা শ্রম দিয়ে উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। মালিক-শ্রমিকদের সম্পর্ক থাকবে বন্ধুত্বপূর্ণ ও হূদ্যতাপূর্ণ। মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে এর সমাধান করব।’

তিন দিনে ক্ষতি ১৫০ কোটি টাকা

চট্টগ্রাম অফিস জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারী, ব্যবসায়ী মহল, দেশব্যাপী নৌযানশ্রমিকদের কর্মবিরতি কর্মসূচির কারণে দেশের শিল্প ও ব্যবসায়-বাণিজ্যে গত তিন দিনে যে ক্ষতি হয়েছে, তাতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলেন, চলতি বছর বিশ্বব্যাপী মহামারি কোভিড-১৯-এর প্রথম পর্যায়ের ধাক্কা সামলে বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন পুনরায় গতিশীলতা অর্জন করছিল, সেই মুহূর্তে এই কর্মবিরতি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি আশঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। গত তিন দিনে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ অর্ধশতেরও বেশি খোলা পণ্য নিয়ে আসা মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস না হওয়ায় এবং সেগুলো সময়মতো দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে না যাওয়ায় দৈনিক ৩০ কোটি টাকার ক্ষতি হিসেবে সর্বমোট ৯০ কোটি টাকার ক্ষতি সাধিত হয়েছে। অন্যদিকে অলস বসে থাকা প্রায় ২ হাজার লাইটারেজ জাহাজের দৈনিক খরচ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা হিসেবে গত তিন দিনে পরিচালনা ব্যয় বাবদ ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে চট্টগ্রাম থেকে খাদ্যসামগ্রী ও শিল্পের কাঁচামাল সময়মতো পৌঁছার ক্ষেত্রে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় উত্পাদন খাতেও ক্ষতির পরিমাণ অপরিমেয়। চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মো. মাহাবুবুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, অচলাবস্থার কারণে ক্ষতির পরিমাণ দৈনিক ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ফ্রেইড ফরোয়ার্ডাস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) চট্টগ্রাম বন্দরবিষয়ক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন ইত্তেফাককে বলেন, প্রতি বছরই এক থেকে একাধিকবার নৌযানশ্রমিকেরা কর্মবিরতিতে যান। এতে বাংলাদেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি বন্দরের ভাবমূর্তি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

বরিশাল অফিস জানিয়েছে, গতকাল বরিশাল নদীবন্দরের আশপাশে কীর্তনখোলা নদীতে নোঙর করে ছিল অর্ধশতাধিক পণ্য ও জ্বালানিবাহী জাহাজ।

 মোংলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা জানিয়েছেন, মোংলা বন্দরের আউটারবার ও পশুর চ্যানেলে অবস্থানরত সব বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্য ওঠানামা ও পরিবহনকাজ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় আর্থিক ক্ষতিতে পড়েছেন বিদেশি জাহাজমালিকসহ বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

পলাশ (নরসিংদী) সংবাদদাতা জানিয়েছেন, ঘোড়াশালে শীতলক্ষ্যা নদীতে আটকা পড়ে পণ্যবাহী শতাধিক লাইটার জাহাজ। এতে নদীপথে পণ্য পরিবহন ও মালামাল ওঠানামায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।