ইথিওপিয়ার অর্থনীতিতে ফের বিপর্যয়

n শফিকুর রহমান রয়েল

 

ওটাকে ঠিক চিত্কার বলা চলে না; মারিমা ওয়ারিশার কণ্ঠে ছিল আর্তনাদের সুর। ১০ বছর আগে বিধবা হওয়া এই নারী ক্ষোভের চোটে বেপরোয়া হয়ে পতঙ্গগুলোর দিকে এমনভাবে একের পর এক পাথর ছুঁড়ে মারছিলেন, যেন প্রত্যেকটিই একেকটা বুলেট আর এতে বেঘোরে প্রাণ হারাবে কিছু, বাকিরা জানের ভয়ে উড়ে পালাবে সদলবলে। বাস্তবে, কাজের কাজ কিন্তু কিছুই হচ্ছে না; পঙ্গপাল দক্ষিণ-পূর্ব ইথিওপিয়ায় অবস্থিত তার জোয়ার খেতের বারোটা বাজিয়ে ফেলেছে ইতিমধ্যে। কাজেই মারিমা ওয়ারিশার এখনকার যত চেষ্টা বৃথামাত্র। ওরা বিরামহীনভাবে এত দ্রুতই কুকর্মটি সম্পন্ন করে ফেলেছে যে, স্বামী হারা এই মহিলার একমাত্র আয়ের উত্সটি দেখতে দেখতেই নিঃশেষ। ফসলের পরবর্তী মৌসুম শুরু হওয়ার মধ্যের সময়টা পরিবারের সদস্যদের মুখে কীভাবে অন্ন যোগাবেন সেই চিন্তার সাহসটুকু পর্যন্ত অবশিষ্ট নেই।

জাতিসংঘের খাদ্য সংস্থা এফএওর মতে, ইথিওয়াির পঙ্গপালের আগ্রাসন ২৫ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে তীব্র। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ২ লাখ হেক্টর জমির শস্য বিলীন করে পুরো দেশের খাদ্য সরবরাহকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে এই পঙ্গপাল। এক বর্গকিলোমিটার জুড়ে থাকা পঙ্গপাল প্রতিদিন এত পরিমাণ শস্যই উদরে পুরতে পারে, যা দিয়ে ৩৫ হাজার লোকের দৈনিক খাবার এবং কয়েক লাখ লোকের জীবিকা পূরণ সম্ভব।

২০১৯ সালের শেষ দিকে পূর্ব আফ্রিকা ও লোহিত সাগর অঞ্চলে পঙ্গপালের আবির্ভাব ঘটে। সমস্যাকে আরো জটিল করে তোলে করোনা প্রাদুর্ভাব। কোভিড-১৯ এর ভূমিকা এখানে আগুনে ঘি ঢালার মতোই। পঙ্গপালের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্যে এফএওর কীটনাশক ও অন্য সামগ্রীর সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে যাওয়াতেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।

করোনা নয়, পঙ্গপাল প্রতিরোধই এখন ঐ অঞ্চল দুটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেজন্য এফএওর সঙ্গে একযোগে কাজ করছে ডেজার্ট লোকাস্ট কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন, আর একথা জানিয়েছেন সংস্থাটির পূর্বাঞ্চলীয় আফ্রিকা অঞ্চলের পরিচালক স্টিফেন নিজোকা। এবারকার এই খাদ্যবিনাসী পতঙ্গের উত্পত্তি ইয়েমেনে। যুদ্ধ ও অরাজকতার কারণে সেখানে বিমান থেকে কীটনাশক ছড়ানো সম্ভব হয়নি। তার সঙ্গে যুক্ত হয় ভারী বৃষ্টি, যা কি না পতঙ্গটির বংশবিস্তারে একান্ত সহায়ক। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তারা ছড়িয়ে পড়ে ইথিওপিয়ায়।

দুর্ভিক্ষের ইমেজ থেকে বেরিয়ে খুব দ্রুতই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছিল ইথিওপিয়ায়। আরো স্পষ্টভাবে বললে, বর্তমানে সেরা জিডিপি প্রবৃদ্ধির তালিকায় এখন পর্যন্ত প্রথম দিকেই আছে ইথিওপিয়ার নাম। এ অবস্থায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পঙ্গপাল। বিশ্ব ব্যাংক জানিয়েছে, এ বছর পঙ্গপালের কারণে পূর্ব আফ্রিকা ও ইয়েমেনের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৮.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। এফএওর ইথিওপিয়া প্রতিনিধি ফাতুমা সাইদের আশঙ্কা দেখে মনে হচ্ছে, পঙ্গপালের ধ্বংসযজ্ঞের পুনরাবৃত্তি ঘটবে আগামী বছরেও। ইথিওপিয়ায় পুনঃআগ্রাসনের পাশাপাশি আগামী বছর পঙ্গপাল ছড়িয়ে পড়তে পারে কেনিয়াতেও। হয়তো এ প্রাকৃতিক আগ্রাসনকে কিছুতেই ঠেকানো সম্ভব হবে না।

 রয়টার্সের তথ্যানুসারে