২৩ লাখ ইলিশ!

সুধীর বরণ মাঝি

 

ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। আমাদের জাতীয় সম্পদ। একে রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ইলিশ ডিম পাড়ে নদীতে অর্থাত্ মিঠা পানিতে এবং মিঠা পানিতেই বাচ্চা ফোটে। নদী হলো ইলিশের প্রাকৃতিক হ্যাচারি। আমাদের নদীগুলো মা-ইলিশের বাপের বাড়ি। সন্তান প্রসবের জন্য বাপের বাড়ি যেমন একজন মায়ের জন্য নিরাপদ, ঠিক তেমনি ডিম ছাড়া এবং বাচ্চা ফোটানোর জন্য নিরাপদ আমাদের নদীগুলো। তাই ইলিশের উত্পাদন বাড়াতে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে অর্থাত্ ১৪ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত মা-ইলিশ এবং ডিমঅলা ইলিশ ধরা যাবে না। বিগত বছরগুলোতে দেখেছি—মা-ইলিশ রক্ষার অভিযান চলাকালে জেলেদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলেও অতি লোভী জেলেরা বিশেষ করে ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, শরিয়তপুর, মাদারিপুর, লক্ষ্মীপুর, মুন্সিগঞ্জ, মাওয়া, গজারিয়া, চাঁদপুরের মতলব, রাজরাজেশ্বর, হাইমচর, কাটাখালী, চরভৈরবী ও ঈশানবালাসহ আরো কিছু এলাকায় দিনের আলোতে এবং রাতের আঁধারে অবাধে নিধন করা হয় মা-ইলিশ এবং ডিমঅলা ইলিশ। এভাবে ইলিশ নিধন হতে থাকলে ইলিশের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়বে।

ইলিশের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে দেশের এক শতাংশ মানুষ এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইলিশকে বলা হয় ‘সিলভার গোল্ড’। ইলিশ রক্ষা করতে না পারলে আমাদের পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়বে। অর্থনীতিতেও পড়বে বিরূপ প্রভাব। মা-ইলিশ রক্ষা করতে পারলে জনসাধারণ এবং রাষ্ট্রের যা লাভ—তার অনেক অনেক গুণ বেশি লাভ দেশের জেলেদের। মা-ইলিশ রক্ষার পাশাপাশি ইলিশের উত্পাদন বাড়াতে নদীতে জেগে ওঠা ডুবো চর ও ভাসমান চরগুলো খনন করা জরুরি। এতে শুধু ইলিশ উত্পাদনই বাড়বে না, রোধ হবে নদী ভাঙনও। ইলিশ দ্রুতগতিসম্পন্ন মাছ। এরা সমুদ্র এবং নদীতে দলবেঁধে চলে। এরা যে গতিতে সামনে যায়—চলার পথে বাধা পেলে তার চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে পিছনের দিকে ছুটে চলে। ডুবো চর এবং ভাসমান চরের কারণে নদীতে ইলিশের উত্পাদন কমছে।

লোকদেখানো অভিযান নয়—চাই মা-ইলিশ রক্ষার সফল অভিযান। এজন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করতে হবে বিনা বাধায় বিনা সংকোচে। প্রশাসনের যথাযথ দায়িত্ব পালন এবং জনসচেতনতাই পারে মা-ইলিশ রক্ষার অভিযানকে সফল করে তুলতে। নিষিদ্ধ সময়ে যারা জেলেদের মা-ইলিশ ধরার কাজে উত্সাহিত করে, তাদেরও আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ যেমন থাকতে হবে, তেমনি থাকতে হবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম। যেভাবেই বলি— ডিম ছাড়ার মৌসুমে মা-ইলিশ ও ডিমঅলা ইলিশ রক্ষার বিকল্প নেই। আমরা বিশ্বাস করি, আইন অমান্যকারীরা শক্তিশালী নয় এবং তারা সংখ্যায়ও হাতেগোনা।

জনগণের কাছে তুলে ধরতে হবে মা-ইলিশ রক্ষার গুরুত্ব। ডিমঅলা মা-ইলিশ নিধন করা মানে হচ্ছে আগামী দিনে ২৩ লাখ ইলিশ হত্যা করা। এক ইলিশে ২৩ লাখ ডিম! মা-ইলিশের যত্ন মানেই ইলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি। তাই ডিমঅলা একটি মা-ইলিশকে রক্ষা করতে পারলে আগামী দিনের জন্য ২৩ লাখ ইলিশ রক্ষা করা যাবে। আর ইলিশের সংখ্যা বাড়বে চক্রবৃদ্ধি হারে। সামাজিক আন্দোলন, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও অবস্থান, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং সচেতনতার মাধ্যমে মা-ইলিশ ও ডিমঅলা ইলিশ রক্ষার অভিযান সফল হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

চাঁদপুর