অলোক আচার্য
জীবনের কোন পর্যায়ে ব্যক্তি সুখী আর কোন পর্যায়ে অসুখী তা নির্ধারণ করার নিয়ামক কেবল ব্যক্তি নিজেই। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই কে সুখী আর কে অসুখী। সুখের খোঁজে ছুটতে ছুটতে মানুষ সুখের অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে। যার নেই কোনো চিকিত্সা। সুখের সন্ধান পেতে মানুষের যত ব্যস্ততা! সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি করছে কেবল সুখে থাকার আশায়। কেবল পাওয়ার মধ্যেও সুখের খোঁজ করে না মানুষ। কাউকে ছেড়েও সুখ পায়! তবে সত্যি সে দেখা পায় কি না তা জানা যায় না। স্বামী স্ত্রীকে ছেড়ে যায় আবার স্ত্রী স্বামীকে ছেড়ে যায়—তাও কেবলই সুখের খোঁজে!
যে কর্মচারীটি অবৈধ উপায় কোটি কোটি টাকার পাহাড় গড়ে বাড়ি গাড়ি করেছে, সেও কিন্তু কেবল সুখের আশায়। সুখ পেয়েও সে থেমে যায় কি? থামেনি বরং সুখের নেশা তার দ্বিগুণ হয়েছে। এতকিছু দেখে সুখ নিয়ে সেই ছোটবেলায় পড়া বিখ্যাত কবিতাটির কথা মনে হয়—‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি/এ জীবন মন সকলি দাও/তার মতো সুখ কোথাও কি আছে?/আপনার কথা ভুলে যাও।’ সত্যিকারের সুখ নিজের স্বার্থের ভেতর নয় বরং অপরের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যে নিহিত। এই সহজ সুখ লাভের সূত্রটি আমরা প্রায় সবাই জানলেও কেউ বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করি না। নিজেকে নিয়ে ব্যস্ততাতেই সুখ মনে করি। প্রকৃতপক্ষে সুখ হলো অতি অল্প সময়ের আনন্দপূর্ণ এক অনুভূতি। ব্যক্তিবিশেষে এই অনুভূতি ভিন্ন হয়ে থাকে। অনেক সময় এটি সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থার ওপরও নির্ভর করে। কেউ কোটি টাকা পেয়েও সুখী হতে পারে না আবার কেউ তিনবেলা পোলাও-কোরমা খেয়েও অসুখী। ফলে এ ধরনের ব্যক্তি কিসে সুখী হবেন তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা কেবল তাঁর। বিপরীতে অনেকে জীবনে নানা সংকটের মুখোমুখি হওয়ার পরেও নিজেকে সুখী মনে করে। এটাই সুখের পরস্পর বিপরীত চিত্র। যে মানুষটি সারা দিন ভাত পায় না, সন্ধ্যার সময় সে যে পেটপুরে ভাত পেলেই সুখী হবে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। এই সুখ কেউ অনেক অনেক টাকা দিয়েও কিনতে পারবে না। কারণ অনুভূতির ভিন্নতায় সুখের অনুভূতিতেও তারতম্য ঘটে। ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষুধাপূর্ণ হওয়ার তৃপ্তি আর ক্ষুধাপূর্ণ মানুষের ক্ষুধা নিবৃত্তির অনুভূতি এক নয়।
মনের গহীনে সুখের যে বীজ সুপ্ত অবস্থায় থাকে অনেকে তার খোঁজ সারা জীবনেও পায় না। অধিকাংশই ভাবে সুখের জন্য চাই প্রচুর অর্থ। নিজের সুখ, সন্তানের সুখ, প্রিয়তমা স্ত্রীর সুখ, সামাজিক সম্মান, বাড়ি-গাড়ি, ব্যাংক ব্যালান্স এবং এসব জোগাতে গিয়ে দুহাত পেতে ঘুষ নেওয়া, মাদক-জুয়ার আসরে দৌড়াদৌড়ি করে কালো টাকার পাহাড় তৈরি। তারপর একদিন এই টাকার পাহাড়ের নিচেই চাপা পড়ে মুক্তির আর্তনাদ করা। এই তো নিয়তি! সুখের খোঁজ পেতে আদর্শ বিচ্যুত হয়ে অসুখের মাঝে পতিত হওয়ার প্রবণতা বিরাজমান। সে অসুখের না আছে কোনো প্রতিষেধক না আছে চিকিত্সা। ত্যাগেই যে প্রকৃত সুখ তা তো আজ আমাদের চেতনায় বিলীন হতে বসেছে। সুখ আর দুঃখের মাঝে যে পার্থক্য তা বোঝে ক’জন। সুখ খুঁজতে গিয়েই মানুষ আজ হিংস্র হয়, মানুষকে মরতে হয়, তাও কি কেবলই সুখ পাওয়ার জন্য!
হয়তো সারা দিন রাস্তার পাশে পাথর ভাঙা সেই পেশিবহুল শ্রমিকটাই সুখী। তার কাটানো রাতটাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষের কাটানো রাত।
পাবনা