জয়নুল আবেদীন স্বপন
বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল গাজীপুরে সংখ্যালঘু হিসেবে চিহ্নিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অথবা আদিবাসীর সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কম। ওরাও একাত্তরের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। পুরোনো জাতি হিসেবে পরিচিত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি, রীতিনীতি, ধর্ম ও সমাজব্যবস্থা। গাজীপুরে আগে গারো, কোচ, সাঁওতাল, মান্দী ও বর্মনরা পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বলেই পরিচিত ছিল। এখানে অনেক গারো নিজেদের ‘মান্দি’ বলে পরিচয় দেন। গাজীপুরে নৌকায় বসবাসকারী এক শ্রেণির বেদে মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত দেখা যায়। জাতিগত বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে ওরা আদিবাসী। তুরাগ নদীর উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন ঘাটে ওদের জীবনযাপন। আগের তুলনায় বেদে সম্প্রদায়ের মানুষও কমে আসছে। বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে ওদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। এক সময় ওরাও অবস্থাশালী ছিল। সমাজে প্রভাবও ছিল। ওরা সহজ সরল ও দুর্বল অথবা সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে প্রভাবশালীরা ওদের ঠকিয়ে জমি, বাড়ি দখল করে নিয়েছে। ওরা যাতে মুখ খুলতে না পারে তার জন্য সব সময় ভয় দেখিয়ে থাকে। গাজীপুর শিল্পাঞ্চল হওয়ায় চাপে পড়ে অনেক আদিবাসী সবকিছু বিক্রি করে অন্যত্র চলে যাচ্ছে।
বর্তমানে গাজীপুরে বসবাসরত আদিবাসীদের অধিকাংশই অধিকারবঞ্চিত। বিভিন্ন বৈষম্যের শিকার হয়ে ওরা এখন পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। অর্থনৈতিক সংকটে অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছে। ভাওয়ালের গজারি বন থেকে বনআলু তুলে ক্ষুধা মেটাচ্ছে অনেকে। রাথুরা শালবনের ভেতর ভেরামতলী, শিরিশগুরি গ্রামের অদিবাসী ছেলেমেয়েদের অনেকেই গেরস্থবাড়িতে শ্রমিকের কাজ করছে। কাজে ছেলেদের চেয়ে মেয়ে শ্রমিকদের চাহিদা বেশি। আদিবাসী মেয়েরা কাজে ফাঁকি দেয় না । তাছাড়া ওদের পারিশ্রমিকও কম। অনেক আগে এখানকার কোচ জাতি দলবেঁধে গজারি বন থেকে শূকর ও খরগোশ শিকার করত। প্রাণীগুলো বর্তমানে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বনের ফলমূল, লতাপাতা, খড়ি কুড়িয়ে জীবন চালাত। আগে বনের ওপর নির্ভর করলেও বন ছোট হওয়ার কারণে এখন অন্যভাবে চলে ওরা। বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর কাছে দাম নেই ওদের। শুধু ভোটের সময় ওদের গুরুত্ব বাড়ে। তখন বিভিন্ন প্রার্থী আশা-ভরসা দেয়। নির্বাচন শেষ হলে ওদের আর মনে রাখে না। করোনাকালে পণ্যের উচ্চমূল্যে কেনাকাটা করতে কষ্ট হচ্ছে ওদের।
সরকার আদিবাসীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাব্যবস্থায় ওরা পিছিয়ে। গাজীপুরে শিল্প কারখানা গড়ে ওঠার কারণে দরিদ্র আদিবাসীরা বেশি টাকা পেয়ে জমি বিক্রি করে দিচ্ছে। কেউ কেউ আবার কষ্ট করে ভিটে-মাটি ধরে রেখেছে। আমরা চাই ওদের ঐতিহ্য ও কৃষ্টি বেঁচে থাক। আদিবাসীদের অনেকে কুটিরশিল্পে এগিয়ে আছে। বাঁশ ও বেতের তৈরি সাংসারিক জিনিসপত্র নিপুণভাবে তৈরি করে থাকে। বৃদ্ধরা খেজুরের পাটি ও ঝাড়ু তৈরি করে বাজারে বিক্রি করছে। বেঁচে থাকতে অনেকে গরু পালন অথবা ছোট ছোট ব্যবসা করছে। তারপরও নিপীড়ন-নির্যাতনের মতো ঘটনা বলে দেয় আদিবাসীরা ভালো নেই। পিছিয়েপড়া বঞ্চিত আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক। হতাশা থেকে আদিবাসীরা মুক্তি পাক।
গাজীপুর