পাঁচ বছরেও সংস্কারে ব্যর্থতা

৭৯ পোশাক কারখানা বন্ধ করছে সরকার

কারখানা সংস্কারে বার বার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও তা আমলে না নেওয়ায় ৭৯টি গার্মেন্টস কারখানার কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে যাচ্ছে সরকার। শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) কারখানাগুলো বন্ধ করতে মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোকে চিঠি পাঠিয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএকেও বিষয়টি অবহিত করে গত সপ্তাহে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এসব কারখানা যাতে কার্যক্রম না চালাতে পারে, সেজন্য ডিআইএফই তাদের হাতে থাকা ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। অর্থাত্ কারখানাগুলোর লাইসেন্স বাতিল করবে।

ডিআইএফইর মহাপরিদর্শক (আইজি) শিবনাথ রায় ইত্তেফাককে বলেন, বার বার তাগাদা দেওয়ার পরও কারখানাগুলো সংস্কারের কোনো কাজই করেনি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তাদের লাইসেন্স দেবো না। সেক্ষেত্রে তারা আর বৈধভাবে ব্যবসা করতে পারবে না। এসব কারখানায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো পোশাক রপ্তানি খাতের ওপর।     আমরা তো সেই ঝুঁকি নিতে পারি না।

২০১৩ সালে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় পর ঐ বছরই গার্মেন্টস কারখানা সংস্কারের লক্ষ্যে ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতাদের সমন্বয়ে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স নামে আলাদা দুটি জোট গঠিত হয়। এসব বায়ারের কাছে রপ্তানিকারক প্রায় ২ হাজার গার্মেন্টস কারখানা ভবনের কাঠামো, অগ্নি ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করে ত্রুটি সংস্কার তদারকির দায়িত্ব নেয় তারা।

ঐ জোটভুক্ত কারখানাগুলোর সংস্কারে অগ্রগতি ৯০ শতাংশের ওপরে। এ দুটি জোটের তদারকির বাইরে থাকা দেড় হাজার কারখানা সংস্কারের লক্ষ্যে ২০১৫ সালের শুরুতে উদ্যোগ নেয় সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয়। এটি ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভ নামে পরিচিত। পাঁচ বছর সময় পেরিয়ে গেলেও ৯০টি কারখানা সংস্কারে একেবারেই অগ্রগতি নেই।

সম্প্রতি ডিআইএফইর মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা পরীক্ষা করে জেনেছেন, এর মধ্যে ১১টি কারখানা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে। বাদবাকি ৭৯টি কারখানা চূড়ান্তভাবে বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ডিআইএফইর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, প্রায় দুই বছর আগে সংস্কারে ব্যর্থতার কারনে দুই শতাধিক কারখানার রপ্তানি বন্ধ করতে ইউডিসেবা (কাঁচামাল আমদানির অনুমোদন) বন্ধ করে দেওয়ার জন্য বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তার সামান্যই বাস্তবায়ন হয়েছে। পরবর্তীতে গত বছরের অক্টোবরে কারখানাগুলো নিয়ে বৈঠক করে তাদের সংস্কারের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। তাও মানেনি কারখানাগুলো।

জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা ডিআইএফইর পর্যবেক্ষণের বিষয়ে বরাবরই শ্রদ্ধাশীল।’

অবশ্য কারখানা মালিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, শ্রম মন্ত্রণালয়ের সংস্কারের তালিকায় থাকা কারখানাগুলো অপেক্ষাকৃত স্বল্প মূলধনের, যার বেশির ভাগই সাব কন্ট্রাকটে (ঠিকা ভিত্তিতে) কাজ করে। এসব কারখানা বড় অংশই ভাড়া ভবনে উত্পাদন কাজ পরিচালনা করায় সংস্কারে সমস্যা দেখা দিয়েছে। অনেকের এত বড় মূলধন না থাকায় চাইলেই কারখানা স্থানান্তরও করতে পারছে। তাদের মূল সমস্যা অর্থায়নে।

অন্যদিকে কারখানা সংস্কারে পিছিয়ে থাকার ক্ষেত্রে ডিআইএফইর দিকেও অভিযোগের আঙুল তুলেছেন কোনো কোনো উদ্যোক্তা। ডিআইএফইর সংস্কারের তালিকায় থাকা রাজধানীর মিরপুর এলাকার একটি কারখানার মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, ডিআইএফই তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করে না। আমি নিজে ডিইএ (সংস্কার পরিকল্পনা) জমা দেওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে তারা তা অনুমোদন করেনি। এর পর কাজের চেয়ে নতুন নতুন ইস্যু নিয়ে হাজির হয়। পরে তাদের ‘ম্যানেজ’ করতে হয়। অথচ যে করেই হোক অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স তো কাজ করিয়ে নিয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় কারখানাগুলো এখনই বন্ধ করে দেওয়া ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে ডিআইএফই সূত্র জানিয়েছে, কারখানা বন্ধ করার ক্ষেত্রেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আইনগতভাবে জনবল নিয়ে কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার এখতিয়ার ডিআইএফইর নেই। তারা কারখানা লাইসেন্স বন্ধ করে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে কারখানাগুলো অন্য জায়গায় গিয়ে ভিন্ন নামে উত্পাদন কাজ চালাতে পারে বলে জানা গেছে। এই তথ্যের সত্যতা স্বীকার করেছেন ডিআইএফইর আইজি নিজেও। তিনি বলেন, এ ধরনের কারখানা মূলত সাব কন্ট্রাক্টিং করে। যেহেতু তাদের সরাসরি রপ্তানি করতে হয় না, ফলে চালাকি করে স্থান পরিবর্তন করে ভিন্ন নামে কারখানা চালায়। চট্টগ্রামে এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। কিন্তু আমাদের পক্ষে সঙ্গে সঙ্গে তা ধরাও মুশকিল।