মাইক বন্ধ করার হুমকি ভালোই কাজে দিয়েছে। যে কারণে শেষ বিতর্কে অনেক বেশি সংযত আচরণ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তবে করোনা মহামারি, বর্ণবাদ, জলবায়ু, অভিবাসন, অর্থনীতি ইস্যুতে তুমুল বাগ্যুদ্ধ হয়েছে দুই প্রার্থীর। ৯০ মিনিটের এই বিতর্কে একে-অপরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন। তবে দর্শক জরিপে বিতর্কে ট্রাম্পের চেয়ে ভালো করেছেন বাইডেন। আর সফল সঞ্চালনার জন্য প্রশংসা কুড়িয়েছেন এনবিসি নিউজের হোয়াইট হাউজ সংবাদদাতা ক্রিস্টেন ওয়েলকার।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। বিভিন্ন জনমত জরিপ বলছে, রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্পের চেয়ে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী বাইডেন বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। এমনকি নির্বাচনের জয়-পরাজয় নির্ধারণ হয় এমন দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যে এগিয়ে আছেন বাইডেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কী ঘটবে তা জোর দিয়ে বলতে পারছেন না নির্বাচন বিশ্লেষকরা। এমন পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার রাতে (যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময়) টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ন্যাশভিলের বেলমন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কে শেষবারের মতো মুখোমুখি হন ট্রাম্প ও বাইডেন। প্রথম বিতর্কের চেয়ে অনেক বেশি পরিশীলিত শেষ বিতর্ক। প্রথম বিতর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১৪৭ বার উপস্থাপককে বাধা দিয়েছেন। সর্বশেষ বিতর্কে সেই কাজটি করেছেন মাত্র আট বার।
করোনা, বর্ণবাদ, জলবায়ু ইস্যুতে বাদানুবাদ
বিতর্কের শুরুতেই করোনা মহামারি ইস্যুতে জো বাইডেন বলেন, প্রেসিডেন্ট মাস্ক ব্যবহারে নিরুত্সাহিত করেছেন। অথচ এই মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করলে হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচানো যেত। ২ লাখের বেশি মার্কিনির মৃত্যুর জন্য দায়ী কেউ প্রেসিডেন্ট থাকতে পারেন না। মহামারি মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। ট্রাম্প মনে করেন করোনা এমনিই চলে যাবে। জবাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, করোনা ভাইরাসকে নিয়েই মার্কিনরা বাঁচতে শিখেছে। এই বছরের শেষদিকে ভ্যাকসিন তৈরি হয়ে যাবে। তবে বাইডেন আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, মার্কিনিরা ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন শীতকালের’ দিকে ধাবিত হচ্ছে।
জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে বাইডেন বলেন, কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকে প্রভাবিত বা হস্তক্ষেপের চেষ্টা করলে চড়া মূল্য দিতে হবে। কারণ এটি যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। জবাবে ট্রাম্প বলেন, রাশিয়াসহ অন্যসব দেশের ওপর তিনি যথেষ্ট কঠোর। ইউক্রেন, রাশিয়া থেকে জো বাইডেন সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। জবাবে বাইডেন বলেন, তিনি জীবনে বিদেশি রাষ্ট্রের কাছ থেকে এক পয়সাও নেননি। উলটো চীনে ট্রাম্পের ব্যাংক একাউন্ট নিয়ে পালটা প্রশ্ন তোলেন বাইডেন। ট্রাম্পের কর পরিশোধ না করার সমালোচনা করেন তিনি। জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি লাখ লাখ ডলার কর আগেই পরিশোধ করেছেন। তিনি আইআরএস অডিট করার পর ট্যাক্স রিটার্ন প্রকাশ করবেন।
ইউক্রেনে বাইডেনের ছেলের ব্যবসা নিয়ে অভিযোগ তোলেন ট্রাম্প। জবাবে বাইডেন বলেন, এ বিতর্ক ট্রাম্প বা তার পরিবারের নয়। এ বিতর্ক মার্কিনিদের স্বার্থ নিয়ে। ট্রাম্প বলেন, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তার সম্পর্ক যথেষ্ট ভালো। এ নিয়ে বাইডেন সমালোচনা করে বলেন, উত্তর কোরিয়ার শাসনব্যবস্থার বৈধতা দিয়েছেন ট্রাম্প।
জো বাইডেন ওবামাকেয়ার স্বাস্থ্যনীতিকে শক্তিশালী করে ওষুধের দাম কমানো ও জনগণের স্বাস্থ্যসেবা সুলভ করার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এ সময় ট্রাম্প জানান, তিনি আইন করে ওবামাকেয়ারের বিতর্কিত অংশ বাতিল করতে পেরেছেন। ট্রাম্প বলেন, জো, আমি নির্বাচন করেছি তোমার জন্য, কারণ তুমি ও বারাক ওবামা দায়িত্বে থাকার সময় কোনো কাজ করোনি।
অভিবাসী শিশুদের নিয়ে দুই প্রার্থীর মধ্যে তুমুল বাগ্যুদ্ধ হয়। বাইডেন বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে অভিবাসী শিশুদেরকে তাদের বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। এটি অপরাধ। জবাবে ট্রাম্প বলেন, খারাপ মানুষরা এসব শিশুদের নিয়ে এসেছে। তাদের ভালো যত্ন নেওয়া হচ্ছে। তিনি ওবামা প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেন, তারা অবৈধ অভিবাসন বন্ধে পদক্ষেপ নেয়নি শুধু বন্দিশিবির বানিয়েছে।
বর্ণবাদ নিয়ে বিতর্কে জড়ান দুই প্রার্থী। ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য অনেক কাজ করেছেন, এজন্য তিনি চ্যাম্পিয়ন। ১৯৯৪ সালে প্রণীত ক্রাইম বিলের খসড়া তৈরিতে সহায়তার জন্য তিনি বাইডেনের সমালোচনা করেন। ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্তরা আফ্রিকান-আমেরিকানদের বিপুল সংখ্যায় হত্যা করার নেপথ্যের কারণ হিসেবে এই আইনটিকে দায়ী করে। জবাবে বাইডেন বলেন, আধুনিককালের সবচেয়ে বর্ণবাদী প্রেসিডেন্ট হলেন ট্রাম্প। প্রতিটি বর্ণবাদী আগুনে তিনি ঘি ঢেলেছেন। তিনি একজন ‘ডগ হুইসেল’।
জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে বাদানুবাদ হয় দুই প্রার্থীর মধ্যে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার ব্যাপারে ট্রাম্প বলেন, এই চুক্তির জন্য আমরা কোটি কোটি চাকরি, হাজার হাজার কোম্পানিকে বিসর্জন দিতে পারি না। এটা অন্যায্য। চীন, রাশিয়া এবং ভারত দূষণ অব্যাহত রাখছে সেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য কেন যুক্তরাষ্ট্র বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করবে। জবাবে বাইডেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, উষ্ণতা মানব জাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি। পরিবেশ রক্ষায় আমাদের নৈতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আমি জিতলে জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
দর্শক জরিপে ভালো করেছেন বাইডেন
অনেকেই বলছেন, দুই প্রার্থীর বিতর্ক অনেক দেরিতে অনুষ্ঠিত হলো। কারণ করোনা মহামারির জন্য ইতিমধ্যে ৪ কোটি ৭০ লাখ ভোটার আগাম ভোট দিয়েছেন। এই বিতর্ক তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো প্রভাব রাখতে পারেনি। তার পরও মার্কিনিদের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল শেষ বিতর্কটি। সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক দর্শক জরিপে দেখা যাচ্ছে, বিতর্কে ডেমোক্রেট প্রার্থী জো বাইডেন ভালো করেছেন। ৫৩ শতাংশ দর্শক বলেছেন, শেষ বিতর্কে বাইডেন জয়লাভ করেছেন। অন্যদিকে ৩৯ শতাংশ দর্শক বলেছেন, এই বিতর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জিতেছেন।
সিএনএন ছাড়াও আরো দুটি প্রতিষ্ঠানের জরিপে বিতর্কে বাইডেন জয়ী হয়েছেন বলে দর্শকেরা মত দিয়েছেন। ডেটা প্রোগ্রেস জরিপ অনুযায়ী, বিতর্কে বাইডেনের জয়ের পক্ষে মত দিয়েছেন ৫২ শতাংশ দর্শক। ট্রাম্পের জয়ের পক্ষে মত দিয়েছেন ৪১ শতাংশ দর্শক। ইউএস পলিটিকস তাদের জরিপে বলছে, ৫২ শতাংশ দর্শক মনে করেন বিতর্কে বাইডেন জয়ী। আর ৩৯ শতাংশ দর্শক বলছেন ট্রাম্প জয়ী হয়েছেন। যদিও প্রথম বিতর্কটি সর্বনিকৃষ্ট বিতর্ক হিসেবে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নিয়েছে।
এসব জরিপের ফল যাই হোক না কেন আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে তা বড় প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তবে শেষ মুহূর্তে কোন ‘ঘটনা’ সামনে এসে দাঁড়াবে, আর তা দেখে ভোটাররা মত বদলাবেন, এমন কিছুর অপেক্ষা করা একেবারেই অমূলক নয়। ২০১৬ সালের নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে হিলারি ক্লিনটনের কথিত ইমেইল কেলেঙ্কারির ঘটনা সামনে এনেছিল এফবিআই। ঐ ঘটনা নির্বাচনের ফলাফল অনেকটা বদলে দিয়েছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
আজ ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা ট্রাম্পের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার ফ্লোরিডাতে আগাম ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র জাড ডেরে জানিয়েছেন, ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে ভোট দেবেন ট্রাম্প। এই এলাকাতেই ট্রাম্পের মার-এ-লাগো অবকাশযাপন কেন্দ্র অবস্থিত।