সিনেমা হলের মৃত্যু

 

শারমিন, শোন।

কী?                   

সেদিন যে ভাইটার কথা বলছিলি তার সাথে আজ দেখা হয়েছিল। আলাপও হলো, অনেক। তুই বলছিলি না ফিল্ম-টিল্ম নিয়ে আলাপ করতে পারিস। জানতে পাবি হয়তো কিছু। জানছি। দেখ, ক্রিয়েটিভ চিন্তার মানুষ যেমন কম, তেমনি এ ধরনের ব্যাপার নিয়ে আলাপ করার মানুষও কম। সবার সাথে তো আর্ট নিয়ে আলাপও করা যায় না।

কী আলাপ করলি?

আলাপ হলো তাঁর সিনেমা দেখা নিয়ে। ইন্সপারেশন পেলাম, অনেক।

গুড। কীভাবে ম্যানেজ করলি তাঁরে?

করলাম।

শোনা তো।

শোন।

 

খ.

হ্যালো, শুনছেন?

শুনছি, বলেন।

আপনি হারুন পাশা না?

হুম। তারপর বলেন।

প্রায়ই দেখি, আপনি ইসলামনগর বাজারে খাইতে আসেন।

প্রায়ই না, বলেন প্রত্যেকদিন। আরো ভেঙে বলতে পারেন, প্রত্যেক বেলাতেই।

ঠিক আছে। আপনাকে এভাবে থামানোর জন্য দুঃখিত। বিশেষ প্রয়োজনে আপনাকে নক করা।

বলেন, কী সেই প্রয়োজন। তার আগে আপনার পরিচয়টা দেন।

আমি ইমতিয়াজ। নাটক ও নাট্যতত্ত্বে অনার্স পড়ছি। ৪৭তম আবর্তনের ছাত্র। আমরা কি চা খেতে খেতে আলাপ করতে পারি?

পারেন। তবে আলাপ আধঘণ্টার ভেতর শেষ করতে হবে। আমাকে বেরুতে হবে, দরকারি কাজে।

আচ্ছা। এ সময়ের ভেতরেই আলাপ শেষ করবো। চলেন, প্লিজ।

হুম।

আপনি বিয়ে যে করেন নাই তা নিশ্চিত হয়েছি হোটেলে খাওয়ার হিসাব-নিকাশ থেকে। রাগবেন না, প্লিজ। মূল পয়েন্ট এটা নয়। মূলে যাবার আগে শাখা-প্রশাখার কৈফিয়ত শোধ করছি। যা বলছিলাম, দেখাদেখির পর জানাজানিতে গেলাম। জানলাম আপনি লেখালেখি করেন। গল্প লেখেন। উপন্যাস লিখছেন। একটি সাহিত্য পত্রিকাও সম্পাদনা করেন। বাংলা কথাসাহিত্যের প্রচলিত ফর্ম ভাঙার চেষ্টা করছেন। পত্রিকায় জীবিত সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে কাজ করছেন। সবাই তো মরার পর পূজা করে, আপনি আলাদা। বেঁচে থাকতেই দেখাচ্ছেন তাঁর সৃষ্টি নিয়ে দৌড়-ঝাঁপ। আপনার ‘তিস্তা’ উপন্যাসটিও পড়েছি। ভালো লেগেছে এজন্য যে, নদী সম্পর্কে আমাদের যে গত্বাঁধা ধারণা ছিল তা বদলে গেছে এ উপন্যাস পড়ে।

যেমন।

যেমন, নদী মানে পানি থাকবে। জেলে থাকবে। তারা মাছ ধরবে। কৃষক-চরবাসী নদীর পানিতে আবাদ করবে। কিন্তু এখন যে এসব রূপকথার গল্পের মতো হয়ে গেছে তা আপনার উপন্যাস পাঠে নিশ্চিত হয়েছি। জেনেছি ঔপন্যাসিক নয় চরিত্ররাই মূল, উপন্যাসে। অর্থাত্ চরিত্রের কথনেই এগিয়ে যাবে উপন্যাসের কাহিনি। এবং পাবে চূড়ান্ত পরিণতি।

তুমি কি পাম দিচ্ছো? তুমি করেই বললাম, যেহেতু আমার ক্যাম্পাসের জুনিয়র।

অসুবিধা নেই। তুমি করেই বলেন, প্লিজ। খুশি হবো।

কী জানতে চাও ঝটপট বলো।

এটাকে পাম বলে না। আমার অবজারভেশন আপনাকে জানালাম। তাছাড়া আপনার সাথে আলাপের আগে একটা বিষয় ক্লিয়ার রাখতে চাই যে, আমি আপনার খোঁজ-খবর রাখছি, অনেকদিন ধরেই। আলাপে আপনার আন্তরিকতা প্রত্যাশা করছি।

মূল পয়েন্টে আসো, আন্তরিকতা পাবে।

ঠিক আছে। আমাদের সিনেমা-জগতের যে না-চলা দশা। এটা নিয়েই আলাপ আগাতে চাচ্ছি।

না চললে, না চলুক। তোমার সমস্যা কী? আসতে চাও এ জগতে?

আসতে তো চাই। সিনেমা বানানোর ঝোঁকটা তো কাটাতে পারছি না। যদিও এর ঘনত্ব একটু-আধটুকু।

ঝোঁকটা পুরোপুরি বিনিয়োগ করো। ঘনত্ব বাড়াও। হল এখন ভাঙছে, আবার গড়বে। আবুল হাসানের একটা কবিতার লাইন এমন না, দালান উঠছে তাও রাজনীতি, দালান ভাঙছে তাও রাজনীতি। অনেক চাল আছে এখানে। শোনো, বাপের একচালা টিনের ঘর ভেঙে পুত্র কি পাঁচতলা করে না? করে। অমনটাই হয়তো হবে। তোমরা তরুণ। তারুণ্য দিয়ে নতুন কৌশল অ্যাপ্লাই করে সিনেমা বানাও। দর্শক নিশ্চয় যাবে। ভারতে সিনেমা হলে ভিড় করছে না? একেকটা ছবিতে কোটি টাকা আয়। পেপার-টেপার পড়ো? খোঁজ রাখো?

খোঁজ রাখতে রাখতে টেনশনে পড়ে গেছি। আচ্ছা, বলেন তো, উপন্যাসের ফ্ল্যাপে জন্মসাল রাখেননি কেন?

ঝামেলা আছে।

কেমন ঝামেলা?

জন্মসাল দেখে নাক উঁচু লোকেরা হিসাব কষে ফেলে, আরে এ তো বাচ্চা। আমার হাঁটুর সমান বয়স। না না গোঁড়ালির সমান। সে আর কী লিখবে? ছাড়। এর বই কিনতে হবে না। একজন তো বলেই বসলো আমি কেন একজন তরুণের বই পড়বো।

ভেরি স্যাড। সিনেমার অতীত নিয়ে জানার আগ্রহ থেকেই জন্মসালটা জানতে চেয়েছিলাম।

জেনে নাও, জন্ম : ১০ নভেম্বর ১৯৯০।

ওয়াও। গুড। তাহলে এবার বলেন আপনার সময়ের সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা। তার আগে জেনে নিই আপনি সিনেমা দেখতেন তো?

দেখতাম।

তাহলে প্লিজ বলুন না ওই সময়টার কথা। সঙ্গে বর্তমানও যোগ কইরেন।

তখন তো সিনেমা হল মানে উত্সব উত্সব ব্যাপার। সবাই যেত। আমিও যেতাম। আমি সিনেমা হলে প্রথম কখন যাই সালটা সঠিক মনে নেই। তবে ‘অন্তরে অন্তরে’ ছবি দেখার জন্য গিয়েছিলাম, এটা মনে আছে। তুমি যেহেতু আমার উপন্যাস পড়েছো, সঙ্গে নিশ্চয় ফ্ল্যাপও পড়েছো?

পড়েছি।

জন্মস্থান হিসেবে উল্লেখ আছে রংপুর জেলার কাউনিয়া উপজেলার কথা, মনে আছে?

আছে।

শোনো, আমার উপজেলার সিনেমা হল নিয়েই বলি। এখানে দুটি সিনেমা হল ছিল, আমাদের সময়ে। একটা সানাই টকিজ, অন্যটা ঝংকার টকিজ। আমরা যখন খুব ছোট, তখন আমাদের বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে রাজু নামের একজন মাইকিং করতেন। আজ থেকে শুরু হলো সালমান শাহ অভিনীত, অমুক পরিচালিত, তমুক প্রযোজিত ‘কিয়ামত থেকে কিয়ামত’। আরো অভিনয় করবেন।... রিকশার দুই সাইডে কাঠের পার্টে পোস্টার লাগানো থাকতো। রিকশার পেছনে পেছনে দৌড়ানোদের উদ্দেশে কিছু ছোট ছোট পোস্টার ছুড়তো। আমরা কুড়াতাম। দেখতাম। হলে সিনেমা দেখার আগে বিটিভিতে সিনেমা দেখতাম। এ প্রসঙ্গেও বলে নিই। শুক্রবারে সাড়ে তিনটা বাজার আগেই আমরা টিভির সামনে হাজির। তখন তো আমাদের টিভি ছিল না। পড়শীর বাড়িতে যেতে হতো। মাটিতে বসে, কোনোদিন পিঁড়িতে বসে, কোনোদিন জুতা খুলে পিঁড়ির মতো বসতাম এক জুতায়। আর দুই পা রাখতাম অন্য জুতায়। পায়ে ঝিঞ্জি লেগে যেত। তবুও উঠতাম না। কারণ, উঠলেই জায়গা বুক হয়ে যেত। কয়দিন এর বাড়িতে, কয়দিন ওর বাড়িত ছবি দেখতাম। তখন টিভির সংখ্যাও কম ছিল। কোনোদিন এক টাকা, দুই টাকা দিয়েও টিভি দেখেছি। ছবি দেখার আগ্রহ ছিল ব্যাপক। সর্দারদিঘীর পাড় নামে একটা জায়গা ছিল, আমাদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে। যেতে সময় লাগতো, অনেক। আমরা সেখানেও যেতাম ছবি দেখার জন্য। বিটিভি তো ছিল সামাজিক সিনেমা দেখার মাধ্যম। এখনো দেখ না, দেশে মেঘনাদ কিংবা অভিমন্যু বধ হয়ে গেলেও দেখায় বাতাবি লেবুর বাম্পার ফলন। ওইরকম আরকি। এইদিক দিয়ে গান শুরু হলো ওইদিক দিয়েই শেষ। এই দিক দিয়ে অ্যাকশন শুরু হলো ওইদিক দিয়েই শেষ। খালি কাটাকাটি করতো। আর বিজ্ঞাপনের পর বিজ্ঞাপন চালাতো। আমরা বলতাম অ্যাডভেটাজ শুরু হইছে। পাঁচ মিনিট ছবি দেখিয়ে পনেরো মিনিট বিজ্ঞাপন দেখাতো। আমরা ধৈর্যের সর্বোচ্চ পরীক্ষা দিয়ে টিভি সেটের সামনে বসে থাকতাম। কারণ ছবি দেখতেই হবে। নেশা কাটে না তো। বিজ্ঞাপন বিরক্ত করে তুলতো। তারপরও আমরা পরের শুক্রবারে ভিড় বাড়াতাম। দেখতাম রাজ্জাকের ‘বাবা কেন চাকর’। দেখতাম জসীম, আলমগীর, শাবানার ছবি। তখন জয়েন্ট ফ্যামিলির ভিতরে থাকা সম্পর্ক, ভাঙন, ছোট-বড়র শ্রদ্ধা, স্নেহ বেশি দেখা যেত। মাঝপথে একটু এলোমেলো হতো হুমায়ূন ফরিদী বা রাজিব বা সাদেক বাচ্চু বা এটিএম শামসুজ্জামান বা নাসির খান বা রীণা খানের কুটনামিতে। অবশ্য দিলদার ওই সময়টুকু হাসায়া হাসায়া আমাদের দুঃখ ভুলায়া রাখতো। দুপুর সাড়ে তিনটা বাজার আগেই পাড়া ভেঙে জড়ো হতো যে কয়জনের বাড়িতে টিভি ছিল, সেখানে। শাবানা কিংবা জসীম-আলমগীরের দুঃখে কী কান্নাই না করতো মায়েরা, বোনেরা, ছোটরা। আমিও কাঁদতাম। কাঁদতাম ঢিশুম ঢিশুম মাইর শুরু হলে। কুটনামি করলে।

বিটিভিতে ছবি দেখার পাঠ নেওয়া শেষে হাইস্কুলে যাওয়া-আসার সময় বুঝতে পারি হল নামেও কিছু আছে। এখানে মানুষ টিকিট কেটে সিনেমা দেখে। দুপুর বারোটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত শো চলে। একেকটা শো সমান তিন ঘণ্টা। স্কুল থেকে ফেরার পথে পোস্টার দেখতাম। আরেকটু খোলাসা করি। স্কুলে যাওয়ার পথে দুটি সিনেমা হলই পেতাম। একটা ছিল কাউনিয়া বাসস্ট্যান্ডের আগে। অন্যটা বাসস্ট্যান্ডের পরে। হলের সামনে রাস্তায় বড় বড় পোস্টারে নায়ক-নায়িকার ছবি দেওয়া থাকতো। আমি কেবল রাস্তার পোস্টারই দেখতাম। হলের সামনে যেতাম না। কম পাকনা ছিলাম তো। আমার বন্ধুদের মধ্যে যারা বেশি পাকনা ছিল তারা যাইতো সিনেমা হলে। আমি একবার এক বড় ভাইরে দেখলাম চুপ করে গাছের সুপারি পেরে বিক্রি করা টাকায় সিনেমা দেখেছে। তার বন্ধু খোঁয়াড় থেকে হাঁস-মুরগি চুরি করেছে, টিকিটের টাকা জোগাড়ের জন্য। সিনেমা দেখে এসে আমাকে বলেছে নায়ক-নায়িকা বড় বড় দেখায়। পুরা গান দেখায়। ফাইট দেখায় পুরা। লোভ বাড়ে। কিন্তু সিনেমা দেখায় মনোযোগী হই না। প্রথমেই বলেছিলাম ‘অন্তরে অন্তরে’ সিনেমা দেখার কথা। ওই সিনেমা আমাদের দেখিয়েছিল সানাই টকিজ হল মালিকের ভাই। তখন তো সিনেমাও বুঝতাম না। আর টিকিটও লাগেনি। মানে ফাওয়ের উপরেই চলে গেছে। হলের ভেতরে ঢুকে বাইরও হয়ে গেছি। বাইরে দৌড়াদৌড়ি করেছি। তারপর দেখতাম বড় ভাই তার সার্কেল নিয়ে সিনেমা দেখতে যেত। ও একটু বেশি পাকনা ছিল। বড়দের সাথে তার খাতির। যদিও আমরা পড়তাম একই ক্লাসে। তারপর শুনি তারা সিনেমা দেখে এসেছে, রাতে। বাপ-ভাই কেউই কিছু বললো না। বকলো না। তারা গল্প শোনায় হেঁটে হেঁটে কাউনিয়া স্ট্যান্ড থেকে রাজারহাট গিয়ে সিনেমা দেখেছে। তাদের গল্প শুনি। আর অ্যাকটিভিটিজ খেয়াল করতে থাকি। তারপর একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম সিনেমা দেখবো। তার আগে রাজু ভাইয়ের কাছ থেকে জানি ঈদে কোন সিনেমা লাগাবে। পোস্টার দেখার চেষ্টা করি। আসলে ছবিটা কেমন হতে পারে। পোস্টার দেখার ফাঁকে দেখতাম কাউন্টারের পাশে একটা অংশ নেট দিয়ে আটকানো। তার ভেতর ছোট ছোট পোস্টার। নায়িকাদের ছোট ছোট পোশাকের ছবি। বিটিভিতে দেখে দেখে মিশা সওদাগরকে চিনে ফেলেছিলাম। দেখি সে একটা মেয়েকে রেপ করছে, সেই ছবি। এইসব সত্ত্বেও গেলাম একদিন সিনেমা দেখতে। ঈদের পরের দিন। পাকনা বড় ভাই ঈদের রাতেই দেখেছে সিনেমা। সিনেমা দেখতে যেতে চাই, কিন্তু হাতে টাকা নেই। ঈদের দিন বড় ভাই আর আপার কাছ থেকে পেতাম খুবই কম টাকা। কেউ কেউ দিতই না। ঈদের দিন পাশের বাড়ির বড়রা ছোটদের টাকা দিয়ে যেত। আমার ছোট বোন, মেজ বোন, বড় ভাই, ছোট ভাই সবাই টাকা পেত। কেবল বাদ পড়তাম আমি। আমার মার্বেল খেলায় খুব মনোযোগ ছিল। মার্বেল খেলার জন্য এক-দুই টাকা রেখে যে কয় টাকা পেতাম কাউকে দিয়ে দিতাম, রাগে-অভিমানে। যা বলছিলাম। ফলে সিনেমা দেখতে যাওয়ার দিনে আমার কাছে টাকা ছিল না। বড়বোন খোঁয়াড় থেকে দুইটা হাঁসের ডিম এনে দিলেন। আমি প্যান্টের পকেটে নিয়ে কাঁচামালের দোকানে বেচে দিলাম। টাকা নিয়ে গেলাম টিকিট কাটতে। গিয়ে দেখি আমার এক বন্ধু, সেও টিকিট কাটছে। আমরা প্রিয় নায়ক রুবেলের সিনেমা দেখা শুরু করলাম। দেখলাম এ বিটিভির যুগের পুরা উল্টা চিত্র। নায়িকা ছোট ছোট পোশাক পরছে। সাইড নায়িকা প্ল্যাস্টিকের পোশাক পরে বাথরুমে ঝরনায় ভিজছে। নায়কও সাথে ভিজছে। আর শরীর মেসেজ করছে। মিশা সওদাগর রেপ করছে নায়কের বোনকে। তার ভাই চোরাকারবারিতে কেন বাধা দিলো, সেই ঝাল মেটাচ্ছে। দেখতে দেখতে খেয়াল করি গামছা দিয়ে মুখ পেঁচানো একজন। পেছন থেকে একজন গামছায় দিলো টান। দেখি আমাদের স্যার। আমরা বেরিয়ে গেলাম, দ্রুত। পরের ঈদে আরেকটা সিনেমা দেখতে যাই। আগের ঈদে পুরা সিনেমা দেখতে না পারার আফসোস মেটাতে। সিনেমা কিছুদূর আগানোর পর দেখতে পাই মোটা আর কালো করে একজন বলছে, সানডে মানডে ক্লোজ কইরা সিস্টেম চালু কইরা আমি এইখানে আইছি। তরে পুত কইরা দিমু। আর রেপ করছে। ওই সময় বাস্তবে যত না রেপ ছিল সিনেমায় ছিল তার থেকেও বেশি। আবারও বুঝতে পারি বিটিভির যুগ পুরাপুরিই শেষ। এখন অন্যযুগ। আবার পাকনাদের মুখে শুনি নয়টা থেকে বারোটার শো-তে নাকি পুরা ন্যাংটা ছবি দেখায়। আমি তো বুঝতাম না ওইসব। এখন বুঝি ওইটার নাম ছিল ‘ব্লু-ফিল্ম’। মেট্রিক পাস করার পর আবার সিনেমা হলে যাই, দেখি নতুন নতুন ভিলেন, নতুন নতুন নায়ক-নায়িকায় ভরা, সব। দেখি গান শুরু হলে নায়িকার ছোট পায়জামার নিচ দিয়ে লাইট মারে পোলাপাইন। আরো কত কী দেখলাম।

আলমগীর-শাবানাদের ছবি বিটিভি মুখস্থ করিয়ে ফেললে, কয়েকটি ছবি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখালে, পছন্দের নায়ক-নায়িকাদের নতুন ছবি দেখতে, যেমন, সালমান শাহ, শাবনূর, রিয়াজ, রুবেল, মান্না, মৌসুমীর ফুল মুভি দেখার জন্য হলে যেত অনেকেই। এদের ছবি ফ্ল্যাপ খেলে মুনমুন, ময়ূরী, ঝুমকা, শাপলা, পলি, নদী, মেহেদী হাসান, আলেকজান্ডার বো, প্রিন্স, সোহেল এদের আগমন। ব্রা-পেন্টির শরীর বেরিয়ে আসতে থাকে। আসতে আসতে থামতে থাকে। পরিচালকরা বুঝতে পারে এভাবেও পকেটে যাচ্ছে না বিজনেসের প্রফিট। তারা বিদেশি পর্নোগ্রাফির কাটপিস ঢোকাতে থাকে। তারপর দেশীয় নায়িকাদের দিয়েই করানো হলো এই কাটপিস। না, চললো না এভাবেও। দর্শকের পাত্তা পাওয়ার জন্য এক টিকিটে দুই শো চালাতে থাকে। একসময় হলই অকেজো হয়ে পড়ে। সানাই টকিজে স্কুল হয়েছে, ঝংকার টকিজে গান শেখানো হচ্ছে। যে সুন্দর করে মাইকিং করতো, সে বাসের কনডাকটারি করছে। মালিকেরা জায়গা বিক্রি করে অন্য বিজনেস ধরেছে। কী মন খারাপ হয়ে গেল? মন খারাপ করে না। দেখো, এখন মোবাইলের যুগ। মানুষের মন চাইলেই মেমোরিকার্ডে মুভি ভরে এনে শুয়ে-বসে বউয়ের সঙ্গে আলাপ করতে করতে, বিস্কুট আর চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মুভি দেখে ফেলতে পারে। তারপর ইউটিউবে দেখতে পারে। বাংলাদেশি নয় কেবল, ভারতীয় বাংলা-হিন্দি ছবি আর সিরিয়াল দেখতে পাচ্ছে। আমাকে বোঝাও তারা কেন সিনেমা হলে যাবে এত আরাম ছেড়ে? কেন হলে গিয়ে ফাকসা সিনেমা দেখবে সময় খরচ করে? নতুন ধাঁচের সব কিসিমের সব কিছুই দেখতে পাচ্ছে মোবাইলে, ডিসের লাইনে। টিভির রিমোটে চাপ দিলেই স্টার জলসা, জী বাংলা, সনি চ্যানেল হাজির।

বাংলাদেশের মানুষ দেশীয় সিনেমা আর নাটক দেখে না—এ নিয়ে হতাশায় পড়ছো তো? হতাশ হইয়ো না। হতাশ হয়ে শক্তি ক্ষয় না করে উদ্যমী হও। প্রবলেম ফাইন্ড আউট করো। আমি কিছু বলে দিচ্ছি তোমার সুবিধার্থে। গল্পটা মৌলিক করো। কপি বন্ধ করো। কপিটাও যদিও ঠিকঠাক করতে পারছে না। এটাতেও যত্মবান হওয়া উচিত। তামিল মুভি কপি করে অথচ এটা শিখে না যে তাদের গান, পরিবেশ, গল্পে, অ্যাকশনে, নির্মাণে নিজস্বতা আছে, তেমন নিজস্বতা দাও আমাদের সিনেমায়। আমদানি কমাও। নিজেদের যা আছে ডেভেলাপ করো। নিজের খেতের আবাদ করা ফসল ঘরের মানুষেরাই খাক। অসুবিধা নাই তো। শুনেছি বিএফডিসির এমডির নাকি সিনেমা নিয়ে জ্ঞানই নাই। অথচ তাকে ওই পোস্টে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলটা কী হলো। ফলটা হলো বিএফডিসিতে বসে আলাপ হয় ঈদে কে কেমন গরু কিনেছে, কারটার দাম কত। অথচ আলাপ হওয়ার কথা ছিল ঈদে কয়টা সিনেমা রিলিজ হবে, কোন সিনেমা কেমন, এসব। মুভির পরিসর ছোট হতে হতে এমন অবস্থায় এসেছে যে, নায়ক-নায়িকার মুখই বারবার দেখতে হয়। আর মাঝে মধ্যে দেখা যায় ভিলেন। সেদিন পরীমণির একটা গান দেখলাম, দুজনে অভিনয় করছে, অথচ মনে হচ্ছে পুতুলনাচ হচ্ছে। প্রেমিক-প্রেমিকার দৃশ্যায়নটাও সেরকম করো। যাতে বোঝা যায় সত্যিকার অর্থেই তারা প্রেমিক-প্রেমিকা। অঙ্গভঙ্গি সেরকম করো। ভেতর থেকে অভিনয়টা দিতে বলো। ভারত ভারত করা হয় সব সময়। কিন্তু তাদের সিনেমায় এসবের কম্বিনেশন তোমরা নাও না, দেখেও দেখ না। কেন ভালোটা নাও না? বুঝি না। ওই দেশে শত শত চ্যানেল। ছবি আর সিরিয়ালে ছড়াছড়ি। তারপরও মানুষ হলে গিয়ে সিনেমা দেখে। এসব নিয়েও ভাবতে হবে। ফেসবুক থেকে আর্টিস্ট নির্বাচন না করে, লাইক-কমেন্টের স্রোত থেকে বেরিয়ে অভিনয় দেখে আর্টিস্ট বাছাই করো। স্ক্রিপ্টে টাকা বাড়াও। ট্রেলার কেবল চকচকে, তকতকে করলে হবে না। ভেতরে মাল-মেডিসিনও ভালো রাখতে হবে। ভিলেন মানেই বিদঘুটে চেহেরার হবে, এই ধারণা থেকে বের হওয়া দরকারি। ভিলেনও সুন্দর চেহারার হতে পারে এটা দর্শককে বোঝাও। নায়ক-নায়িকাকে কলেজে না পড়িয়ে পাবলিক ইউনিভার্সিটির বারান্দায় নিয়ে যাও। যৌথ প্রযোজনার ভালোটা নাও। সাকিবের দিকে তাকাও। ছেলেটা ওই দেশে গিয়ে ছেঁড়া প্যান্ট পরা শিখলেও অভিনয়ে ইম্প্রুভ করছে। জিত্, দেব ওদের সাথে পাল্লা দিয়ে সিনেমা করে যাচ্ছে। হয়ে উঠছে দুই দেশের নবাব। এটা দেখো। এদেশের পরিচালকদের দর্শকের ক্যালকুলেশনে টার্গেট থাকে রিকশাওয়ালা, ভ্যানওয়ালা আর গার্মেন্টসকর্মী। আরে বাবা একটা চমত্কার ছবি তৈরি করো সব শ্রেণির দর্শকের জন্য। দেখবে সবাই লুফে নিচ্ছে নিজেদের গল্প মনে করে। হল ভরে উঠবে। নিশোর মতটাও মাথায় রাখতে পারো। যেমন, শিল্পীর দায়িত্ব দর্শকের রুচি তৈরি করা। দর্শক যা দেখতে চান, সেটা তৈরি না করে, আমরা যা দেখাতে চাই, তা বানানো জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, খুব মানসম্মত নয়—এমন জিনিসেরও কোটি কোটি ‘ভিউ’ হয় ইউটিউবে। তাই দর্শককে ভালো নাটক, ভালো সিনেমা দেখতে অভ্যস্ত করতে হবে। একটা বিষয় তোমার ক্লিয়ার থাকা দরকার। বিষয়টা হলো, হল মালিকদের সৃষ্টিই ব্যবসা করার ধান্দায়। যতদিন ব্যবসা চলছে ততদিন হল রেখেছে। ব্যবসা নাই, হলও নাই। ওটা নিয়ে চিন্তা করো না। হল খুলে যাবে ব্যবসার গন্ধ নাকে গেলেই। সিনেপ্লেক্স হবে। ডোন্ট ওরি। তোমাদের উচিত ভালো মানের সিনেমা বানিয়ে যাওয়া। আজ উঠি। মন খারাপ করো না। কাজে মন দাও।

ঠিক আছে ভাই। সাহস পাইলাম।

 

গ

ইমতিয়াজ, এখন কী ভাবলে, সিনেমা বানানোয় মন দিবে?

হুম, দেবো মন, শারমিন। ভালো মানের সিনেমা বানাবো।

কীরকম সেটা?

ভালো মান বলতে কাহিনি, সংলাপ, অভিনয়, নাচ, পরিচালনা, প্রযুক্তির চমত্কার ব্যবহার, কমেডি, আবেগ, অ্যাকশন, রোমান্স, দৃশ্যায়ন হবে নান্দনিক। বাণিজ্য থাকতেও পারে আবার নাও থাকতে পারে। থাকলেও শিল্পের চিন্তাটাও রাখতে হবে। আমাদের পরিবেশ, সমাজ, ইতিহাস, ঐতিহ্য পরিবেশিত হবে ডেভেলাপিং ওয়েতে।

ও। গুড। ক্যারি অন ম্যান।