গত সংখ্যার পর
শিক্ষিত তরুণ বাঙালি-মানসে প্রেমের আদর্শরূপ হিসেবে দীর্ঘকাল ধরেই একক আধিপত্য ধরে রেখেছে ‘শেষের কবিতা’র (১৯২৯) অমিত-লাবণ্যের প্রেমকথা। বুদ্ধিদীপ্ত, আবেগময় ও পরিণতিবিমুখ এই ধরনের প্রেমিকই সম্ভবত শিক্ষিত বাঙালির প্রিয়। প্রেম পুরুষ মানুষের অস্তিত্বমূলের সঙ্গে সম্পর্কিত, তবে প্রেমিকার পরিবর্তন ‘ওথেলো’ সৃষ্টি করে না। শিলং পাহাড়ের নির্জন পরিবেশে লাবণ্যের প্রতি অমিত রায়ের প্রেমের উন্মেষ। শিক্ষিত উচ্চমধ্যবিত্ত ব্যারিস্টার অমিত রায় ঘটনাক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতিছাত্রী লাবণ্যের প্রেমে নিমজ্জিত। প্রতি-নায়ক শোভনলালও ‘রায়চাঁদ-প্রেমচাঁদ স্কলার’। ঔপন্যাসিকের ভাষায় অমিত চরিত্রের যে পরিচয় পাওয়া যায়, সেখানে মৃত্তিকা ও বস্তুজীবনলগ্নতার কোনো পরিচয় নেই। কেবল গ্রন্থবিহার -বুদ্ধি ও আবেগচর্চা, বাক্সর্বস্বতার সর্বৈবচর্চা বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের বাঙালিজীবনের উচ্চবিত্ত শিক্ষিত বলয়ের একটা বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছিল। সেখানে প্রেম যেভাবে দানা বাধে, পরিণতি সে-রকম সর্বাঙ্গ সুন্দর ও সফল হয় না। ঊর্ধ্বচারী মন মৃত্তিকার স্পর্শেই গতিহীন হয়ে পড়ে। অমিত রায়, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘রোমান্সের পরম-হংস’। কবিত্ব এবং আবেগ তার প্রধান মানসধর্ম। লাবণ্যের প্রতি প্রেমের ক্ষেত্রে প্রথমাবধি তার আবেগধর্ম মুখ্য, বুদ্ধিবৃত্তি গৌণ। কিন্তু শিক্ষিত লোকের আবেগ যে অনেক বেশি বর্ণচোরা ও চলনসই—উপন্যাসে শেষ পর্যন্ত তার প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রেম সবকালে এবং সব মানুষের কাছেই ঊর্ধ্বচারী। মাটির পৃথিবীর স্পর্শে তার বিনাশ অথবা পর্বান্তর ঘটে। প্রেমধারণার ক্ষেত্রে অমিত সর্বাংশেই ঊর্ধ্বচারী। তার কোনো গাণিতিক বা জ্যামিতিক ব্যাখ্যাদান অসম্ভব : ‘নির্বিশেষভাবে মেয়েদের প্রতি অমিতের ঔদাসিন্য নেই, বিশেষভাবে কারও প্রতি আসক্তিও দেখা যায় না। এক কথায় বলতে গেলে, মেয়েদের সম্বন্ধে ওর আগ্রহ নেই, উত্সাহ আছে।’ (১: অমিত-চরিত)। নির্জন পাহাড়ি রাস্তায় মোটর দুর্ঘটনায় অমিতের পরিচয় হলো লাবণ্যের সাথে। পরিচয় রূপান্তরিত হলো প্রেমে এবং অবশেষে সীমাতীত অবস্থান ব্যাখ্যায় তার অবস্থান চিহ্নিত হলো ‘দীঘির জল’ হিসেবে। এভাবেই অমিতের প্রেম হলো গৃহ-বিমুখ—দাম্পত্যজীবনবিমুখ। প্রেমিক অমিতের আত্মদর্পণ ও প্রেম-প্রতিষ্ঠার ধারাক্রম শূন্যচারী মনের প্রকৃত জীবনলগ্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে পরিণতি লাভ করেছে। উচ্চশিক্ষিতা, সংবেদনময় ও প্রণয়াবেগে উজ্জ্বল লাবণ্য যতক্ষণ পর্যন্ত অমিতের কবিত্বের অনুরাগী, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রেম ছিল দ্বন্দ্বহীন ও সাফল্যমুখী। কিন্তু একসময় লাবণ্য আবিষ্কার করে যে সে নারী সে অনুভব করে লোকোত্তর প্রেম উভয়ের ক্ষেত্রেই সর্বনাশ। তখন লাবণ্য লোকায়ত প্রেমিক হিসেবে মনে মনে গ্রহণ করে শোভনলালকে। অমিত তার কাছে অসীম—লাবণ্য যেহেতু নারী—তাকে সসীম প্রেমের পথিক শোভনলালকেই আশ্রয় করতে হয়। আর অসীম প্রেমলোকের পথিক অমিত রায়-কে সে জানিয়ে দেয় :
‘সে আমার প্রেম।
তারে আমি রাখিয়া এলেম।
অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে।’
অতি-আবেগ ও স্বপ্নচারী মনোভ্রমণ শেষে অমিত রায়ও উপলব্ধি করে প্রেম ও বিবাহের দ্বৈত অবস্থান : ‘সংজ্ঞা দিয়ে বলা যায় না জীবন দিয়ে বলতে হয়। যদি বলি ওর মূল মানেটা ভালোবাসা তা হলেও আরেকটা কথায় গিয়ে পড়ব। ভালোবাসা কথাটা বিবাহ কথার চেয়ে আরো বেশি জ্যান্ত।’ (১৭ : শেষের কবিতা)। উপন্যাসের শেষে অমিতের জীবনে লাবণ্যের প্রতি সীমাহীন প্রেমকে রেখে কেতকীর সীমাবদ্ধ প্রেমে আশ্রয়লাভ একটা দার্শনিক মীমাংসায় সিদ্ধ। লোকোত্তর এবং লোকায়ত প্রেমের একটা সমান্তরাল অবস্থান ও এখানে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে : ‘অমিত বললে, “একদিন আমার সমস্ত ডানা মেলে পেয়েছিলুম আমার ওড়ার আকাশ; আজ আমি পেয়েছি আমার ছোট্ট বাসা, ডানা গুটিয়ে বসেছি। কিন্তু আমার আকাশও রইল।”’ প্রেম যে কেবল তত্ত্ব নয়, জীবনেরও অঙ্গ—অমিত লাবণ্যের প্রেমকথায় সে-সত্যই প্রতিষ্ঠা করলেন রবীন্দ্রনাথ। একারণেই ‘শেষের কবিতা’ হয়ে উঠেছে আধুনিক মানব-মানবীর প্রেম ও পরিণতির রূপককাব্য।
৪
বাঙালিজীবনে বিনাশী প্রেমিকের আদর্শ হিসেবে শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবদাস’ উপন্যাসের দেবদাস চরিত্র অল্পশিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত-মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। শরত্চন্দ্র উপন্যাসটি রচনা করেন উনিশ শতকের শেষ দিকে এবং গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন ১৯১৭ সালে। বাঙালির অক্রিয় (passive) স্বভাবের সঙ্গে দেবদাসের প্রেম ও তার আত্মবিনাশী পরিণতির মিল তরুণ মানসকে দীর্ঘকাল অলোড়িত ও যন্ত্রণাদগ্ধ করেছে। বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরের ব্যবধানের সমান্তরাল দেবদাসের করুণ ও অসুস্থ প্রেমের প্রাসঙ্গিকতা তরুণ মন থেকে কোনোদিন মুছে যাবে বলে মনে হয় না। অতি-আবেগী ব্যক্তির প্রত্যাশার অপ্রাপ্তিজনিত আত্মক্ষয় কেবল দেবদাসের নয়, বাঙালি তরুণ-তরুণীর স্বভাবের সঙ্গে অনেকটাই মিলে গেছে। গ্রামীণ জীবনের সচ্ছল পরিবেশে বেড়ে-ওঠা পার্বতী ও দেবদাসের প্রাথমিক সম্পর্ক অনেকটা স্বাভাবিকভাবেই অগ্রসর হয়েছে। এ-ধরনের কিশোর-কিশোরী আমাদের সমাজকাঠামোতে এখনো প্রচুর। এই সচ্ছলতাকে কল্পনায় রেখে দেবদাসকে নিজের জীবনের সমকক্ষ ভেবে অনেকেই তৃপ্তি পেতে পারে। শরত্চন্দ্রের কৃতিত্ব এখানে যে বিশ শতকের বাঙালি মধ্যবিত্তজীবনের সীমারেখাকে তিনি সমাজের এমন এমন ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত করলেন, যা পূর্বে দেখা যায়নি। তিনি সামাজিক সমস্যা, সংকট ও তার পটভূমিকে নগর-জীবনের তলদেশে এবং গ্রামীণ জীবনের কেন্দ্রমূলে সম্প্রসারণ করে এমন চরিত্র সৃষ্টি করলেন, যা বাঙালি তরুণের আত্মরূপের প্রতিচ্ছবি হয়ে দেখা দিলো। দেবদাস আত্মবিনাশী ব্যর্থপ্রেমিক চরিত্রের আদর্শ হয়ে উঠল। নাগরিক সংস্কৃতি থেকে গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতি পর্যন্ত ‘দেবদাস’ উপন্যাসের বিষয়ের পরিধি যেমন বিস্তৃত, তেমনি চরিত্রগুলোও এইসব পরিস্থিতি থেকে উত্থিত। প্রেমের বিশ্লেষণ শরত্চন্দ্রের কাছে গুরুত্ববহ ছিল না, প্রেমের পরিণতিকেই তিনি বড় করে দেখলেন। নর-নারীর পরস্পর-সম্পর্কের আবেগঘন বিন্যাস শরত্চন্দ্রের উপন্যাসের মাধ্যমে বাঙালি পাঠকের মনোজগেক প্রবলভাবে আলোড়িত করতে সমর্থ হয়। বাঙালি জীবনের সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ তাঁর দেবদাস চরিত্রের মাধ্যমে কেবল পাঠকপ্রিয়ই করেনি, অনেকের কাছে তা ব্যক্তি-অনুভবের প্রতীকে পরিণত করেছে।
বিকাশমান বাঙালি মধ্যবিত্তের যে-জীবনসত্য শরত্চন্দ্রের অন্বিষ্ট ছিল, সেখানে বহির্জীবনের সক্রিয়তা অপেক্ষা মনোজগতের সক্রিয়তাই প্রাধান্য পেয়েছে। তাঁর উপন্যাসের গ্রামীণ পরিপ্রেক্ষিতে বেড়ে ওঠা দেবদাস ও পার্বতী সম্পর্কে এ-সত্য আরো বেশি প্রযোজ্য। নাগরিক রুচির সঙ্গে সঙ্গে আর্থ-সামাজিক বিকাশের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত না-হলে মানুষের প্রেম-সম্পর্কও যে বাধাগ্রস্ত হয, দেবদাস ও পার্বতীর প্রেমের পরিণতি তার দৃষ্টান্ত। বাঙালি মধ্যবিত্তের যে ব্যাপক অংশ গ্রামের ভূ-সম্পত্তির মালিকানা থেকে উদ্ভূত হয়েছে দেবদাস বহুলাংশে তাদের প্রতিনিধি এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। শরত্চন্দ্রের অধিকাংশ উপন্যাসের নায়ক-নায়িকার মতো দেবদাসও সামন্ত আর্থ-উত্পাদন ব্যবস্থার সচ্ছল বৃত্তের অধিকারী। নাগরিক জীবন সে যাপন করলেও নাগরিক ব্যক্তিত্ব তার গড়ে ওঠেনি। অন্যদিকে, সামন্ত আভিজাত্যবোধ থাকলেও মূলত সামন্ত মূল্যবোধের নেতিবাচক দিকগুলো তার বিশ্বাস, সংস্কার ও মূল্যবোধকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। এ-কারণে জীবনের বস্তুগত চাহিদার পরিবর্তে ভাবগত সত্যকেই সে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে এবং আত্মক্ষয়ী পরিস্থিতির মধ্যে নিক্ষেপ করেছে। গ্রামের প্রাত্যহিক আটপৌরে জীবনের মধ্যে পার্বতীর সঙ্গে সম্পর্কটাই একটু ভিন্ন মাত্রা নিয়ে দেখা দিয়েছে। ‘দিনের পর পর দিন যায়—এ দুটি বালক-বালিকার আমোদের সীমা নাই—সমস্ত দিন ধরিয়া রোদে রোদে ঘুরিয়া বেড়ায়, সন্ধ্যার সময় ফিরিয়া আসিয়া মারধর খায়, আবার সকালবেলায় ছুটিয়া পলাইয়া যায়—আবার তিরষ্কার-প্রহার ভোগ করে। রাত্রে নিশ্চিন্ত-নিরুদ্বেগে নিদ্রা যায়; আবার সকাল হয়, আবার পলাইয়া খেলা করিয়া বেড়ায়। অন্য সঙ্গীসাথী বড় কেহ নাই প্রয়োজনও হয় না।’ (তৃতীয় পরিচ্ছেদ) এই নিরুদ্বিগ্ন নির্দ্বন্দ্ব সম্পর্কায়নে কোনো জটিলতাও নেই। কিন্তু সম্পর্কের গুরুত্ব ও জটিলতা তখনই প্রবল হতে থাকে যখন দেবদাসকে ‘পড়াশুনা’ করার জন্য কলকাতায় পাঠিয়ে দেয়া হলো। এর ফলে দেবদাস ও পার্বতীর অভ্যাসগত জীবনের ছন্দপতনের সঙ্গে সঙ্গে পরস্পরের সম্পর্কের মধ্যে নতুন মাত্রা যোগ হলো। সূক্ষ গভীর প্রেম বলতে যা বোঝায়, তার কোনো লক্ষণ ছাড়াই তাদের কৈশোরক আবেগ একে অপরকে অনুভব করতে শুরু করে। ‘প্রথম দর্শনে প্রেম’-এর পরিবর্তে প্রথম অদর্শনে তাদের প্রেমের বীজ অঙ্কুরিত হলো। দেবদাস কলকাতায় চলে গেলে ‘...পার্বতীর কত কষ্ট হইল; কত চোখের জলের ধারা গাল বাহিয়া নীচে পড়িতে লাগিল; কত অভিমানে তাহার বুক ফাটিতে লাগিল। প্রথম কয়েকদিন এইরূপে কাটিল। তাহার পর হঠাত্ একদিন প্রাতঃকালে উঠিয়া দেখিতে পাইল, সমস্ত দিনের জন্য তাহার কিছু করিবার নাই।’ (চতুর্থ পরিচ্ছেদ) অন্যদিকে কলকাতা বসবাসের ফলে দেবদাসের স্বভাবে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিল। পূর্বে তার যে সমস্ত ‘গ্রাম্যতা-দোষ’ ছিল, শহরে বাস করার ফলে সেগুলো একেবারেই বিদায় নিল। ‘গ্রামের নদীতীরে বেড়াইতে আর সাধ যায় না; বরং তাহার পরিবর্তে বন্দুক হাতে শিকারে বাহির হইতেই আনন্দ পায়। ক্ষুদ্র পুঁটিমাছ ধরার বদলে বড় মাছ খেলাইতে ইচ্ছা হয়। শুধু কি তাই? সমাজের কথা, রাজনীতির চর্চা, সভা-সমিতি—ক্রিকেট, ফুটবলের আলোচনা! হায় রে! কোথায় সেই পার্বতী, আর তাহাদের সেই তালসোনাপুর গ্রাম! বাল্যস্মৃতিজড়িত দুই-একটা সুখের কথা যে মনে পড়ে না, তাহা নয়—কিন্তু নানা কাজের উত্সাহে সে-সকল আর বেশীক্ষণ হূদয়ে স্থান পায় না।’ কিন্তু দেবদাসের বাইরের কর্মব্যস্ত জীবনের পরিচয় শরত্চন্দ্রের কাছে তাত্পর্যহীনই থেকে যায় শেষ পর্যন্ত। পার্বতীর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বিয়েকে কেন্দ্র করেই উভয়ে সম্পর্কের চরম সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়। প্রথাগত সামাজিক জটিলতা অপেক্ষা দেবদাসের জমিদার পিতার পারিবারিক অহং এবং অনেকটা দেবদাসের নিষ্ক্রিয়তার ফলেই পার্বতীর সঙ্গে শেষ পর্যন্ত দেবদাসের বিবাহ হয় না। দেবদাস এ-পর্যায়ে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয় যে, ‘পার্বতী তাহার সেই একঘেয়ে গ্রাম্য-জীবনের মধ্যে নিশিদিন শুধু তাহাকেই ধ্যান করিয়া আসিয়াছে। শুধু তাই নয়। সে ভাবিত ছেলেবেলা হইতে যাহাকে নিতান্ত আপনার বলিয়াই জানিয়াছিল, ন্যায়-অন্যায় সমস্ত আবদারই এতদিন যাহার উপর খাটাইয়া লইয়াছে, যৌবনের প্রথম ধাপটিতে পা দিয়াই তাহা হইতে এমন অকস্মাত্ পিছলাইয়া পড়িতে হইবে না।’ (পঞ্চম পরিচ্ছেদ) বয়স্ক জমিদার পাত্রের সঙ্গে বিয়ের কথা চূড়ান্ত হওয়ার পর এক গভীর ম্লান জ্যোত্স্নারাতে পার্বতী দেবদাসের গৃহে উপস্থিত হয় এবং আত্মনিবেদন করে : ‘দেবদা, নদীতে কত জল। অত জলেও কি আমার কলঙ্ক চাপা পড়বে না?’ কিন্তু শেষবারের মতো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে দেবদাস। পিতার অনুগত সন্তানের মতো আত্মরক্ষার পন্থা হিসেবে পালিয়ে যায় গ্রাম থেকে। পত্রে পার্বতীকে জানিয়ে দেয় বিবাহে অক্ষমতার কথা। সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিকূলতা অপেক্ষা দেবদাসের অবজ্ঞা-অবহেলায় কিছুকালের জন্যে হলেও পার্বতীর মধ্যে এক ব্যক্তিত্বময়ী নারীর জন্ম দেয়। তার এই অপুষ্ট ব্যক্তিত্বের ক্ষণকালীন প্রকাশই দুই নারী-পুরুষের জীবনের মর্মন্তুদ ট্রাজেডির কারণ হয়ে ওঠে। পার্বতীর বিয়ের আগে দেবদাস পুনরায় বিয়ের প্রস্তাব দিলে নির্মমভাবে প্রত্যাখ্যান করে পার্বতী : ‘তোমাতে কিছুমাত্র আমার আস্থা নাই। ... আমার মা-বাপ আমার মঙ্গল কামনা করেন; তাই তাঁরা তোমার মত একজন অজ্ঞান, চঞ্চলচিত্ত, দুর্দান্ত লোকের হাতে আমাকে কিছুতেই দেবেন না। তুমি পথ ছেড়ে দাও।’ সে আরও বলে, ‘তোমার রূপ আছে গুণ নেই—আমার রূপ আছে, গুণও আছে। তোমরা বড় লোক, কিন্তু আমার বাবাও ভিক্ষে করে বেড়ান না।’ (অষ্টম পরিচ্ছেদ) কিন্তু লোকায়ত প্রেমের এই নাগরিক তীব্রতা যে কতটা অসাড় পার্বতী ও দেবদাসের পরিণতি তাকেই যেন প্রমাণ করেছে। দেবদাস মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পুরো প্রেম ও তার ব্যর্থতাজনিত যন্ত্রণাভার বহনের দায় যেন সম্পূর্ণরূপে পার্বতীকেই অর্পণ করে। পার্বতী কেবল অপেক্ষা করবে প্রেমের ঋণ শোধ করার জন্য। কর্ম দিয়ে নয়, চরম দুঃখভোগের মধ্য দিয়ে। এদিক থেকে দেবদাসের প্রেম নিঃরক্ত বেদনাবোধের জন্য নিরাপদ আশ্রয়।
৫
বাঙালির বাস্তব জীবন ক্ষুধা-দারিদ্র-সংকট-মহামারী আক্রান্ত হলেও সাহিত্যে প্রেমেরই একক আধিপত্য। প্রেম সেখানে অনেকটাই জৈব চাহিদাহীন পরম আরাধনার বিষয়। তারাশঙ্করের ‘কবি’ উপন্যাসের নিতাই চরিত্রে মিশে গেছে লোকায়ত সহজিয়া প্রেমের সঙ্গে ব্যক্তিগত নিম্নবর্গীয় প্রেমের দ্বিধারা। নিতাই একাধারে কবি এবং প্রেমিক। কবি অর্থাত্ স্রষ্টা। ঠাকুরঝি কিংবা বসন্ত—এ দুজনের প্রতি প্রেমাকর্ষণে তার মধ্যে কোনো দ্বৈরথ বা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় না। চামুণ্ডার মেলায় ঘটনাচক্রে কবিয়াল হিসেবে প্রতিষ্ঠা ঘটে তার। ঠাকুরজি-র প্রেরণা ও রাজনের সাহচর্য তাকে করে তোলে পরিপূর্ণ কবি। অন্যদিকে বসন্তের প্রেমঘন পৃষ্ঠপোষকতায় সে হয়ে ওঠে এক সম্পন্ন প্রেমিক-কবি। মৃত্তিকা থেকে উত্থিত এই প্রেম কিভাবে অতৃপ্ত অনন্তপ্রেমে রূপান্তরিত হয়, প্রেমিক নিতাই-এর জীবন ও পরিণতি তার প্রমাণ। ঠাকুরঝি এবং বসন্ত—দুই স্বতন্ত্র নারীসত্তা তার সৃষ্টিবাসনা ও প্রেমবোধের অকৃত্রিম সাধনায় কিভাবে অভিন্ন বিন্দুতে মিলিত হয়, তারাশঙ্কর দক্ষতার সঙ্গে তা রূপায়িত করেছেন উপন্যাসে। কিন্তু কোনো নারীই তার জীবনপাত্রে স্থায়ী হয় না। এক মীমাংসাহীন জিজ্ঞাসার মধ্যেই নিরূপিত হয় নিতাই কবিয়ালের প্রেমের অনন্তরূপ :
‘এই খেদ আমার মনে মনে।
ভালবেসে মিটল না সাধ—কুলাল না এ জীবনে।
হায়, জীবন এত ছোট কেনে?
এ ভুবনে?’
অশেষ কথা
বিশ্বযুদ্ধোত্তর আধুনিক বাংলা উপন্যাসে জীবনের বহুবিধ জটিলতার অনুষঙ্গেই প্রেমধারণার ক্ষেত্রে ঘটে গেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। অস্তিত্বসংগ্রামের পাশাপাশি আত্মপ্রতিষ্ঠার তাড়না প্রেমের সংজ্ঞার্থই যেন পাল্টে দিয়েছে। প্রেম স্বার্থপর, অথচ ব্যক্তিস্বার্থ হত্যা করে প্রেমকে। বুদ্ধদেব বসু কিংবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রেমিকেরা এক জটিল সময়ের প্রেমধর্মের স্বরূপ বিচিত্রভাবে প্রকাশ করেছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আধুনিক প্রেমের যে রূপক-অখ্যান (allegory) রচনা করলেন ‘শেষের কবিতা’য়, তাঁর প্রেমিক পুরুষ অমিত রায়ই হয়ে উঠলেন বিশ শতকী প্রেমিকের যথার্থ প্রতীক। বিশ শতকের তিরিশের দশক থেকে সূচিত অমিত রায়ের উত্তরসূরিদের প্রেমের রূপ ও স্বরূপ কেমন, তা নিয়ে আমরা ভাবব অন্য এক সময়ে।