মো. শিবির আহমেদ তাশফিক
সম্প্রীতির সমার্থকবোধক শব্দ অভিধানগুলোতে পাওয়া যায় ‘সদ্ভাব, ‘সন্তোষ, ‘আহ্লাদ, ‘আনন্দ’ ইত্যাদি। একে অপরের মধ্যে সদ্ভাব, সন্তোষজনক, আহ্লাদী, আনন্দপূর্ণ ইত্যাদি সম্পর্ককে সম্প্রীতি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। শব্দটি সম্পর্কের দিক থেকে বহুমাত্রিক। ব্যক্তিক, পারিবারিক এবং সমষ্টিগত বিচারে তা ধর্মীয় সম্প্রদায়গত, শ্রেণিগত, জাতিগত এমনকি রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক।
কোভিড-১৯ বর্তমানে সারা বিশ্বে একটি আতঙ্কের নাম। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম পৃথিবীর অসংখ্য দেশের মানুষের মধ্যে মৃত্যুভয় জাগিয়ে তুলেছে এই কোভিড-১৯ মহামারি। এখন পর্যন্ত এই ভাইরাস মোকাবিলায় কোনো কার্যকর টিকা বা চিকিত্সা আবিষ্কার হয়নি। তাই এই রোগের বিস্তার রোধে সামাজিক দূরত্ব (হোম কোয়ারেন্টাইন, লকডাউন) মেনে চলাকেই মূল কৌশল হিসাবে গ্রহণ করা হচ্ছে। করোনা কি আমাদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব নিয়ে এসেছে, নাকি এমনটাই হওয়ার ছিল? করোনার এই পরিস্থিতিতে পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে নেতিবাচক অনেক সংবাদ এ সময়ে দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বিবাহবিচ্ছেদ, ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্ব, মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের অমিল, এমনকি খুনাখুনির সংবাদও শোনা গিয়েছে। করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট চলমান লকডাউনের পরিপ্রেক্ষিতে এ সম্পর্কগুলোর পুনর্পাঠ করার সুযোগ তৈরি হলেও অবাক হয়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং সামাজিক সম্প্রীতি কমে যাচ্ছে।
সমাজে সম্প্রীতিহীনতা, দ্বন্দ্ব ও সহিংসতার উত্স সাধারণত দুইটি : ‘আইডেনটিটি-বেইজড প্রিজুডিস’ বা পরিচয়ভিত্তিক বিদ্বেষাত্মক মনোভাব এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও দলাদলি। একটি সমাজে সাধারণত ভিন্ন ও স্বতন্ত্র ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, জাতিসত্তা ও ভাষাভাষি মানুষ বসবাস করে। সমাজে এ ধরনের ভিন্নতাই ‘প্লুরালিজম’ বা বহুত্ববাদের ভিত্তি। বহুত্ববাদী সমাজে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন সমাজে পরিচয়ভিত্তিক ভিন্নদের সম্পর্কে বিরাজমান ও সম্ভাব্য পূর্ব ধারণা বা বিদ্বেষাত্মক মনোভাবের অবসান ঘটিয়ে সবার জন্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা। আর ‘ইনক্লুসিভনেস’ বা সামাজিক আত্মীকরণের মাধ্যমেই এমন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব।
বাহ্যিকভাবে মানুষের মধ্যে যেমন নানা অমিল রয়েছে, তেমনি চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রেও রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। এ কারণে মানুষের একে অপরের মধ্যে মতভেদ হতেই পারে। এ অবস্থায় অন্যের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি ও তা বজায় রাখার জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি হলো সহনশীলতা। সহনশীলতা বলতে অন্যের চিন্তাভাবনা, রীতিনীতি, চলাফেরা, ধারণা ও সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে শেখা। যে সমাজে ঐকমত্যের ক্ষেত্র যত বিস্তৃত, সে সমাজের খুঁটি তত শক্ত এবং সে সমাজে আত্মঘাতী দ্বন্দ্ব ও সহিংসতার মাধ্যমে গোটা জাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কাও তত কম। আধুনিকতার নামে আমাদের পারিবারিক বন্ধন আর ঐতিহ্যগুলো দিনদিন ভেঙে যাচ্ছে। আধুনিকতা কি সামাজিক সম্প্রীতি নাকি সামাজিক দূরত্ব? সামজিক সম্প্রীতির অভাবে সমাজের মানুষের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় যা সমাজের ব্যাপক ক্ষতি করে। সমাজের নিরাপত্তা, ভবিষ্যত্ এবং সংহতিকে বিপন্ন হওয়া থেকে বাঁচাতে সামাজিক সম্প্রীতির প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। সম্প্রীতিহীনতার ফলে সমাজে অস্থিরতা, অনৈক্য ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। আর দ্বন্দ্ব থেকেই সূত্রপাত হয় সহিংসতার এবং অব্যাহত সহিংসতা জাতিকে চরম বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। পক্ষান্তরে সামাজিক সম্প্রীতির মাধ্যমে ‘সামাজিক পুঁজি’ সৃষ্টি হয়। সামাজিক পুঁজি আর্থিক পুঁজি থেকে ভিন্ন এবং এটি সৃষ্টি হয় যখন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে। সামাজিক পুঁজি আর্থিক পুঁজির অপ্রতুলতা দূর করতে পারে। সমাজের সব স্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে ‘সামাজিক আন্দোলন’ ও ‘সামাজিক প্রতিরোধ’ গড়ে তোলা গেলে অনেক সামাজিক সমস্যাই অর্থকড়ি ছাড়াই সমাধান সম্ভব হয়। তাই অর্থনৈতিক দিক থেকে দরিদ্র দেশগুলোয় সামাজিক সম্প্রীতিই বড় পুঁজি হিসেবে দেখা দেয়।
কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের তিনটি শিক্ষা দিয়েছে : (ক) সংকট মোকাবিলায় জনগণের অন্তর্ভুক্তিকরণ কতটা কার্যকরী, (খ) জনগণের চাহিদা মেটানোয় বিভিন্ন ক্ষেত্রের অংশীদারদের অংশীদারিত্বমূলক ভূমিকা এবং (গ) রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকানোয় ডিজিটাল প্রযুক্তির অপরিসীম গুরুত্ব। করোনামুক্ত নতুন পৃথিবী পুরোনো রীতিনীতি সব ভুলে এমন এক আধুনিক রীতিনীতি স্থাপন করবে যা আমাদের মধ্যে আমাদের কর্তব্য, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ধর্ম সর্বোপরি আমাদের সামাজিক সম্প্রীতির এক নতুন অধ্যায় শুরু হবে। এমন অধ্যায় যেন সামাজিক দূরত্ব নয় বরং সামাজিক সম্প্রীতি হয়। পরিশেষে, আইডেনটিটি-বেইজড বা পরিচয়ভিত্তিক সামাজিক বিদ্বেষ বাংলাদেশে প্রকট সমস্যা নয়। তা সত্ত্বেও সময়ে সময়ে আমাদের দেশে পরিচয়ভিত্তিক ভিন্নরা সহিংসতার শিকার হয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণেই মূলত এগুলো ঘটেছে। বস্তুত, রাজনৈতিক সহিংসতা আমাদের দেশে ব্যাপক, যা বর্তমানে আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অব্যাহত সহিংসতার কারণে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও এখন চরম ঝুঁকির সম্মুখীন। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে এবং টেকসইভাবে সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে তুলতে হলে আজ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা সৃষ্টি করতে হবে।
n লেখক :মাস্টার্স শিক্ষার্থী এবং সহকারী গবেষক ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)