জান্নাতুন নিসা
সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই মানুষের শুদ্ধ জীবনের অংশীদার হয়েছে সংকটকালীন যত সান্ধ্যবিশ্বাস। কখনো আবার সেই বিশ্বাস, স্বপ্নমাখা সম্পদের হাত ধরেছে আপন ভেবে। আদিম চাঁদের আধপোড়া মাংসের খোঁজে অনাহূত হিংস্রতায় হয়ে উঠেছে পূর্ণ। আর জগদ্ব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে নৈরাজ্য। প্রতিটি মহামারি মানবজীবনে পরিবর্তনের ছোঁয়া রেখে যায়। যা কখনো হয়েছে গ্রহণীয় আবার বর্জনীয়। একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা যখন করোনার থাবায় ভয়ার্ত তখন নৈরাজ্য আর মূল্যবোধের অভাব আমাদের করে তুলছে কোণঠাসা। কোভিড ১৯-এর সংক্রমণে অর্থনীতি, বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিত্সাসহ সব ক্ষেত্রই আজ বিপর্যস্ত। অর্থাত্ জাতীয় জীবনের এমন কোনো দিক নেই যেখানে করোনার প্রভাব কোনো ধরনের বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেনি। সে বিপর্যয় যতটা ভয়ংকর ছিল তার চাইতে এখন অনেক বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে দিনের পর দিন।
করোনার দীর্ঘমেয়াদি লকডাউন শেষে বিশ্বজুড়েই একধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। সবচেয়ে বেশি ভঙ্গুর অবস্থা বিশ্ব অর্থনীতির। সেই সুবাদে বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। বর্তমানে আমাদের অনেক পেশাজীবীদের কাজ বন্ধ কিংবা অনেককে কম বেতনে কাজ করতে অর্থাত্ চাকরিটাকে ধরে রাখতে হচ্ছে। আর সচেতন নাগরিকগণ অনেকটা নিজ দায়িত্বেই রয়েছেন গৃহবন্দি হয়ে। অন্যদিকে নিম্নশ্রেণির মানুষের কাজ নেই, অনেক কলকারখানা প্রায় বন্ধের পথে। অথচ দিনশেষে প্রত্যেককেই খাবারের কথা কিংবা ঘরের কথা ভাবতে হচ্ছে। তখন তার ভাবনায় কেবলই থাকছে উপার্জনের কথা। নৈতিকতা কিংবা মানবতা তখন তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। কারণ, হিসেবে যদি বলি, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের লেখা বিখ্যাত সেই লাইন—‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’
করোনা পরবর্তী সময়ে ইতিমধ্যেই আমরা ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থায় দাঁড়িয়ে এখনো বিপুল পরিবর্তনের অপেক্ষায়। এমন পরিস্থিতিতে প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কতটা সময় লাগবে তা এখনো অনিশ্চিত। আর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও এত মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে যথেষ্ট সময় লাগবে নিঃসন্দেহে। এতে করে মানুষের মাথাপিছু আয় থেকে শুরু করে, অন্য প্রায় সব অর্থনৈতিক মানদণ্ড নিম্নমুখী হচ্ছে। মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান আরো অনুন্নত হচ্ছে। এই অবস্থায় অর্থনৈতিক মন্দা ক্রমে গভীরতম হয়ে জাতীয় দুর্যোগে পরিণত হতে যাচ্ছে। সেই দুর্যোগের ভারে বেড়ে যাচ্ছে নৈরাজ্য।
ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাই, যুগে যুগে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অরাজকতা কিংবা বহু বছর ধরে চলা নৈরাজ্যের পট পরিবর্তনে মহামারী ও দুর্ভিক্ষ প্রধান ভূমিকা পালন করেছে বরাবর। কারণ মহামারি পরবর্তী সময়ে মানুষের জৈবিক, পরিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা, প্রযুক্তি, যোগাযোগ, কর্ম, শিল্পায়ন, নগরায়ণসহ জীবনব্যবস্থায় ব্যাপক এবং বিশালাকারে পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে থাকে খুব স্বাভাবিকভাবেই। যে কারণে রেনেসাঁর দেখা পাই আমরা ফিরে ফিরে।
তবে আশার কথা হচ্ছে, সমাজের পরিবর্তন মানে কেবল উন্নতি কিংবা অবনতি নয়। ভালো-মন্দ দুই দিক থেকেই পরিবর্তন পূর্ণতা পায়। আমরা আমাদের পেছনে ঘটে যাওয়া মহামারি কিংবা ক্রান্তিকালীন সময় থেকে শিক্ষা নিয়ে নিশ্চয়ই সুন্দর স্বপ্ন রচনা করে পথ চলতে পারব। আর বাঙালি বীরের জাতি। তারা তো পিছু হটতে জানে না। তারা জানে কীভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়, তারা জানে কীভাবে কাজ করে এগোতে হয়। ’৫২ কিংবা ’৭১-এ বিশ্ব দেখেছে বাঙালির সাহস, নিষ্ঠা, ভালোবাসা সর্বোপরি দেশের জন্য ত্যাগ।
পৃথিবীর প্রতিটি দেশের মতোই করোনা হয়তো আমাদের থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে তেমনি আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েও গিয়েছে। করোনা আমাদের শিখিয়েছে মানবিকতার চর্চা, পুরো বিশ্বের অচলাবস্থায়ও জীবনের গতি ধরে রাখা, অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস, পরিবর্তন গ্রহণ করার ক্ষমতা। করোনা প্রকৃতির বৈরিতা কিংবা স্রষ্টার অভিশাপ যা-ই হোক না কেন! আমার মনে হয়, পুরোনোকে দূরে ঠেলে নতুনকে আলিঙ্গন করার পূর্বাভাস এই কোভিড ঝড়। একটি রেনেসাঁর সূচনা, সভ্যতার পট পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা। আমার বিশ্বাস, বর্জনীয় প্রতিটি বিষয়কে সরিয়ে আমাদের গ্রহণীয় প্রতিটি শিক্ষার সঠিক প্রয়োগে নিশ্চয়ই সুন্দর আগামী রচিত হবে। রচিত হবে দারিদ্র্যতামুক্ত, বেকারত্বহীন, নৈতিকতায় পূর্ণ বাংলাদেশ।
n লেখক : কথাসাহিত্যিক ও নারীনেত্রী