হাবিবুল ইসলাম হাবিব
সিনেমার সবচাইতে বড় দুঃসময় চলছে সবাই এটা স্বীকার করবেন। তাহলে কি চলচ্চিত্র শিল্প ইতিহাস হয়ে থাকবে অদূর ভবিষ্যতে? এই প্রশ্নটাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনা মহামারি এসে এই প্রশ্নটাকে আরো বাস্তব করে তুলছে। মানব সভ্যতার ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় কোনো মহামারি দুর্যোগ মানব সভ্যতাকে থামিয়ে দিতে পারেনি, করোনা দুর্যোগকেও জয় করবে, এটাই সত্য চিরন্তন। কিন্তু করোনা থিতু হলে সিনেমা কি রমরমিয়ে চলবে? কীভাবে চলবে, যেখানে নব্বই দশকের শুরুতে বাংলাদেশে সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৩৫টি, দুই দশকে কমতে কমতে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০০-র কাছাকাছি! মাঝেমধ্যে নানান উত্সব উপলক্ষ্যে হাটবাজারে, কালেভদ্রে ৪০-৫০টি ভাঙাচুরা অস্বাস্থ্যসম্মত সিনেমা হল যুক্ত হয়ে থাকে। গত দুই দশকে বাংলাদেশের কোথাও নতুন সিনেমা হল নির্মাণ হয়নি। সিনেমা হলই যদি না থাকে তাহলে দর্শকরা সিনেমা দেখবে কোথায়? হাটে মাঠে ময়দানে নিশ্চয় সিনেমা দেখানো হবে না।
প্রথম বাংলা নির্বাক সিনেমা ‘সত্যবাদী রাজা হরিশ্চন্দ্র’ সিনেমাটি নির্মাণে এগিয়ে এসেছিল প্রদর্শক ম্যাডানের এলফিনস্টন বায়োস্কোপ কোম্পানি। ওদিকে ভারতে পাঞ্জাবের কেন্দ্র লাহোরে গড়ে ওঠে আর একটি সিনেমা কেন্দ্র। আবদুুর রশিদ কারদার ১৯৩০ সালে নির্মাণ করেন নির্বাক ছবি ‘হুসনে কি ডাকু’। তিনটি কেন্দ্র বম্বে যাকে বলা হয় বলিউড, কলকাতা যাকে টালিউড নামেই সবাই চেনে, আর লাহোর কেন্দ্রিক সিনেমাকে বলা হতো ললিউড। ততদিনে ভারতীয় জনগণের এক বিনোদনের জায়গা নিয়ে নিয়েছে সিনেমা। ভারত জুড়েই তৈরি হতে লাগল একের পর এক সিনেমা হল। তত্কালীন পূর্ব বাংলা সিনেমার কেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু না করলেও সিনেমা হল নির্মাণে পিছিয়ে থাকেনি। বম্বে, কলকাতা, লাহোর ও বিশেষ হলে বিদেশি ইংরেজি সিনেমাই দেখানো হতে লাগল। ১৮৯৮ সালে পাটুয়াটুলী এলাকায় ক্রাউন থিয়েটারে প্রথম সিনেমা প্রদর্শিত হয়। প্রথাগত সিনেমা হল নির্মিত হয় ১৯১৫ সালে। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল চলছে। লেজার নামের এক ইংরেজ নবাব ইউসুফ খানের থেকে জায়গা কিনে আরমানিটোলায় সিনেমা হলটি তৈরি করেন, নাম দেন পিকচার হাউজ। লেজার সেটি পরে বিক্রি করে দেন উদ্ভবজী ঠাকুর নামের এক মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীর কাছে। পিকচার হাউজ অনেকটা পরে নাম বদলে হয় শাবিস্তান। একুশ শতকের শুরুতেই হলটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সারা দেশে ব্যবসাটির প্রসার ঘটে, দেশব্যাপী গড়ে উঠে একের পর এক সিনেমা হল। দেশ ভাগ হয়ে আমরা যখন পূর্ব পাকিস্তান তখন আমাদের নিজেদের সিনেমা বানানোর ভাবনা এল অনেকের মাথায়। কল্পনাকে বাস্তব করতে এগিয়ে এলেন আব্দুল জব্বার খান। ফরিদপুরে সংগঠিত এক ডাকাতির কাহিনি নিয়ে তিনি নেমে পড়লেন এই বাংলার প্রথম সিনেমা বানাতে। ১৯৫৩ সালে শুরু করে ১৯৫৬ সালে মুক্তি পেল এই বাংলার প্রথম সিনেমা ‘মুখ ও মুখোশ’। ৬৪ হাজার রুপি ব্যয় হয়েছিল সিনেমাটি নির্মাণে। প্রথম দফাতেই ছবিটি আয় করে ৪৮ হাজার রুপি। সিনেমা আর থেমে থাকেনি এই বাংলায়। ’৬৫-র যুদ্ধের পর ভারতীয় সিনেমা নিষিদ্ধ হলে লাহোর করাচির সিনেমার সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিয়ে এগিয়েছে এই বাংলার সিনেমা। আজ সেই সিনেমার কি দুর্দশা! বাংলাদেশের বহু জেলায় এই সময়ে কোনো সিনেমা হল নেই। ভাবা যায়! পর্যটন নগরী কক্সবাজারে বিনোদনের জন্য কোনো সিনেমা হল নেই। আগে এই শহরে দুটি সিনেমা হল ছিল। পর্যটনের অপর শহর রাঙ্গামাটির অবস্থাও তাই। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরেও সেখানে তিনটি সিনেমা হলের সবকটিই বন্ধ। সিনেমা হল নেই নড়াইল, ঝালকাঠি, পঞ্চগড়, মুন্সীগঞ্জ জেলা শহরেও। একের পর এক বন্ধ হয়ে সেখানে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন মার্কেট। এজন্যই চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচাতে নতুন ভাবনায় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। বলা হয় মানসম্পন্ন সিনেমা না থাকাতে সিনেমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে দর্শকরা, তাই এই ধস।
নব্বই দশক পর্যন্ত সিনেমা দেখাটা ছিল পারিবারিক বিনোদনের অন্যতম উত্স। অবস্থাটা বদলে যেতে থাকে আকাশ সংস্কৃতির উদ্ভব হওয়ায়। এর আগে টেলিভিশনে চ্যানেল বলতে একটিই ছিল, বিটিভি। আকাশ সংস্কৃতি নাগরিক জীবনে বহু চ্যানেল দেখার জানালা খুলে দিল তাও দিবস ও রজনী ২৪ ঘণ্টা। তার মধ্যে আবার বিদেশি চ্যানেল। নিষিদ্ধ বস্তুর আকর্ষণের মতো সনাতন ধারা নাগরিকদের হুমড়ি খেয়ে পড়তে দেখা গেল টেলিভিশন পর্দায়। তাতে আরো জোগান দিল বাংলা সিনেমার অধোগতি। সে সময় বহু নির্মাতাকে বলতে দেখা গেছে তাদের নির্মিত সিনেমা নিম্নবিত্তরা দেখলেই তারা টিকে যাবে। সেজন্যই হয়তো অশ্লীলতা গ্রাস করতে লাগল বাংলা সিনেমাকে। মেধা ও মননের চর্চার এই পতন মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করল বিপুল সংখ্যার মধ্যবিত্তকে। তাহলে কি আকাশ সংস্কৃতির বিকাশ সিনেমার এই দুর্দশার জন্য দায়ী? এই প্রশ্নে বিতর্ক চলতে পারে, অনেকেই এই প্রশ্নে সমর্থন জানাতে পারে, তবে বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বিচার করা হলে দেখা যাবে আকাশ সংস্কৃতির বিকাশ সিনেমাকে হটাতে পারেনি বরং আকাশ সংস্কৃতি সহায়ক হয়েছে সিনেমার বাণিজ্যিক বিকাশে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের দৃষ্টি ফেললে দেখতে পাব সে দেশে জাতীয় তথা বলিউডি সিনেমার রমরমা অবস্থা। এমনকি আঞ্চলিক সিনেমাও পুঁজি ফেরত পেয়ে মুনাফা করছে। এর প্রধান কারণ সেদেশে সিনেপ্লেক্সের বিস্তার ঘটেছে জনমানসের মানসিকতাকে লালন করে। সে দেশেও প্রথাগত সিনেমা হল বন্ধ হচ্ছে, এর মধ্যে ঐতিহ্যধারী বহু সিনেমা হলও রয়েছে। সিনেমার নির্মাণ কৌশল, বিষয়ও বদলেছে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। লস্ট ফাউন্ড, অ্যাকশন, এরপর মধুর মিলন এই ফর্মুলা সিনেমা এখন হয় না। সেখানে বায়োপিক এমনকি মঙ্গল অভিযান নিয়ে সিনেমার বিষয় হয়, সেগুলো দর্শকদের আনুকূল্যও লাভ করে। আমাদের এখানে আমরা প্রথার বাইরে গিয়ে টান টান চিত্রনাট্যে সিনেমা নির্মাণ করি। দর্শকরা দেখবে কোথায়? এবার আলো ফেলা যাক সিনেপ্লেক্স ধারণাটির দিকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সিনেমা দেখার রুচি ও ধ্যানধারণার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। শুধু সিনেমা দেখার জন্যই দল বেঁধে যাওয়া এ রকমটা আজকাল হয় না। সিনেপ্লেক্সের একই ছাদের তলে নানান ভ্যারাইটির রেস্তরাঁর একটিতে দল বেঁধে খাওয়া-দাওয়া, লম্বা একটা সময় কাটিয়ে বাড়ি ফেরা। এই হলো সিনেপ্লেক্স সংস্কৃতি।
ভাঙা চেয়ার, ছারপোকার কামড়। গুমোট পরিবেশে গুদামঘরে বসে কি সিনেমা দেখা সম্ভব? যেখানে ঘামতে ঘামতে পুরো একটা সিনেমা দেখাতো যুদ্ধ জয়ের শামিল! শব্দের অবস্থা তো আরো ভয়াবহ। এই অবস্থায় একজন সুস্থ মানুষ সিনেমা দেখতে গিয়ে অসুস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নেবেন।
হলমালিকরা সিনেপ্লেক্স ধারণাটি বাস্তবায়ন করতে পারবে না, তাদের কাছে বিনিয়োগ করার মতো অর্থ নেই। এখানেই সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। অনেকেই স্বীকার করছেন সিনেপ্লেক্স ছাড়া চলচ্চিত্র ব্যবসা ধরে রাখা যাবে না। বর্তমানে এটা উচ্চাভিলাষ নয়, এটি এখন বাস্তবতা। এবার কল্পনায় দৃশ্য আঁকি কেমন হবে ৩০০ সংসদীয় আসনে ৩০০ সিনেপ্লেক্স। যেহেতু সিনেপ্লেক্স একের ভেতর বহু, তাই সিনেপ্লেক্স হবে শপিং কমপ্লেক্স। বহুতল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শপিং কমপ্লেক্সের টপ ফ্লোরে হবে এক বা একাধিক সিনেপ্লেক্স। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকবে ফুড কোর্ট, নানা রকম হালকা খাবারের সমাবেশ থাকবে।
কাঙ্ক্ষিত সিনেপ্লেক্স সারা দেশে গড়ে উঠলে সেসব সিনেপ্লেক্সে কি বিদেশি সিনেমা জাকিয়ে বসবে? এই আশঙ্কা অনেকেই করেন হালফিলে বাংলা সিনেমার অবস্থা দেখে। আশঙ্কাটি অমূলক নয়। সিনেপ্লেক্সে যারা বিনিয়োগ করবেন তারা নিশ্চয়ই লোকসানের বোঝা বইবেন না। দর্শক শূন্য সিনেপ্লেক্স উদ্যোক্তারা চাইবেন না। এখানে সচেতন হতে হবে চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িতদের। মেধাবী মননশীল নির্মাতাদের সুযোগ করে দিতে হবে প্রযোজকদের। শিল্পীদের বেলায় একই কথা। সমাজের নানা অসঙ্গতি সিনেমার গল্পে উঠে আসাটা স্বাভাবিক। অপরাধীরা নিজেদের শাসক দলের লেবেল লাগায় অপরাধকে জায়েজ করতে। নানাভাবে ম্যানেজ করার প্রতিভাবান তারা। সিনেমায় এসব চিত্র উঠে আসলে রাজনৈতিক দলগুলো সিনেমাটির বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারে। এখানেই সরকার নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে গণতান্ত্রিক চর্চাকে উত্সাহিত করলে সিনেমার যেমন লাভ হবে তেমনি সমাজ নির্মাণে রাখবে ভূমিকা।
n লেখক :চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক